Kolkata International Book Fair Bangladesh Participation: আসন্ন কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনও নিশ্চিত নয়। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান এবং বাংলাদেশের কিছু বই নিয়ে কলেজ স্ট্রিটের প্রকাশকদের আপত্তির কারণে আমন্ত্রণের আগে দিল্লির সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছে পরামর্শদাতা কমিটি।
প্রথম কলকাতা: আসন্ন কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। বইমেলার নবগঠিত পরামর্শদাতা কমিটির আহ্বায়ক সাংবাদিক প্রসেনজিৎ বক্সী সোমবার বিকেলে জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে কলকাতা বইমেলার প্রস্তুতির প্রস্তাবে বাংলাদেশের নাম রাখা হচ্ছে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানোর আগে কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান জানা জরুরি। একইসঙ্গে বাংলাদেশের প্রকাশনা থেকে আসা কিছু বই, বিশেষ করে ভারতবিরোধী বক্তব্য রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠা বই এবং বইয়ের পাইরেসি নিয়েও কলেজ স্ট্রিটের বহু প্রকাশকের আপত্তি রয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু একটি দেশের অংশগ্রহণের প্রশ্নে আটকে নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কূটনৈতিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিবেচনা, প্রকাশকদের উদ্বেগ এবং বই ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নও। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ কলকাতা বইমেলায় অংশ নেবে কি না, তার উত্তর এখন নির্ভর করছে পরবর্তী আলোচনার উপর।
বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে আপাতত দরজা খোলা নয়
প্রসেনজিৎ বক্সীর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার প্রস্তুতির যে প্রস্তাব তৈরি হচ্ছে, তাতে আপাতত বাংলাদেশের নাম রাখা হচ্ছে না বলেই তিনি জানিয়েছেন। এর পেছনে প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন।
তাঁর কথায়, বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানোর আগে ভারত সরকারের অবস্থান জানা প্রয়োজন। বিশেষ করে ভারত সরকারের সংশ্লিষ্ট বিশেষ দপ্তর এবং স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি জানিয়েছেন। অর্থাৎ, বইমেলার আয়োজক বা পরামর্শদাতা কমিটির পক্ষ থেকে একতরফাভাবে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট সংকেত পাওয়াকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রসেনজিৎ বক্সী স্পষ্ট করে বলেন, পরামর্শদাতা কমিটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জন্য দরজা পুরোপুরি খোলা রয়েছে—এমন পরিস্থিতি এখন নেই। পরিবর্তিত পরিস্থিতিই এর অন্যতম কারণ বলে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। ফলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রশ্নটি এখন সরাসরি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিবেচনার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে।
কলেজ স্ট্রিটের প্রকাশকদের আপত্তি কেন?
বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে দ্বিতীয় যে বিষয়টি সামনে এসেছে, সেটি কলকাতার প্রকাশনা জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রসেনজিৎ বক্সীর বক্তব্য অনুযায়ী, কলেজ স্ট্রিটের বহু প্রকাশকের বাংলাদেশের কিছু বই নিয়ে প্রবল আপত্তি রয়েছে।
তাঁর অভিযোগ, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বাংলা বইয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের পাইরেসি কলকাতায় চলে। সেই পাইরেসির মাধ্যমে এমন কিছু বই ছাপা ও প্রকাশিত হচ্ছে, যেগুলির মধ্যে ভারতবিরোধী বক্তব্য রয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। এই বিষয়টিকেও বইমেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন প্রকাশকদের একাংশ।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উঠে এসেছে—বইমেলা শুধু বই বিক্রির জায়গা নয়, এটি সাহিত্য ও মতপ্রকাশেরও একটি বড় পরিসর। তাই কোনও বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তি উঠলে তা কীভাবে দেখা হবে, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে। একদিকে প্রকাশকদের উদ্বেগ, অন্যদিকে বই ও সাহিত্যকে ঘিরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য রাখার বিষয়টি জটিল হয়ে উঠেছে বলেই প্রসেনজিৎ বক্সীর বক্তব্যে ইঙ্গিত রয়েছে।
বই আটকানো নয়, কিন্তু দেশের স্বার্থও কি বিবেচ্য নয়?
বাংলাদেশের কিছু বই নিয়ে আপত্তির প্রসঙ্গে প্রসেনজিৎ বক্সী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। বই বা সাহিত্য সৃষ্টিকে আটকানোর কথা বলা হচ্ছে না। কিন্তু একইসঙ্গে একটি দেশের স্বার্থ এবং সেই দেশের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও বিবেচনার বাইরে রাখা যায় কি না, সেই প্রশ্নও রয়েছে।
তিনি বলেন, সাহিত্য বা সৃষ্টিকে আটকে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে না। কিন্তু দেশের অস্তিত্ব ও দেশের স্বার্থের বিষয়টিও আগে ভাবতে হবে। কলকাতা বইমেলার মতো একটি বড় আন্তর্জাতিক পরিসরে এমন কোনও বই থাকবে কি না, যা ভারতবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করে—সেটি কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।
এর সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নটিও জড়িত। কোনও বইয়ের বক্তব্যকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ হিসেবে দেখা হবে কি না, কিংবা কোথায় সীমারেখা টানা হবে, সেই প্রশ্ন সব দেশেই জটিল। প্রসেনজিৎ বক্সীর বক্তব্যে সেই জটিলতার কথাই উঠে এসেছে। ফলে বাংলাদেশের বই কলকাতা বইমেলায় থাকবে কি না, সেই প্রশ্নের সঙ্গে বইয়ের বিষয়বস্তু ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হচ্ছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের পরিস্থিতিও আলোচনায়
প্রসেনজিৎ বক্সী তাঁর বক্তব্যে ২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন গতিবিধির কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশে সেই সময়ের পর থেকে যে সমস্ত পরিবর্তন ও ঘটনাপ্রবাহ ঘটেছে, ভারত সরকার সে সম্পর্কে অবহিত।
তাই কলকাতা বইমেলার পরামর্শদাতা কমিটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে কথা বলা হবে। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলির কাছ থেকে অবস্থান পরিষ্কারভাবে জানা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করছেন। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি সম্পর্কে সঠিক তথ্য বা নির্দেশনা পাওয়া গেলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথও পরিষ্কার হবে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনই বাতিল করা হয়েছে—এমন কথা তিনি বলেননি। বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে আমন্ত্রণ জানানোর আগে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা এবং তাঁদের অবস্থান জানা জরুরি বলেই তিনি জানিয়েছেন। সেই কারণে আপাতত প্রস্তুতির প্রস্তাবে বাংলাদেশের নাম না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাহিত্য, কূটনীতি আর বইমেলা—তিনের মাঝখানে বড় প্রশ্ন
কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অংশগ্রহণের প্রশ্নটি এবার অন্য মাত্রা পেয়েছে। একদিকে রয়েছে দুই বাংলার ভাষা ও সাহিত্যকে ঘিরে স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক যোগাযোগের প্রশ্ন, অন্যদিকে রয়েছে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রকাশকদের একাংশের আপত্তি।
প্রসেনজিৎ বক্সীর বক্তব্যে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা, বিশেষ দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র দপ্তরের অবস্থান, কলেজ স্ট্রিটের প্রকাশকদের উদ্বেগ এবং বাংলাদেশের প্রকাশনা থেকে আসা কিছু বই নিয়ে ওঠা অভিযোগ—সবকিছু বিবেচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, শেষ পর্যন্ত কলকাতা বইমেলায় বাংলাদেশের প্রকাশক ও বই থাকবে কি না। আপাতত সেই উত্তর মেলেনি। তবে পরামর্শদাতা কমিটির আহ্বায়কের বক্তব্য থেকে এটুকু স্পষ্ট, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দিল্লির অবস্থান জানা হবে এবং পাশাপাশি কলকাতার প্রকাশনা মহলের উদ্বেগকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ফলে আসন্ন কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনই নিশ্চিত নয়। আগামী দিনে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেদিকেই নজর থাকবে বইপ্রেমী, প্রকাশক এবং দুই বাংলার সাহিত্যপ্রেমীদের।
২০২৭ সালের আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি এবং চলবে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এটি কলকাতা বইমেলার ৫০তম সংস্করণ তথা সুবর্ণজয়ন্তী। মেলাকে আরও সর্বব্যাপী করতে এবার যৌথ আয়োজক হিসেবে থাকছে পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ড, ইজেডসিসি এবং ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট। প্রসঙ্গত, এবারের বইমেলার থিম হিসেবে সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে ইসরাইলকে তুলে ধরার কথা ভাবা হচ্ছে; অনুমোদন না মিললে বন্দেমাতরমের ১৫০ বছরকে থিম করা হবে। আধুনিক স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে প্রকাশকরা কিউআর কোডের মাধ্যমে স্টলের জন্য আবেদন করতে পারবেন এবং সারা পৃথিবীতে যেভাবে আধুনিক পদ্ধতিতে স্টল বণ্টন হয়, এখানেও সেই পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। প্রসঙ্গত, গত দু’বছর ধরে বইমেলায় বাংলাদেশের কোনও বুক স্টল নেই। বাংলাদেশের স্টল নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও কমিটি ও প্রকাশকদের আপত্তি রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অনুমোদন পাওয়ার পরই বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হবে।
আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় বাংলাদেশ শেষবার অংশগ্রহণ করেছিল ২০২৪ সালে, ৪৮তম কলকাতা বইমেলায়। সে বছর বাংলাদেশের প্যাভিলিয়ন মেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্যাভিলিয়নের সম্মান লাভ করে। এরপর ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এবং দুই দেশের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে, ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না মেলায় ২০২৫ ও ২০২৬ সালের কলকাতা বইমেলায় বাংলাদেশের কোনও স্টল বা প্যাভিলিয়ন ছিল না। প্রসঙ্গত, ১৯৯৩ সাল থেকে বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় অংশগ্রহণ করে আসছিল। দীর্ঘ ২৮ বছরের সেই অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতায় প্রথম ছেদ পড়ে ২০২৫ সালে, যা ২০২৬ সালেও অব্যাহত থাকে।
#KolkataInternationalBookFairBangladeshParticipation #KolkataInternationalBookFair #BangladeshParticipation #BangladeshBookFairParticipation #KolkataBookFair2026 #BangladeshBooks #BengaliBooks #CollegeStreetPublishers #BangladeshIndiaRelations #IndiaBangladeshRelations #BookFairNews #KolkataBookFair #BengaliLiterature #BengaliPublishing #InternationalBookFair













