শাড়ি পড়া ৫৮ বছর বয়সী বাস কন্ডাক্টর!

শাড়ি পড়া ৫৮ বছর বয়সী বাস কন্ডাক্টর! ডলির জীবনের গল্প চোখে জল আনবে

শাড়ি পড়া ৫৮ বছর বয়সী বাস কন্ডাক্টর!

শাড়ি পড়া ৫৮ বছর বয়সী বাস কন্ডাক্টর!

প্রধম কলকাতা : পরনে শাড়ি, কাঁধে কন্ডারক্টরের রংচটা ব্যাগ। বাবার স্বপ্ন পূরণে রোজ হাওড়া-ধর্মতলা ছুটছেন ৫৮ বছরের ডলি। পাবলিক বাসের কন্ডাক্টর হলেন কেন? এই পরিচয়ের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে জীবনের এক কঠিন গল্প। এই মহিলার লড়াই চোখে জল এনে দেবে। ভদ্রমহিলার নাম ডলি রানা।

প্রতিদিন রোদ-ঝড়-জল-বৃষ্টি উশাড়ি পড়া ৫৮ বছর বয়সী বাস কন্ডাক্টর!পেক্ষা করে শাড়ি পরেই কন্ডাক্টরের ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় নেমে পরেন তিনি। কেউ দেখে অবাক হয়ে যায়, আবার কাউকে বলতে শোনা যায়, মেয়ে হয়ে বাসের কন্ডাক্টর! তবুও তিনি থেমে থাকেননি। চলন্ত বাসের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে প্যাসেঞ্জার তোলা থেকে শুরু করে টিকিট কাটার গুরু দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। না, এখন অবশ্য মহিলা বাস কন্ডাক্টার শুনলে কেউ খুব একটা অবাক হন না। কারণ অনেক সরকারিবাসেই মহিলা কন্ডাক্টরের দেখা মেলে। কিন্তু বেসরকারি বাসে চোখে পড়ে না খুব একটা। আসলে এই ধরনের পেশা মানেই তো সকলেই ভাবেন এটা শুধুমাত্র পুরুষদেরই কাজ। মহিলাদের আবার এইসব কাজে মানায় নাকি? এ ছবি বিরলের চেয়েও বিরল বাংলার বুকে।

তবে এসব মানুষের কটাক্ষকে উপেক্ষা করেই নিজের কাজ করে চলেছেন এই মহিলা। ঘর সংসার ছেড়ে, একজন মহিলা চলন্ত বাসের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে এভাবে কন্ডাক্টরের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। বয়সের ভারে সিনিয়র সিটিজেনের খাতায় নাম লিখিয়ে ফেলেছেন। এই বয়সে এসেও এমন কঠিন একখানা কাজ করেন কিভাবে? মহিলা হিসাবে এই কঠিন পেশাকে বেছে নেওয়ার মূল কারণ হল, বাবার স্বপ্ন পূরণ। বাবার ইচ্ছে ছিল সামর্থ্য হলে বাস কিনবেন। বাবার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে নিজের গয়না বেঁচে এবং লোন নিয়ে বাস কিনেছেন। না এরপর অবশ্য সংসারে সচ্ছলতা ফেরেনি। বরং দিনের পর দিন ডলি দেবীর লড়াইটা আরো কঠিন হয়ে উঠেছে।

তিনি ভেবেছিলেন, বাস চালু করলেই রোজগার হবে, আর ভালোভাবে সংসার চলবে। তবে বাস্তবে পরিস্থিতি অন্য কথা বলছে। কারণ ঋণের বোঝা আর খরচের চাপে দিনের পর দিন দেয়ালে পিঠ থেকে যাচ্ছিল তাঁর। একসময় ড্রাইভার, কন্ডাক্টর রেখে বাস চালাতেন। এমন বহুদিন হয়েছে রাতে টাকা নিতে এসে শূন্য হাতেই ফিরেছেন। চোখের জল মুছে দিনের পর দিন ধৈর্য ধরে মনকে শান্ত রেখেছেন, সুদিনের আশায়। চরম অর্থনৈতিক সমস্যাতেও দিনের পর দিন কেটেছে। তারপরই মনস্থির করেন এই বাস টিকিয়ে রাখতে হলে নিজেকে হাল ধরতে হবে। বাসের ইএমআই, ডাইভার কন্ডাক্টরের খরচ প্রতিদিন উঠছে না দেখে বাধ্য হয়ে একদিন, নিজেই বাসের টিকিটের ব্যাগ হাতে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে পড়েন। জেদ আর কঠোর পরিশ্রমে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সমস্যা ফিকে হতে থাকে। শোধ হয় বাসের লোন। বর্তমানে বাস চালিয়ে ড্রাইভার বাস মেরামতির তেল খরচ বাদেও, প্রতিদিনই সামান্য কিছু টাকা হাতে থাকে, তাতেই দিন চলছে।

বাস কেনার কয়েক মাস পরই বাবা চিরতরে চলে যান। তবে বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে আজও লড়ে চলেছেন ডলি দেবী। প্রতিদিন ভোরে উঠে বোন খাবার তৈরি করে দেন। খাবার নিয়ে কোনা ৫৭ বাস স্টপেজে হাজির হন। কোনা-হাওড়া স্টেশন, কোনা-ধর্মতলা। প্রতিদিন ৪-৫ ট্রিপ সেরে রাত ৯.৩০ বা ১০ নাগাদ বাড়ি ফরে স্নান ভাত খেয়ে বিছানায় যান, তারপর আবার ভোরে উঠে দিন শুরু। বর্তমানে পরিবার বলতে, নিজের কোনও সন্তান নেই। স্বামী-স্ত্রী, বোন ভাইদের নিয়ে সংসার। এভাবেই ভালো থাকতে চান ডলি-দেবী।

Exit mobile version