Who Are Houthis Yemen: পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমশ বাড়ছে উত্তেজনা। তারই মধ্যে লোহিত সাগরে (রেড সি) হামলার মুখে পড়েছে ভারতীয় পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজ। ইয়েমেনের জলসীমার কাছে একটি প্রক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে এমএসভি ফাইজে নূরে ওলিয়া নামের জাহাজটি উল্টে ডুবে যায়। জাহাজে থাকা ১৪ জন নাবিক—যাঁদের মধ্যে ১৩ জন ভারতীয় এবং একজন ইয়েমেনি নাগরিক—ইয়েমেনের নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের যৌথ অভিযানে উদ্ধার হন।
এই ঘটনার পর ভারতের বিদেশ মন্ত্রক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার সরাসরি এই হামলার জন্য হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে। প্রশ্ন উঠছে—কারা এই হুথিরা? কেন বারবার লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা চালাচ্ছে?
কারা এই হুথি?
হুথি, যাদের আনসার আল্লাহ (Ansar Allah) নামেও পরিচিত, ইয়েমেনের একটি শিয়া ইসলামপন্থী রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংগঠন। ১৯৯০-এর দশকে উত্তর ইয়েমেনে বসবাসকারী জায়েদি শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষার দাবিতে এই সংগঠনের উত্থান হয়।
প্রথমদিকে তাদের মূল দাবি ছিল রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং উত্তর ইয়েমেনে বেশি স্বায়ত্তশাসন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা একটি শক্তিশালী সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠনে পরিণত হয়।
কীভাবে শুরু হয় সংঘাত?
২০০০ সালের শুরুর দিকে হুথিরা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহ-এর সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। তাদের লক্ষ্য ছিল উত্তর ইয়েমেনের সা’দা (Sa’dah) প্রদেশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
২০১১ সালে আরব বসন্ত আন্দোলনের জেরে প্রেসিডেন্ট সালেহ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর আবদরাব্বুহ মনসুর হাদি ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট হন। কিন্তু তাঁর আমলেও হুথিরা বিদ্রোহ চালিয়ে যায়।
কীভাবে ইয়েমেনের রাজধানী দখল করে হুথিরা?
২০১৪ সালে হুথি বিদ্রোহীরা উত্তর ইয়েমেন থেকে অগ্রসর হয়ে রাজধানী সানা দখল করে। এরপরই শুরু হয় ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ।
হুথিদের দখলের মুখে প্রেসিডেন্ট হাদি পদত্যাগ করলেও পরে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তাঁকে দেশ ছেড়ে সৌদি আরবে পালিয়ে যেতে হয়। এরপর থেকেই হাদি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নির্বাসিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচিত হন।
ইরানের সঙ্গে কী সম্পর্ক?
হুথিরা নিজেদের ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষের অংশ বলে দাবি করে। এই জোটে রয়েছে—
লেবাননের হিজবুল্লাহ
গাজার হামাস
ইরান-সমর্থিত আরও কয়েকটি গোষ্ঠী
এই জোটের মূল লক্ষ্য পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল এবং পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাব কমানো।
পশ্চিমা দেশ ও সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে ইরান হুথিদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ এবং সামরিক সহায়তা দিয়ে থাকে। যদিও ইরান এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে।
সৌদি আরবের সঙ্গে কেন সংঘাত?
২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করে, যাতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা যায়।
তারপর থেকে সৌদি জোট এবং হুথিদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ চলছে। ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি হলেও সংঘাত পুরোপুরি থামেনি।
কেন লোহিত সাগরে হামলা চালায় হুথিরা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, লোহিত সাগর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার মধ্যে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথ ব্যবহার করে।
হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা এই পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য অস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার বলেছে, হুথিদের এই হামলা শুধু জাহাজে আক্রমণ নয়, বরং—
বন্দরগুলোর নিরাপত্তা বিপন্ন করছে,
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করছে,
আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে,
ইয়েমেনের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করছে।
ভারতীয় জাহাজে হামলা নিয়ে কী বলেছে ইয়েমেন?
ইয়েমেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রক এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে “হুথিদের সন্ত্রাসী হামলা” বলে উল্লেখ করেছে।
তাদের দাবি, হুথিরা দীর্ঘদিন ধরে—
শহরে হামলা চালাচ্ছে,
বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে আক্রমণ করছে,
রপ্তানি ব্যাহত করছে,
লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালী এবং এডেন উপসাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে বিপন্ন করছে।
ভারতের প্রতিক্রিয়া
ভারতের বিদেশ মন্ত্রক এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কেন্দ্রীয় জাহাজ পরিবহণ মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল জানিয়েছেন, জাহাজটি একটি প্রক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ডুবে যায়। তবে ইয়েমেনের নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের দ্রুত তৎপরতায় জাহাজের সব ১৪ জন নাবিককে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজা যুদ্ধ এবং পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের আবহে হুথিরা এখন কেবল ইয়েমেনের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী নয়, বরং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজে হামলার ঘটনাও সেই উদ্বেগকেই আরও জোরালো করে তুলেছে।
