Tarique Rahman Dinesh Trivedi Meeting: বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ফের কোন পথে এগোবে—সেই প্রশ্নের মধ্যেই ঢাকায় ঘটল গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাক্ষাৎ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে আলোচনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ জায়গাগুলির একটি হয়ে উঠেছে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানোর দাবি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে, ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাবে।
শুধু শেখ হাসিনার বিষয়ই নয়, শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও ভারতের কাছে অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি দুই দেশের সম্পর্ককে ইতিবাচক পথে ফেরানো, পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা এবং সংবেদনশীল বিষয়গুলিতে একে অপরের অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
তারেক রহমানের সঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকে কী আলোচনা?
সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে তারেক রহমানের সঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদীর এই সাক্ষাৎ হয়। বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় হাইকমিশনারকে স্বাগত জানান। এরপর ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়ার পর গত দুই মাসের অভিজ্ঞতার কথাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভাগ করে নেন দীনেশ ত্রিবেদী।
এই বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা হয়। তবে বৈঠকে ঠিক কোন কোন বিষয়ে কতটা বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ্যে আসেনি।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঢাকা চাইছে, ভারতে থাকা শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত এগোক। পাশাপাশি শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদেরও বাংলাদেশে ফেরানোর অনুরোধ ভারতের কাছে পুনরায় জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ বৈঠকে একদিকে যেমন সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা রয়েছে, তেমনই বাংলাদেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশার কথাও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।
দীনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ
দীনেশ ত্রিবেদী গত জুন মাসে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২৫ জুন রাষ্ট্রপতির কাছে পরিচয়পত্র পেশ করার মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব শুরু করেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের সঙ্গে এটাই ছিল তাঁর প্রথম সৌজন্য সাক্ষাৎ। এর আগে অবশ্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে তাঁর একাধিক বৈঠক হয়েছে।
দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি একজন কূটনীতিক হিসেবে দীর্ঘদিনের কর্মজীবন থেকে আসেননি; বরং অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁকে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার করা হয়েছে। তিনি আগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন এবং ২০২১ সালে বিজেপিতে যোগ দেন।
ভারতের তরফে এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঢাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্তকে দুই দেশের রাজনৈতিক যোগাযোগ নতুন করে সক্রিয় করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তার আগে কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন ভারতীয় হাইকমিশনার?
তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের ঠিক আগের দিন, রবিবার বিকেলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন দীনেশ ত্রিবেদী।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় এই বৈঠক হয়। শুরুতে দুই দেশের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকলেও পরে খলিলুর রহমান ও দীনেশ ত্রিবেদী একান্তে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় আলোচনা করেন। বৈঠকটি আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল।
এর আগে ২৯ জুলাইও দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিতীয়বার বৈঠক এবং তার পরেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ—এই ধারাবাহিকতা দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই বৈঠকগুলিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন সমস্যা ও প্রত্যাশার বিষয়গুলি তুলে ধরা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
শেখ হাসিনাকে নিয়ে ঢাকার প্রধান দাবি কী?
এই মুহূর্তে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলির একটি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই তাঁকে ফেরত চেয়ে আসছে।
এবার তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাতেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেই প্রত্যাশা সামনে এসেছে। বাংলাদেশ আশা করছে, ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া দ্রুত করবে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশা জানানো হয়েছে বলে ভারত এই মুহূর্তে প্রত্যর্পণে সম্মতি দিয়েছে, এমন কোনও তথ্য এই প্রতিবেদনে নেই। বরং বিষয়টি বাংলাদেশের পক্ষের দাবি ও প্রত্যাশা হিসেবেই সামনে এসেছে।
এর আগে ভারত জানিয়েছে, শেখ হাসিনার বিষয়ে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ-অনুরোধ তারা পর্যালোচনা করছে। ফলে এই ইস্যু এখনও দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর জায়গা হয়ে রয়েছে।
শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়েও ভারতের কাছে অনুরোধ
বৈঠকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রত্যাশার তালিকায় শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নেই। সীমান্তের ওপারে অবস্থানকারী কোনও অভিযুক্ত বা মামলায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বাংলাদেশের আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় ফেরানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে এই ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে বৈঠকে কী প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে, তা প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ নেই। তাই এই মুহূর্তে এটিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো একটি অনুরোধ হিসেবেই দেখা উচিত।
সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বার্তা বাংলাদেশের
দুই দেশের সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠার ইচ্ছাও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট হয়েছে। সরকারের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করতে আগ্রহী।
সেই বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা এবং দুই দেশের স্বার্থকে। অর্থাৎ ঢাকা চাইছে, কোনও একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে সামগ্রিক সম্পর্ক যেন আটকে না থাকে।
একইসঙ্গে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে একে অপরের সংবেদনশীল বিষয়গুলির প্রতিও সম্মান দেখানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। এই বার্তা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত, বাণিজ্য, ভিসা, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ—বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের আলাদা আলাদা প্রত্যাশা রয়েছে।
দীনেশ ত্রিবেদীর আগের বক্তব্যেও ছিল সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা
এর আগে জুলাইয়ের শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে দীনেশ ত্রিবেদী জানিয়েছিলেন, ভারত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লিতে স্বাগত জানানোর জন্য আগ্রহী। তিনি বলেছিলেন, ভারত আশা করছে এই সফর খুব শীঘ্রই হবে। তবে সফরের সময়সূচি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারের উপর নির্ভর করবে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।
১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অষ্টাদশ ব্রিকস সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তারেক রহমানকে বিশেষ অতিথি হিসেবে সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে দীনেশ ত্রিবেদীর আগের বক্তব্যে উঠে এসেছিল।
ফলে তারেক রহমানের সঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদীর বর্তমান বৈঠকের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ একদিকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের মতো কঠিন ইস্যু রয়েছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে উচ্চপর্যায়ের ভারত-বাংলাদেশ রাজনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক কি নতুন পথে?
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ের টানাপোড়েনের পর এখন দুই পক্ষই সম্পর্ককে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ধীরে ধীরে বাড়ছে।
দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগও সেই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং বাংলা ভাষা ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সঙ্গে পরিচিতি তাঁকে ঢাকার রাজনৈতিক পরিবেশ বুঝতে সাহায্য করতে পারে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
তবে সম্পর্কের সামনে এখনও বেশ কিছু কঠিন প্রশ্ন রয়েছে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ তার মধ্যে সবচেয়ে বড়। তার পাশাপাশি সীমান্ত, বাণিজ্য, জ্বালানি, যাতায়াত এবং দুই দেশের মানুষের যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ।
তারেক রহমান ও দীনেশ ত্রিবেদীর এই সাক্ষাৎকে শুধুমাত্র একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা ধরা পড়বে না। একদিকে বাংলাদেশ তার গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলি—বিশেষ করে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের ফেরানোর বিষয়—সামনে রাখছে। অন্যদিকে ভারতও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এখন দেখার বিষয়, এই আলোচনার পর বাস্তবে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক কতটা এগোয় এবং শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের অবস্থান আগামী দিনে কী হয়। আপাতত সবচেয়ে স্পষ্ট বার্তা একটাই—দুই দেশই আলোচনা চালিয়ে যেতে চাইছে, কিন্তু সম্পর্কের টেবিলে শেখ হাসিনার প্রশ্ন এখনও সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলির একটি।
