রাশিয়ার তেল কিনলেই বড় শাস্তি? ভারতের উপর ১০০ শতাংশ শুল্কের পথ খুলল মার্কিন সেনেট, কী রয়েছে নতুন বিলে

Russia Sanctions Bill raises possibility of 100 percent tariff on India over Russian oil imports

Russia Sanctions Bill: রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলির উপর চাপ বাড়াতে বড় পদক্ষেপ নিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেনেটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হয়েছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত একটি বিল, যেখানে রাশিয়ার জ্বালানি কিনতে থাকা বড় দেশগুলির পণ্যের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক বসানোর ক্ষমতার প্রস্তাব রয়েছে। এই তালিকায় ভারত ও চিনের মতো বড় ক্রেতার নাম রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এখনই ভারতের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়ে যায়নি। সেনেটে বিলটি পাস হওয়ার পর এবার সেটি মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে যাবে। সেখানে অনুমোদন এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই বিষয়টি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

রাশিয়ার উপর চাপ বাড়াতেই এই বিল

নতুন বিলটির মূল লক্ষ্য রাশিয়ার জ্বালানি আয় কমানো। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার অর্থনীতির উপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। রাশিয়ার তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রি থেকে যে বিপুল অর্থ আসে, সেটিকে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ভিত্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে বিলটির সমর্থকরা।

এই কারণেই শুধু রাশিয়ার উপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নয়, রাশিয়ার জ্বালানি কিনে তাদের অর্থনীতিকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে এমন দেশগুলিকেও চাপের আওতায় আনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। মার্কিন সেনেটে পাস হওয়া নতুন ব্যবস্থায় রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বিলটির সমর্থকদের বক্তব্য, রাশিয়ার জ্বালানি থেকে আয় কমাতে হলে শুধু মস্কোর উপর নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়; বড় ক্রেতা দেশগুলিকেও অর্থনৈতিকভাবে নিরুৎসাহিত করতে হবে।

ভারতের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত?

ভারত এই পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গত কয়েক বছরে রাশিয়া ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে রাশিয়ার তেল তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাওয়ায় ভারতীয় সংস্থাগুলি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রুশ তেল আমদানি করেছে।

এখন মার্কিন বিলের প্রস্তাবিত ব্যবস্থা কার্যকর হলে ভারতের উপর সরাসরি প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ বিলটিতে রাশিয়ার জ্বালানি কেনা বড় দেশগুলির পণ্যের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। ভারত সেই সম্ভাব্য প্রভাবের তালিকায় রয়েছে।

তবে এটিকে এই মুহূর্তে ‘ভারতের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে’ বলে বলা ঠিক হবে না। সেনেটের পাস করা বিলটি প্রথমে মার্কিন আইন প্রণয়নের আরও ধাপ পেরোবে। তারপর প্রেসিডেন্টের হাতে যে ক্ষমতা থাকবে, তার ভিত্তিতে শুল্কের মাত্রা নির্ধারণের বিষয়টি সামনে আসবে। অর্থাৎ সম্ভাব্য শুল্কের সর্বোচ্চ সীমা ১০০ শতাংশ হলেও সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হচ্ছে না।

৮৬-১১ ভোটে সেনেটে পাস

বিলটি মার্কিন সেনেটে ৮৬-১১ ভোটে পাস হয়েছে। অর্থাৎ দুই দলের সদস্যদের বড় অংশই এই ব্যবস্থাকে সমর্থন করেছেন। বিলটি এখন মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের দিকে যাবে। সেখানে কী ধরনের আলোচনা ও সংশোধন হয়, সেটিই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এই বিলটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’। প্রয়াত মার্কিন সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে বিলটির নামকরণ করা হয়েছে। তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার অন্যতম প্রবল সমর্থক ছিলেন। বিলটির পক্ষে সেনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল-সহ দুই দলের একাধিক সদস্য কাজ করেছেন।

জুলাই মাসেই ৬০-এর বেশি সেনেটর এই আইনকে সমর্থন করেছিলেন। সেই সময় থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, বিলটি সেনেটে উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেতে চলেছে।

শুধু ভারত নয়, আরও দেশ পড়তে পারে চাপের মুখে

প্রস্তাবিত ব্যবস্থাটি শুধু ভারতকে লক্ষ্য করে তৈরি নয়। রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা অন্যান্য দেশও এর আওতায় পড়তে পারে। বিশেষ করে চিনের নাম বারবার উঠে এসেছে। এছাড়াও রাশিয়ার জ্বালানি আমদানির মাত্রার ভিত্তিতে আরও কয়েকটি দেশ সম্ভাব্যভাবে এই ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে।

বিলের কাঠামো অনুযায়ী, রাশিয়ার জ্বালানি কেনার সঙ্গে যুক্ত দেশগুলির পণ্যের উপর শুল্ক বসিয়ে তাদের উপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করাই উদ্দেশ্য। ফলে বিষয়টি শুধু রাশিয়া-আমেরিকা সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার এবং আমেরিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলির বাণিজ্য সম্পর্কেও পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের কাছে তাই প্রশ্নটি শুধু ‘ভারতের উপর শুল্ক হবে কি না’ নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, এই আইন কার্যকর হলে ভারত কীভাবে তার রুশ জ্বালানি আমদানি এবং মার্কিন বাজারের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক—দুই দিকের ভারসাম্য বজায় রাখবে।

ভারতের জন্য সম্ভাব্য প্রভাব কোথায়?

ভারতের উপর এমন শুল্ক কার্যকর হলে তার প্রভাব সরাসরি শুধু রাশিয়া থেকে তেল আমদানির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না। মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও প্রভাবিত হতে পারে। অতিরিক্ত শুল্কের ফলে ভারতীয় পণ্য আমেরিকায় তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।

তবে ঠিক কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত মার্কিন আইনটি কোন রূপে কার্যকর হয় এবং প্রেসিডেন্ট কী মাত্রায় শুল্ক আরোপ করেন তার উপর। বর্তমানে ১০০ শতাংশকে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য মাত্রা হিসেবে দেখা হচ্ছে, নিশ্চিত কার্যকর হার হিসেবে নয়।

অন্যদিকে ভারত দীর্ঘদিন ধরে বলে এসেছে যে রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের জন্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করার বৃহত্তর অর্থনৈতিক হিসাবের অংশ। ফলে এই ধরনের মার্কিন চাপ ভারতের বিদেশনীতি এবং জ্বালানি আমদানি নীতির উপরও নতুন করে চাপ তৈরি করতে পারে।

বিল এখন কোথায় দাঁড়িয়ে?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সেনেটে বিল পাস হওয়া মানেই আইনটি এখনই কার্যকর হয়ে যাওয়া নয়। এবার মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে বিলটির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। সেখানে অনুমোদন পাওয়ার পরই পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এগোবে।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ—বিলটি প্রেসিডেন্টকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলছে। অর্থাৎ এটি কোনও স্বয়ংক্রিয় ১০০ শতাংশ শুল্ক নয়। কোন দেশের ক্ষেত্রে কতটা শুল্ক আরোপ করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক পদক্ষেপের উপর নির্ভর করবে।

ফলে আপাতত ভারতের সামনে পরিস্থিতিটি সম্ভাব্য বাণিজ্যিক চাপের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে। একইসঙ্গে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং ভারতের রাশিয়া-নীতি—দুই ক্ষেত্রেই আগামী দিনের কূটনৈতিক আলোচনার গুরুত্ব আরও বাড়ল।

#RussiaSanctionsBill #IndiaTariff #USSenate #RussiaOil #IndiaRussiaTrade #USIndiaTrade #RussiaSanctions #GlobalTrade #InternationalNews

Exit mobile version