Snakes Evolution: আজকের সাপকে দেখলে মনে হয়, পা ছাড়াই পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষ অভিযাত্রীদের একজন সে। মাটির ওপর আঁকাবাঁকা পথে ছুটে চলা, গাছের ডালে উঠে যাওয়া, বালির ওপর পিছলে না গিয়ে এগিয়ে যাওয়া কিংবা জলের মধ্যে অনায়াসে সাঁতার—সবই যেন তার স্বাভাবিক ক্ষমতা। কিন্তু এই পা-বিহীন শরীর কি সাপের শুরু থেকেই ছিল? গবেষণা ও জীবাশ্মের সূত্র বলছে, উত্তরটা এতটা সরল নয়। কোটি কোটি বছর ধরে চলা বিবর্তনের পথে সাপের পূর্বপুরুষদের শরীরে পায়ের অস্তিত্ব ছিল বলেই বিজ্ঞানীরা মনে করেন। সময়ের সঙ্গে পরিবেশের পরিবর্তন, জীবনযাত্রার ধরন এবং শরীরের অভিযোজনের ফলে সেই পা ধীরে ধীরে ছোট হয়েছে, একসময় হারিয়েও গেছে। আশ্চর্যের বিষয়, পা হারিয়েও সাপ শুধু টিকে থাকেনি—বরং পৃথিবীর নানা পরিবেশে নিজেদের জন্য তৈরি করেছে অসাধারণ চলাচলের কৌশল। এই প্রতিবেদনে জানুন, কীভাবে সাপ পা হারাল, কেন হারাল এবং পা ছাড়াই কীভাবে হয়ে উঠল প্রকৃতির অন্যতম সফল প্রাণী।
কোটি কোটি বছর আগে কি সত্যিই সাপের পা ছিল?
সাপের বিবর্তনের ইতিহাসে সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—আজকের পা-বিহীন সরীসৃপ কি একসময় পা-সহ প্রাণী ছিল? জীবাশ্ম নিয়ে গবেষণা এই প্রশ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রাচীন কিছু সাপের শরীরে পায়ের অস্তিত্ব ছিল এবং সময়ের সঙ্গে বিবর্তনের ধারায় সেই অঙ্গগুলো ক্রমশ ক্ষুদ্র হয়ে অদৃশ্য হয়েছে।
আর্জেন্টিনায় পাওয়া প্রাচীন সাপের একটি জীবাশ্ম, ‘নাজাশ রিয়োনেগ্রিনা’, এই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে বিচরণ করা এই প্রাণীর শরীরে ছোট হলেও স্পষ্ট পেছনের পায়ের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এই আবিষ্কার দেখায়, সাপের বিবর্তনের এক পর্যায়ে পা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়নি।
এছাড়া ‘টেট্রাপোডোফিস’ নামে একটি প্রাচীন সরীসৃপের জীবাশ্ম নিয়েও গবেষণা হয়েছে। সেটির চারটি পা ছিল বলে কিছু বিজ্ঞানীর ধারণা। যদিও সেটি আদৌ প্রাচীন সাপ নাকি অন্য কোনো সরীসৃপ—তা নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে বিতর্ক রয়েছে। ফলে সাপের বিবর্তনের ইতিহাস এখনও গবেষণার একটি সক্রিয় ক্ষেত্র।
তবে সামগ্রিকভাবে জীবাশ্মের প্রমাণ একটি বিষয় স্পষ্ট করে—সাপের পূর্বপুরুষদের শরীর আজকের সাপের মতো সম্পূর্ণ পা-বিহীন ছিল না। বিবর্তনের দীর্ঘ যাত্রায় তাদের শরীর ধীরে ধীরে এমনভাবে বদলেছে, যাতে পায়ের প্রয়োজনীয়তা কমে যায় এবং শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ সাপ প্রজাতি সম্পূর্ণ পা-বিহীন হয়ে ওঠে।
জিনের ভেতরেও লুকিয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া পায়ের গল্প
সাপের পা হারানোর গল্প শুধু জীবাশ্মে আটকে নেই। তাদের জিনগত গঠনেও সেই প্রাচীন ইতিহাসের কিছু চিহ্ন এখনও রয়ে গেছে। আধুনিক সাপের ভ্রূণ নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা এমন কিছু জিন ও জিন-নিয়ন্ত্রণকারী অংশের সন্ধান পেয়েছেন, যেগুলো সরীসৃপের শরীরে অঙ্গ গঠনের সঙ্গে যুক্ত।
বিশেষ করে ‘সনিক হেজহগ’ নামে পরিচিত একটি জিন পায়ের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। টিকটিকির মতো সরীসৃপের শরীরে এই জিন সক্রিয়ভাবে কাজ করলেও সাপের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা অনেকটাই বদলে গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পাইথন বা অজগরের মতো কিছু সাপের জিনগত কাঠামোয় পায়ের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী ডিএনএ অংশ অনুপস্থিত বা পরিবর্তিত হয়েছে।
এর অর্থ এই নয় যে, সাপের শরীরে পা তৈরি করার সম্পূর্ণ ক্ষমতা একদিনে হারিয়ে গেছে। বরং বিবর্তনের দীর্ঘ সময়ে তাদের জিনগত ব্যবস্থায় এমন পরিবর্তন এসেছে, যার ফলে পায়ের বিকাশ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেছে।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, কিছু সাপের শরীরে এখনও তাদের পূর্বপুরুষদের পায়ের স্মৃতি বহনকারী অবশিষ্ট কাঠামো দেখা যায়। অজগরের লেজের কাছাকাছি থাকা ছোট ‘স্পার্স’ বা কাঁটার মতো অঙ্গকে অনেক বিজ্ঞানী বিবর্তনের সেই হারিয়ে যাওয়া পায়ের অবশেষ হিসেবে দেখেন।
অর্থাৎ, সাপের শরীর যেন এখনও তার বিবর্তনের পুরোনো গল্প বলে চলেছে—একসময় যে প্রাণীর শরীরে পা ছিল, আজ তার বংশধর সেই পা ছাড়াই পৃথিবীর নানা প্রান্তে সফলভাবে বেঁচে আছে।
কেন বিবর্তনের পথে সাপ পা হারাল?
এখানেই সবচেয়ে বড় রহস্য। পা তো সাধারণত প্রাণীদের চলাফেরা, শিকার ধরা এবং শিকারির হাত থেকে পালানোর ক্ষেত্রে সাহায্য করে। তাহলে সাপ কেন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হারাল?
বিজ্ঞানীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো, প্রাচীন সাপের জীবনযাত্রা ও পরিবেশের সঙ্গে এই পরিবর্তনের গভীর সম্পর্ক ছিল। যদি কোনো প্রাণী এমন পরিবেশে বসবাস করে যেখানে পা তার জন্য সুবিধার বদলে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বিবর্তনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সেই অঙ্গের গুরুত্ব কমে যেতে পারে।
অনেক গবেষকের ধারণা, প্রাচীন সাপের কিছু পূর্বপুরুষ মাটির নিচের গর্ত, পাথরের ফাঁক কিংবা ঘন উদ্ভিদের মধ্যকার সরু জায়গায় চলাচল করত। সেখানে লম্বা ও নমনীয় শরীর নিয়ে এগিয়ে যাওয়া তুলনামূলক সহজ ছিল। কিন্তু শরীরের পাশে থাকা পা সেই সংকীর্ণ পথে চলাচলের সময় বাধা তৈরি করতে পারত।
ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এমন শারীরিক বৈশিষ্ট্য টিকে থাকতে পারে, যা সাপকে আরও দক্ষতার সঙ্গে সরু জায়গার মধ্যে চলাচল করতে সাহায্য করেছে। ধীরে ধীরে পায়ের আকার ছোট হয়েছে এবং একসময় তা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেছে।
বর্তমানেও এমন কিছু সাপ রয়েছে যারা জীবনের বড় অংশ মাটির নিচে কাটায়। ‘ব্লাইন্ড স্নেক’ বা অন্ধ সাপ তার একটি উদাহরণ। নরম মাটির ভেতর দিয়ে চলাচলের জন্য তাদের দীর্ঘ, সরু শরীর অত্যন্ত কার্যকর। তাদের চোখও অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং দৃষ্টিশক্তি খুব সীমিত।
অর্থাৎ, পা হারানো সম্ভবত সাপের জন্য কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং নির্দিষ্ট পরিবেশে টিকে থাকার জন্য দীর্ঘ বিবর্তনীয় অভিযোজনের ফল।
পা নেই, তবু এত দ্রুত চলে কীভাবে?
সাপের সবচেয়ে বড় শক্তি তার পা নয়, তার পুরো শরীর। মানুষের মেরুদণ্ডে তুলনামূলকভাবে সীমিত সংখ্যক কশেরুকা থাকলেও সাপের শরীরে প্রজাতিভেদে শত শত কশেরুকা থাকতে পারে। এই বিপুল সংখ্যক কশেরুকা এবং শক্তিশালী পেশির সমন্বয় সাপের শরীরকে অসাধারণ নমনীয় করে তুলেছে।
সাপের পেটের দিকের চওড়া আঁশও চলাচলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। মাটির সঙ্গে ঘর্ষণ তৈরি করে এই আঁশ সাপকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। শরীরের একাধিক অংশকে বিভিন্ন সময়ে মাটির সঙ্গে ঠেকিয়ে সাপ নিজের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে।
সাপের সবচেয়ে পরিচিত চলার ধরন হলো আঁকাবাঁকা বা তরঙ্গের মতো চলা। শরীরকে ইংরেজি ‘এস’ অক্ষরের মতো বাঁকিয়ে সাপ চারপাশের মাটি, পাথর, ঘাস কিংবা অন্যান্য পৃষ্ঠের ওপর চাপ তৈরি করে সামনে এগিয়ে যায়।
তবে সব সাপ একইভাবে চলে না। পরিবেশ অনুযায়ী তাদের চলাচলের কৌশলও বদলে যায়। অজগরের মতো বড় সাপ অনেক সময় পেটের পেশি ব্যবহার করে তুলনামূলক সরলভাবে এগিয়ে যায়। আবার সংকীর্ণ গর্ত বা সুড়ঙ্গে বসবাসকারী সাপ ‘কনসার্টিনা’ ধরনের চলাচল ব্যবহার করতে পারে। এক্ষেত্রে শরীরের একটি অংশ স্থির রেখে অন্য অংশ সামনে এগিয়ে নেয়, পরে পিছনের অংশটিকেও টেনে আনে।
অর্থাৎ, সাপের শরীর নিজেই যেন একটি চলন্ত যন্ত্র। পা হারিয়ে তারা এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে শরীরের প্রতিটি বাঁক এবং পেশির প্রতিটি সংকোচন সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তিতে পরিণত হয়।
মরুভূমি থেকে গাছ, জল থেকে মাটির নিচে—সবখানেই সাপের অভিযোজন
সাপের বিবর্তনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো তাদের পরিবেশ অনুযায়ী চলাচলের বৈচিত্র্য। পা না থাকলেও তারা পৃথিবীর প্রায় সব ধরনের পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে।
মরুভূমির কিছু সাপ উত্তপ্ত ও নরম বালুর ওপর চলার জন্য বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে। ‘সাইডওয়াইন্ডিং’ পদ্ধতিতে তারা শরীরের খুব অল্প অংশ একসঙ্গে মাটির সংস্পর্শে রাখে। ফলে গরম বালুর সঙ্গে শরীরের সংস্পর্শ কম হয় এবং বালিতে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনাও কমে।
আবার কিছু সাপ গাছে ওঠার ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষ। শরীরের পেশি, আঁশ এবং নমনীয় কশেরুকার সাহায্যে তারা গাছের কাণ্ড ও ডাল আঁকড়ে ধরে উপরে উঠে যায়। কিছু প্রজাতি আবার এক গাছ থেকে অন্য গাছে যাওয়ার সময় শরীরকে এমনভাবে প্রসারিত করতে পারে যে তারা বাতাসের মধ্যে ভেসে যাওয়ার মতো দেখায়।
জলের ক্ষেত্রেও সাপ দক্ষ সাঁতারু। শরীরকে তরঙ্গের মতো বাঁকিয়ে তারা পানিতে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, যে অঙ্গকে আমরা চলাচলের জন্য অপরিহার্য মনে করি—সাপ সেই অঙ্গ ছাড়াই চলাফেরার একাধিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে।
এই কারণেই অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব মহাদেশ ও নানা পরিবেশে সাপের উপস্থিতি দেখা যায়। বন, মরুভূমি, জলাভূমি, নদী, সমুদ্র কিংবা মাটির গভীর গর্ত—প্রতিটি পরিবেশে কোনো না কোনো সাপ নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে।
সাপের পা হারানো কি আসলে দুর্বলতা, নাকি বিবর্তনের সাফল্য?
সাপকে দেখলে অনেকের মনে হতে পারে, পা না থাকা নিশ্চয়ই তাদের একটি সীমাবদ্ধতা। কিন্তু বিবর্তনের দৃষ্টিতে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো প্রাণীর শরীরে একটি অঙ্গ আছে কি নেই—তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই প্রাণীটি তার পরিবেশের সঙ্গে কতটা সফলভাবে মানিয়ে নিতে পারছে।
সাপের ক্ষেত্রে পা হারানো তাদের দুর্বল করেনি। বরং দীর্ঘ ও নমনীয় শরীর, শক্তিশালী পেশি, বিশেষ আঁশ এবং নানা ধরনের চলাচলের কৌশল তাদের পৃথিবীর বিভিন্ন পরিবেশে টিকে থাকার সুযোগ দিয়েছে।
আজ একটি সাপ মাটির ওপর আঁকাবাঁকা পথে ছুটতে পারে, আবার অন্য একটি সাপ বালির ওপর পাশ ফিরে এগোতে পারে। কেউ মাটির নিচে গর্ত করে জীবন কাটায়, কেউ গাছে ওঠে, কেউ পানিতে সাঁতার কাটে। একই প্রাণীগোষ্ঠীর মধ্যে এমন বৈচিত্র্যই দেখিয়ে দেয়, বিবর্তন কোনো নির্দিষ্ট শরীরের নকশাকে চিরস্থায়ী করে রাখে না।
পরিবেশ বদলালে প্রাণীর শরীরও বদলায়। যে অঙ্গ একসময় প্রয়োজনীয় ছিল, সময়ের সঙ্গে তা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যেতে পারে। আবার সেই অঙ্গের পরিবর্তে শরীরের অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
সাপের গল্প তাই শুধু পা হারানোর গল্প নয়। এটি প্রকৃতির এক অসাধারণ শিক্ষা—বেঁচে থাকার জন্য সবসময় বেশি অঙ্গ বা বেশি শক্তি প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন পরিবেশকে বুঝে নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতা। কোটি কোটি বছরের বিবর্তনে সাপ সেই অভিযোজনেরই এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
