নিউ মার্কেটের হোটেলকাণ্ডে বীরেশ্বর মিত্র কেন গ্রেফতার? এবার পুলিশের স্ক্যানারে কার নাম?

New Market Hotel Fire Case: Bireshwar Mitra arrest and investigation in Kolkata hotel fire

New Market Hotel Fire Case: নিউ মার্কেট এলাকার অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে হোটেলের মালিকানা, লিজ, অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দায়িত্ব নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তদন্তের সূত্রে বীরেশ্বর মিত্রকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, তিনি যখন কয়েক মাস আগেই হোটেল পরিচালনার জায়গাটি অন্য ব্যক্তিকে লিজ দিয়ে দিয়েছিলেন, তখন এই ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি কোথায়?

তদন্তকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি শুধু হোটেলটি কে চালাচ্ছিল, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অগ্নি-নিরাপত্তার অনুমোদন, ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সেই ব্যবস্থার দায়িত্ব কার ছিল—এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিও। অন্যদিকে বীরেশ্বর মিত্রের আইনজীবীর দাবি, তিনি তো কয়েক মাস আগেই জায়গাটি লিজ দিয়ে দিয়েছিলেন। তাহলে পরবর্তী সময়ে সেখানে কীভাবে হোটেল পরিচালিত হয়েছে, তার দায় তাঁর উপরে কতটা বর্তাবে, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

পাঁচ মাস আগে লিজ, তারপরও কেন বীরেশ্বর মিত্রের নাম তদন্তে?

তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, বীরেশ্বর মিত্র আগে ‘অঞ্জনা রিসোর্স’ নামে একটি সংস্থার মাধ্যমে ওই হোটেল পরিচালনা করতেন। পরে চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল তিনি ওই জায়গাটি আবু জাফরকে লিজ দেন। জায়গাটির আয়তন ছিল প্রায় ৭০০ বর্গফুট। সেখানে পাঁচটি কক্ষ তৈরি করে হোটেল পরিচালনা করা হচ্ছিল বলে তদন্তে জানা যাচ্ছে।

অভিযোগের বিষয়টি এখানেই জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ জায়গাটি লিজ দেওয়ার পর হোটেল পরিচালনার সঙ্গে আবু জাফরের নাম সামনে এলেও, ভবনটির অগ্নি-নিরাপত্তা সংক্রান্ত আগের অনুমোদনের সঙ্গে বীরেশ্বর মিত্রের নাম যুক্ত ছিল বলে তদন্তকারী পক্ষের বক্তব্য।

বীরেশ্বর মিত্রের আইনজীবী গোপাল হালদারের প্রশ্ন, জায়গাটি যখন কয়েক মাস আগেই অন্য ব্যক্তিকে লিজ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তীতে অন্য নামে হোটেল পরিচালিত হচ্ছিল, তখন বীরেশ্বর মিত্রকে এই ঘটনার জন্য কীভাবে দায়ী করা যায়? তাঁর বক্তব্যের মূল প্রশ্ন ছিল—লিজ দেওয়ার পর হোটেলটি কীভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং সেখানে কী ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, তার প্রত্যক্ষ দায়িত্ব কার ছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন তদন্তের পরবর্তী ধাপ এগোচ্ছে।

অগ্নি-নিরাপত্তার অনুমোদনই কি গ্রেফতারের অন্যতম কারণ?

সরকারি পক্ষের আইনজীবী অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্যে উঠে এসেছে তদন্তের আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। তাঁর দাবি, বীরেশ্বর মিত্র যখন আগে ওই হোটেল পরিচালনা করতেন, তখন ভবনটির অগ্নি-নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুমোদন তাঁর নামেই ছিল। অর্থাৎ ভবনটির অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁর নাম সরাসরি যুক্ত ছিল বলে সরকারি পক্ষ মনে করছে।

এই জায়গাতেই তদন্তকারীদের যুক্তি এবং বীরেশ্বর মিত্রের আইনজীবীর যুক্তির মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

সরকারি পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু জায়গাটি অন্য ব্যক্তিকে লিজ দিয়ে দিলেই পূর্বের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে যায় না, বিশেষ করে যদি ভবনের অগ্নি-নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুমোদন আগের মালিক বা পরিচালনাকারীর নামেই থেকে থাকে। সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, সেই বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ছিল কি না এবং কোনো ঘাটতি সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আসছে।

অন্যদিকে আবু জাফরের নামে ওই অগ্নি-নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুমোদন ছিল না বলে সরকারি পক্ষের বক্তব্য। ফলে জায়গাটি লিজ নেওয়ার পর নতুন করে কী ধরনের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল, আদৌ নেওয়া হয়েছিল কি না এবং হোটেলটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছিল—এই প্রশ্নগুলিও এখন সামনে এসেছে।

ইচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগ নয়, কিন্তু জ্ঞানের প্রশ্ন কেন উঠছে?

তদন্তে যে আইনি ধারা প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৫ নম্বর ধারাও রয়েছে। তবে পুরো বিষয়টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। এখানে সরাসরি কাউকে মেরে ফেলার ইচ্ছা ছিল— এমন অভিযোগের কথা বলা হচ্ছে না।

বরং প্রশ্ন উঠছে, এমন একটি জায়গায় হোটেল পরিচালিত হচ্ছিল কিনা, যেখানে পর্যাপ্ত অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না এবং সেই পরিস্থিতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কতটা অবগত ছিলেন।

অর্থাৎ বিষয়টি ইচ্ছাকৃত হত্যার উদ্দেশ্যের চেয়ে জ্ঞান এবং সম্ভাব্য বিপদের বিষয়টির সঙ্গে বেশি যুক্ত বলে সরকারি পক্ষের বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে। একটি ঘিঞ্জি এলাকায় বহু মানুষ যাতায়াত করেন বা অবস্থান করেন, এমন একটি ভবনে যদি অগ্নি-নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে সেখানে দুর্ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে—এই সম্ভাবনাটিই তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, বীরেশ্বর মিত্র ওই পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতেন কি না। যদি জানতেন, তাহলে কেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, কেন নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা হয়নি এবং অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে সেই ব্যবস্থা কার্যকর ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।

আবু জাফর গ্রেফতার, স্ত্রী সাবা জাফর এখনও পলাতক

এই ঘটনায় শুধু বীরেশ্বর মিত্র নন, আবু জাফরকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, আবু জাফর ঘটনাস্থল থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। পরে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

আবু জাফরের স্ত্রী সাবা জাফরের নামও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ লিজ সংক্রান্ত নথিতে তাঁর নাম রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। বর্তমানে তিনি পলাতক বলে তদন্তকারী সূত্রে দাবি করা হয়েছে। ফলে তাঁকেও জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

তদন্তকারীদের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, লিজ নেওয়ার পর হোটেলটি কীভাবে পরিচালনা করা হচ্ছিল। হোটেলে প্রবেশের ব্যবস্থা কী ছিল, নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়ম মানা হচ্ছিল কি না, অগ্নি-নিরাপত্তার অনুমোদন সম্পর্কে আবু জাফর জানতেন কি না, এবং বীরেশ্বর মিত্র তাঁকে ওই বিষয়ে কোনো তথ্য জানিয়েছিলেন কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

আরও একটি হোটেল থেকে আটক দুই ব্যক্তি

তদন্তের পরিধি আরও বাড়িয়েছে বীরেশ্বর মিত্রের সঙ্গে যুক্ত অন্য একটি হোটেল। মির্জা গলি বা ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এলাকায় তাঁর আরও একটি হোটেল রয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

সেখান থেকে নিউ মার্কেট থানার পুলিশ দুজনকে আটক করেছে বলে জানানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন হোটেলের ব্যবস্থাপক সন্দীপ এবং অন্যজন কর্মী আছে বলে জানা যাচ্ছে।

তদন্তকারীরা এখন ওই হোটেলের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিচালনার পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছেন। একই ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত একাধিক হোটেলের ক্ষেত্রে অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, সেই বিষয়টিও তদন্তের পরিধিতে আসতে পারে।

এখন তদন্তের কেন্দ্রে একাধিক প্রশ্ন

বীরেশ্বর মিত্রকে গ্রেফতারের পর তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মূলত কয়েকটি প্রশ্ন। প্রথমত, ২৬ এপ্রিল জায়গাটি লিজ দেওয়ার পর হোটেলটির পরিচালনার দায়িত্ব কার হাতে ছিল। দ্বিতীয়ত, ভবনটির অগ্নি-নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুমোদন কার নামে ছিল। তৃতীয়ত, বাস্তবে সেখানে অগ্নি-নিরাপত্তার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল।

এর পাশাপাশি তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, বীরেশ্বর মিত্র অগ্নি-নিরাপত্তার ঘাটতি সম্পর্কে আগে থেকেই জানতেন কি না। যদি জানতেন, তাহলে কেন সেই ঘাটতি দূর করার চেষ্টা করা হয়নি? আবার লিজ নেওয়ার পর আবু জাফর ওই অনুমোদনের বিষয়টি জানতেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

আরও একটি প্রশ্ন হল, ভবনের অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা যদি আগে থেকে কার্যকর থাকে, তাহলে পরবর্তীতে তা কীভাবে পরিবর্তিত বা অকার্যকর হয়ে গেল। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছিল কি না, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্ব কে নিয়েছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ও জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে স্পষ্ট করার চেষ্টা চলছে।

অর্থাৎ, বীরেশ্বর মিত্রের গ্রেফতারের বিষয়টি শুধু তিনি হোটেলটি চালাতেন কি না, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর নামে থাকা অগ্নি-নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুমোদন, ভবনের নিরাপত্তা সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান এবং জায়গাটি লিজ দেওয়ার পরও তাঁর কোনো দায়িত্ব অব্যাহত ছিল কি না—এই সবকিছুকে সামনে রেখেই তদন্ত এগোচ্ছে।

অন্যদিকে তাঁর আইনজীবীর বক্তব্যের মূল প্রশ্নও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ—যদি কয়েক মাস আগেই জায়গাটি অন্য ব্যক্তিকে লিজ দিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী সময়ে সেখানে কীভাবে হোটেল পরিচালিত হয়েছে এবং সেই সময়ের অনিয়মের জন্য আগের মালিক বা পরিচালনাকারীর দায় কতটা, তা প্রমাণের বিষয়।

তাই এখন বীরেশ্বর মিত্রের গ্রেফতারের পর তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হল জিজ্ঞাসাবাদ। কী ঘটেছিল, কে কোন দায়িত্বে ছিলেন, অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেন যথাযথ ছিল না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সেই ঘাটতি সম্পর্কে কতটা জানতেন—এই প্রশ্নগুলির উত্তরই শেষ পর্যন্ত এই মামলায় প্রত্যেকের ভূমিকা স্পষ্ট করতে পারে।

#NewMarketHotelFireCase #BireshwarMitra #NewMarketHotelFire #KolkataNews #HotelFire #FireInvestigation #NewMarketNews

Exit mobile version