Defence Expansion Projects: পশ্চিমবঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্প ও জাহাজ নির্মাণের পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একসঙ্গে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। কলকাতা থেকে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স এবং যন্ত্র ইন্ডিয়া লিমিটেডের মোট পাঁচটি প্রকল্পের কাজের সূচনা করেন। এই পাঁচ প্রকল্পে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা জানানো হয়েছে। প্রকল্পগুলির মধ্যে তিনটি গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্সের এবং দুটি যন্ত্র ইন্ডিয়া লিমিটেডের।
এই উদ্যোগের গুরুত্ব শুধু নতুন কারখানা বা উৎপাদন পরিকাঠামো তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদনে আত্মনির্ভরতা বাড়ানো, বিদেশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আমদানির নির্ভরতা কমানো, দেশীয় শিল্পকে প্রতিরক্ষা উৎপাদনের সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় পণ্যের জায়গা তৈরি করার বৃহত্তর লক্ষ্য। রাজনাথ সিংয়ের বক্তব্যেও সেই বার্তাই স্পষ্ট—ভারতের লক্ষ্য শুধু বিশ্বের কাছ থেকে কী কিনবে, তা নয়; বরং ভারত বিশ্বকে কী দিতে পারবে, সেই সক্ষমতা তৈরি করাই এখন বড় লক্ষ্য।
পাঁচ প্রকল্পে কী হচ্ছে, কোথায় হচ্ছে?
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা পাঁচটি প্রকল্পের মধ্যে গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্সের তিনটি সম্প্রসারণ প্রকল্প রয়েছে। কলকাতার খিদিরপুর, শালিমার এবং রায়চকে এই পরিকাঠামোগুলি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ইছাপুরের যন্ত্র ইন্ডিয়া লিমিটেডের ধাতু ও ইস্পাত কারখানায় দুটি বড় উৎপাদন পরিকাঠামোর কাজ শুরু হচ্ছে। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের অনুষ্ঠানগুলি একই সময়ে কলকাতার খিদিরপুর, শালিমার, রায়চাক এবং ইছাপুরে অনুষ্ঠিত হয়।
গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স হুগলি নদীর দুই তীরে দুটি ছোট জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্রের জন্য শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বন্দরের সঙ্গে ইজারা চুক্তি করেছে। এর পাশাপাশি রায়চকে প্রায় ৩২ একর নদীতীরবর্তী জমিতে বড় পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এই সম্প্রসারণের ফলে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ ও মেরামতির পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি বাণিজ্যিক জাহাজ তৈরির সক্ষমতাও বাড়বে।
রায়চকের প্রকল্পটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে প্রায় ৩৫৬ মিটার নদীতীর, ৯৬ মিটারের জেটি, শুকনো জাহাজ মেরামত ঘাট, জাহাজ নামানোর ব্যবস্থা এবং জাহাজের বিভিন্ন অংশ তৈরির পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এই কেন্দ্র থেকে বড় আকারের যুদ্ধজাহাজ এবং মাঝারি আকারের বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
শালিমারের কাঠের ভাসমান ঘাটের পরিকাঠামোও নতুন করে সাজানো হবে। সেখানে মাঝারি আকারের জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতির ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। খিদিরপুরের দামোদর পরিকাঠামোয় মাঝারি আকারের জাহাজ মেরামতির পাশাপাশি বৈদ্যুতিক ফেরি ও ছোট নৌযান তৈরির কাজেও সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
যন্ত্র ইন্ডিয়ার ইছাপুরে কী তৈরি হবে?
পাঁচটি প্রকল্পের মধ্যে বাকি দুটি ইছাপুরের যন্ত্র ইন্ডিয়া লিমিটেডের ধাতু ও ইস্পাত কারখানায়। এই দুটি প্রকল্পে মোট ৭৫০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য হল দেশীয় ধাতব উৎপাদন ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তৈরির সক্ষমতা বাড়ানো।
এর মধ্যে একটি প্রকল্পে প্রায় ২৭৭ কোটি ৫৯ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ৩ হাজার টনের ভারী জলচাপচালিত খোলা ছাঁচে ধাতু গঠনের যন্ত্র বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এটি পুরনো ২ হাজার ৬৫০ টনের যন্ত্রের পরিবর্তে কাজ করবে। এর মাধ্যমে কামানের নল, গোলাবারুদের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং ভারী ধাতব কাঠামো তৈরির সক্ষমতা বাড়বে।
অন্য প্রকল্পটির জন্য প্রায় ৪৭৩ কোটি ৮৪ লক্ষ টাকা বিনিয়োগের কথা জানানো হয়েছে। সেখানে বিশেষ সংকর ধাতুর তৈরি বিভিন্ন উপাদান, বোমার নল, অস্ত্র ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় ধাতব অংশ, রেলের অক্ষ এবং পারমাণবিক চুল্লির প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। এই দুটি কারখানাতেই আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থাৎ এই প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের শুধু চূড়ান্ত পণ্য নয়, সেই পণ্য তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও যাতে দেশে তৈরি করা যায়, সেই পরিকাঠামো গড়ে তোলা।
রাজনাথের বার্তা—শুধু কিনবে ভারত, এবার বিশ্বকে দিতে হবে
অনুষ্ঠানে রাজনাথ সিং যে বিষয়টির উপর বিশেষ জোর দিয়েছেন, তার কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের উৎপাদন ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, ভারতের সক্ষমতা যত বাড়বে, দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও তত বড় সুযোগ তৈরি হবে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের ক্ষেত্রে বিদেশের উপর নির্ভরতা ভারতের জন্য একটি বড় বাস্তবতা ছিল। এখন সেই পরিস্থিতি বদলানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি জোর দিয়েছেন। ভারতের তৈরি পণ্য যাতে বিশ্বের সেরা সংস্থাগুলির সঙ্গে গুণমানের দিক থেকে প্রতিযোগিতা করতে পারে, সেই মান অর্জন করাই হওয়া উচিত লক্ষ্য।
শুধু কম দামে পণ্য তৈরি করলেই আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা পাওয়া সম্ভব নয়। পণ্যের গুণমান, নির্ভরযোগ্যতা, সময়মতো সরবরাহ এবং প্রতিযোগিতামূলক দাম—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। ভারতীয় সংস্থাগুলিকে সেই সক্ষমতা অর্জন করতে হবে বলেই বার্তা দিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী।
ভারতের লক্ষ্য শুধু বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে দেশের চাহিদা পূরণ করা নয়। বরং এমন উৎপাদন ক্ষমতা তৈরি করতে হবে, যাতে ভারত নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশকেও প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করতে পারে। সেই জায়গাতেই দেশীয় উৎপাদনকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়ার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।
প্রতিরক্ষা উৎপাদনে দেশীয় উপাদানই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
প্রতিরক্ষা উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভারতের সামনে এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হল প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপাদানের জন্য বিদেশের উপর নির্ভরতা। একটি বড় যুদ্ধজাহাজ, অস্ত্র ব্যবস্থা বা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি করতে শুধু মূল কাঠামো তৈরি করলেই হয় না। তার ভিতরে থাকা অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যন্ত্রাংশ, বিশেষ ধাতু এবং প্রযুক্তিগত সরঞ্জামেরও প্রয়োজন হয়।
তাঁর মতে, প্রতিরক্ষা উৎপাদনে দেশীয় উপাদানের অংশ যত বাড়বে, ততই বিদেশ নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
এখানেই বেসরকারি শিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিরক্ষা উৎপাদনের ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই অংশগ্রহণ করছে। তবে সেই অংশগ্রহণ এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছয়নি বলে তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত রয়েছে। আরও বেশি শিল্প সংস্থাকে এই ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে।
দেশের শিল্পপতিরা যদি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও তার প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরিতে বিনিয়োগ করেন, তাহলে একদিকে যেমন বিদেশ থেকে আমদানির প্রয়োজন কমবে, অন্যদিকে দেশে নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান এবং সহায়ক শিল্পের সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলিও এই উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করার সঙ্গে শিল্পেরও যোগ
এই পুরো উদ্যোগের সঙ্গে দেশের নৌ-সুরক্ষার বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত। গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্সের সম্প্রসারণের ফলে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ ও মেরামতির ক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে ছোট ও মাঝারি বাণিজ্যিক জাহাজ তৈরির সুযোগও বৃদ্ধি পাবে।
রাজনাথ সিং ভারতকে ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যতম বড় জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। আন্তর্জাতিক জাহাজ নির্মাণ শিল্পে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, ভারত সেই সুযোগ গ্রহণ করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
এই লক্ষ্য পূরণ করতে গেলে শুধু সরকারি সংস্থার ক্ষমতা বাড়ালেই হবে না। প্রয়োজন হবে দক্ষ কর্মী, আধুনিক প্রযুক্তি, দেশীয় যন্ত্রাংশ, শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বেসরকারি শিল্পের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
অর্থাৎ প্রতিরক্ষা উৎপাদনের পরিকাঠামো বাড়ানোর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক শিল্পব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার একটি বড় সম্পর্ক রয়েছে। একটি বড় জাহাজ নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে শুধু মূল নির্মাতা সংস্থা নয়, অসংখ্য ছোট ও মাঝারি শিল্প, যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক, ধাতু উৎপাদক এবং পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা যুক্ত হতে পারে।
তরুণ প্রজন্ম ও বিনিয়োগকারীদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান
রাজনাথ সিংয়ের বক্তব্যে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। আত্মনির্ভর ভারতের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে শুধু সরকারি সংস্থার উপর নির্ভর করলে হবে না। নতুন প্রজন্মকে শিল্প ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে।
প্রতিরক্ষা উৎপাদন এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে আগামী দিনে বিপুল প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও উদ্ভাবনের প্রয়োজন হবে। তাই তরুণদের নতুন উদ্যোগ, গবেষণা এবং উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
রাজনাথের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের দরজাও আরও খুলবে। সেই বাজারে টিকে থাকতে হলে ভারতীয় পণ্যের মানকে বিশ্বমানের করতে হবে। একই সঙ্গে সময়মতো সরবরাহ এবং যুক্তিসঙ্গত দাম নিশ্চিত করাও জরুরি।
এই পাঁচটি প্রকল্প তাই শুধু পাঁচটি নতুন পরিকাঠামো তৈরির ঘটনা নয়। এর মধ্যে রয়েছে একটি বড় শিল্পভাবনার ইঙ্গিত—ভারত নিজের প্রতিরক্ষা প্রয়োজন মেটাবে, গুরুত্বপূর্ণ উপাদান দেশে তৈরি করবে, বেসরকারি শিল্পকে আরও যুক্ত করবে এবং সুযোগ পেলে আন্তর্জাতিক বাজারেও ভারতীয় পণ্য নিয়ে প্রতিযোগিতা করবে।
প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার এই উদ্যোগের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের শিল্প পরিকাঠামোতেও নতুন গতি আসতে পারে। কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি সহায়ক শিল্পের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
রাজনাথ সিংয়ের বার্তা স্পষ্ট—ভারতের ভবিষ্যৎ শুধু বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার মধ্যে নয়, বরং নিজের প্রযুক্তি, নিজের শিল্প এবং নিজের দক্ষতার উপর ভর করে বিশ্বকে প্রয়োজনীয় পণ্য দেওয়ার সক্ষমতা তৈরির মধ্যে। আর সেই লক্ষ্য পূরণে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি শিল্প, তরুণ প্রজন্ম এবং নতুন বিনিয়োগকারীদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
#DefenceExpansionProjects #RajnathSingh #GRSE #YantraIndia #DefenceManufacturing #DefenceProduction #SelfReliantIndia #IndianNavy #DefenceIndustry #WestBengal
