প্রতিশ্রুতি থেকে বিক্ষোভ: অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার কি এখন বাংলায় বিজেপি সরকারের কাছে অগ্নিপরীক্ষা?

Annapurna Bhandar payment protest as addresses women over Rs 3000 scheme benefits

Annapurna Bhandar: পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মহিলাদের জন্য সবচেয়ে আলোচিত জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির অন্যতম হয়ে উঠেছিল অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার। নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি ছিল, মহিলাদের মাসে ৩,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। সেই প্রতিশ্রুতিকে সামনে রেখে পুরনো লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পরিবর্তে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার চালুর ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের পরেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক—কে টাকা পাবেন, কারা বাদ পড়বেন, কেন আবেদন ও যাচাই এত জটিল, আর কেন বহু পুরনো সুবিধাভোগী এখনও টাকা পাচ্ছেন না?

গত শুক্রবার ২১ আগস্ট এই ক্ষোভ আরও প্রকাশ্যে আসে। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় মহিলারা অন্নপূর্ণা প্রকল্পের টাকা না পাওয়ার অভিযোগে বিক্ষোভ করেন। উত্তর দমদম, নিমতা ও বিরাটিতে বিক্ষোভকারীরা রেললাইনে বসে পড়ায় শিয়ালদহ-বনগাঁ শাখায় ট্রেন চলাচলও এক ঘণ্টার বেশি সময় ব্যাহত হয়।

ফলে যে প্রকল্পকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বড় প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, সেটিই এখন নতুন সরকারের কাছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক—দুই দিক থেকেই বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৩ হাজার টাকার প্রতিশ্রুতি থেকেই অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের যাত্রা

নির্বাচনের আগে বিজেপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ছিল মহিলাদের আর্থিক সহায়তা বাড়ানো। আগের সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে সাধারণ শ্রেণির মহিলারা মাসে ১,৫০০ টাকা এবং সংরক্ষিত শ্রেণির মহিলারা ১,৭০০ টাকা পেতেন। বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই সহায়তা বাড়িয়ে ৩,০০০ টাকা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রকল্পের নতুন নাম হয় অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার।

সরকারের কাছে এই প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের পরিবারের বহু মহিলার কাছে মাসিক কয়েক হাজার টাকা সংসারের বাজার, ওষুধ, সন্তানের পড়াশোনা বা অন্যান্য জরুরি খরচ মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই নির্বাচনের সময় এই প্রতিশ্রুতির সামাজিক প্রভাবও যথেষ্ট ছিল।

কিন্তু প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবায়নের মধ্যে ফারাক তৈরি হওয়াতেই সমস্যা শুরু হয়েছে। সব পুরনো সুবিধাভোগীকে একইভাবে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের আওতায় আনা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে অনেক মহিলার প্রশ্ন—যে সুবিধার প্রতিশ্রুতি ভোটের আগে দেওয়া হয়েছিল, তা পেতে নতুন করে এত যাচাই ও শর্ত কেন?

আবেদনপত্র ঘিরে কেন এত প্রশ্ন?

অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের আবেদন প্রক্রিয়া নিয়েও শুরু থেকেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের জন্য প্রকাশিত আবেদনপত্রে পরিবার সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ তথ্য চাওয়া হয়েছে। পরিচয়, ঠিকানা, আধার, রেশন কার্ড ও ব্যাঙ্কের তথ্যের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন নথি, ভোটার সংক্রান্ত তথ্য, আয়, জমি, গাড়ি, বিমা এবং অন্যান্য আর্থিক বিবরণও চাওয়া হয়েছে।

এমনকি আবেদনপত্রের আকার নিয়েও আলোচনা হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আবেদনপত্রটি ইংরেজিতে ১০ পৃষ্ঠা এবং বাংলায় ১২ পৃষ্ঠার। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—মাসিক আর্থিক সহায়তা পাওয়ার জন্য এত বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন কেন?

সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে অবশ্য উপভোক্তার পরিচয়, আয়, ব্যাঙ্কের তথ্য এবং যোগ্যতা যাচাই করা প্রয়োজনীয় হতে পারে। সরকারি অর্থ যাতে প্রকৃত উপযুক্ত মানুষের কাছে পৌঁছয়, তার জন্য যাচাই প্রক্রিয়া থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যদি অত্যন্ত জটিল হয়ে যায়, তাহলে যাঁদের জন্য প্রকল্পটি তৈরি, তাঁরাই সমস্যায় পড়তে পারেন—এটাই এখন বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্র।

টাকা না পাওয়ার অভিযোগে রাস্তায় মহিলারা

আগস্টে এসে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারকে ঘিরে ক্ষোভ আরও প্রকাশ্যে এসেছে। ২১ আগস্ট রাজ্যের একাধিক জায়গায় মহিলারা প্রকল্পের টাকা না পাওয়ার অভিযোগে বিক্ষোভ করেন। উত্তর দমদম, নিমতা ও বিরাটির মহিলারা রেললাইনে বসে পড়লে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়।

মেদিনীপুরেও প্রশাসনিক দফতরের সামনে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। সেখানে নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ও বিধায়ক শঙ্কর গুছাইতের সামনে মহিলারা নিজেদের অভিযোগ জানান। তাঁদের দাবি ছিল, আগের সরকারের সময়ে তাঁরা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা পেতেন, কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর সেই অর্থ বন্ধ হয়ে গিয়েছে বা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের মাধ্যমে তাঁরা প্রত্যাশিত সুবিধা পাচ্ছেন না।

অগ্নিমিত্রা পাল অবশ্য আবেদন প্রক্রিয়ার সময় লাগার বিষয়টি তুলে ধরে ধৈর্য ধরার আবেদন করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় দুই কোটি মহিলার আবেদন প্রক্রিয়া ও যাচাই করতে সময় প্রয়োজন। আবেদনকারীদের সংশ্লিষ্ট মহকুমা বা ব্লক দফতরে তথ্য জমা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

কিন্তু প্রশাসনের এই যুক্তি মাঠের ক্ষোভ পুরোপুরি থামাতে পারেনি। কারণ, যাঁরা আগে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা পেতেন, তাঁদের কাছে নতুন করে অপেক্ষা করার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

সরকারের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ কোথায়?

অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন তিনটি জায়গায়। প্রথমত, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে দ্রুত অর্থ পৌঁছে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, ভুয়ো বা অনুপযুক্ত উপভোক্তা থাকলে তাঁদের শনাক্ত করা। তৃতীয়ত, এই যাচাইয়ের পুরো প্রক্রিয়াকে এমনভাবে পরিচালনা করা, যাতে প্রকৃত দরিদ্র ও প্রয়োজনীয় পরিবার বাদ না পড়ে।

আগেই অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারণী মহলে প্রশ্ন উঠেছিল, এই ধরনের বড় সামাজিক প্রকল্পের অর্থের জোগান কীভাবে করা হবে। বিজেপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলি বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে মে মাসে একটি বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছিল।

অর্থাৎ অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার শুধু একটি আর্থিক সহায়তা প্রকল্প নয়; এটি নতুন সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও জড়িয়ে গিয়েছে।

প্রতিশ্রুতি থেকে বিশ্বাসযোগ্যতা—অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারই এখন বড় পরীক্ষা

অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, একটি জনকল্যাণ প্রকল্প ঘোষণা করা এবং সেটিকে কোটি কোটি মানুষের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। নির্বাচনের আগে ৩,০০০ টাকার প্রতিশ্রুতি মানুষের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। এখন সেই প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব সরকারের।

প্রশাসনের পক্ষে উপভোক্তার যোগ্যতা যাচাই করা জরুরি হলেও সেই প্রক্রিয়ায় যেন প্রকৃত সুবিধাভোগীরা আটকে না যান, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মাসে কয়েক হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা অনেক পরিবারের কাছে নিছক সরকারি অনুদান নয়—তা সংসারের নিয়মিত আয়ের একটি অংশ হয়ে উঠতে পারে।

এখন তাই অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের সাফল্য শুধু কতজনকে টাকা দেওয়া হল, তা দিয়ে মাপা হবে না। কত দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তি হচ্ছে, কতজন যোগ্য মহিলা বাদ পড়ছেন, অভিযোগের সমাধান কতটা দ্রুত হচ্ছে এবং সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব ব্যবস্থাপনার দূরত্ব কতটা কমাতে পারছে—এই প্রশ্নগুলিই আগামী দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

একসময় যে প্রকল্প ছিল ভোটের প্রতিশ্রুতির প্রতীক, সেটিই এখন পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকারের কাছে আস্থা ধরে রাখার বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

#AnnapurnaBhandar #WestBengal #BJPGovernment #LakshmirBhandar #WomenWelfare #BengalPolitics #WelfareScheme #WestBengalPolitics

Exit mobile version