ভারতের কড়া নজরে বাংলাদেশ! বাড়তে পারে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের চাপ

India Anti-Dumping Investigation on Bangladesh PET Film showing PET film rolls used in packaging as India begins an anti-dumping probe into imports from Bangladesh, China, and Thailand.

India Anti-Dumping Investigation on Bangladesh PET Film: ভারত ও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে ফের নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এবার বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্য পলিইথিলিন টেরেফথালেট (পিইটি) ফিল্ম-এর বিরুদ্ধে অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত শুরু করেছে ভারত। এই পণ্য মূলত খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, পানীয় এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্যের প্যাকেজিং তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ভারতীয় উৎপাদকদের অভিযোগ, বাংলাদেশ, চীন ও থাইল্যান্ড থেকে অত্যন্ত কম দামে এই পণ্য ভারতে রপ্তানি করা হচ্ছে, যার ফলে দেশীয় শিল্প মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে।

ভারতের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ট্রেড রেমেডিজ (DGTR) ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে এবং আগামী ৬ আগস্ট ভার্চুয়াল মাধ্যমে মৌখিক শুনানির দিনও ঘোষণা করেছে। যদিও এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে ভারত চাইলে এই পণ্যের উপর অতিরিক্ত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করতে পারে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা।

কেন তদন্ত শুরু করল ভারত?

ভারতের অভিযোগ, বাংলাদেশ, চীন এবং থাইল্যান্ড থেকে ডাম্পিং মূল্যে পিইটি ফিল্ম ভারতে রপ্তানি করা হচ্ছে। অর্থাৎ উৎপাদন খরচের তুলনায় অস্বাভাবিক কম দামে এই পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।

ভারতীয় উৎপাদকদের দাবি, বিদেশি সংস্থাগুলি কম দামে পণ্য বিক্রি করায় ভারতীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির বাজার সংকুচিত হচ্ছে এবং তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রকের অধীনস্থ ডিজিটিআর তদন্ত শুরু করেছে।

অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক কী?

অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক হল এমন একটি অতিরিক্ত আমদানি কর, যা কোনও দেশ তখনই আরোপ করে যখন তাদের মনে হয় বিদেশি সংস্থা ইচ্ছাকৃতভাবে অত্যন্ত কম দামে পণ্য বিক্রি করে স্থানীয় শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে ডাম্পিং হয়েছে এবং তার ফলে ভারতীয় শিল্পের ক্ষতি হয়েছে, তাহলে ভারত সরকার ওই পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক বসাতে পারে। আবার অভিযোগের যথেষ্ট প্রমাণ না মিললে তদন্তও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

৬ আগস্ট কী হবে?

ভারতের ডিজিটিআর আগামী ৬ আগস্ট একটি ভার্চুয়াল মৌখিক শুনানির আয়োজন করেছে।

এই শুনানিতে অংশ নেবেন—

বাংলাদেশের রপ্তানিকারক সংস্থাগুলি
ভারতীয় উৎপাদকরা
আমদানিকারক সংস্থাগুলি
সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজন

শুনানির আগে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজেদের পরিচয়, প্রতিষ্ঠানের তথ্য, ই-মেল, মোবাইল নম্বর, দেশের কোড এবং প্রতিনিধিদের তথ্য জমা দিতে হবে। মৌখিক বক্তব্য দেওয়ার পর সেই বক্তব্য লিখিত আকারেও জমা দিতে হবে।

এরপর লিখিত যুক্তি, পাল্টা বক্তব্য এবং প্রমাণ যাচাই করে তদন্ত এগোবে।

বাংলাদেশের কোন সংস্থা এই তদন্তে রয়েছে?

এই মামলায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রয়েছে আকিজ বায়াক্স ফিল্মস লিমিটেড।

অন্যদিকে ভারতের আবেদনকারী তিনটি সংস্থা হল—

চিরিপাল পলি ফিল্মস লিমিটেড
ইস্টার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড
ভ্যাকমেট ইন্ডিয়া লিমিটেড

এছাড়াও নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।

আকিজ কী বলছে?

বাংলাদেশের অন্যতম বড় পিইটি ফিল্ম প্রস্তুতকারক আকিজ বায়াক্স ফিল্মস লিমিটেড অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম কর্ণধার শেখ বশিরউদ্দীন জানিয়েছেন, তাদের রপ্তানি সম্পূর্ণ বাজারভিত্তিক এবং কোনওভাবেই ডাম্পিং করা হয়নি।

তিনি বলেন, শুনানিতে তারা সমস্ত তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করবেন।

বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান কী?

বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, সরকার এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছে।

তিনি বলেন, ভারত সরকারের কাছে অনুরোধ জানানো হবে যাতে পিইটি ফিল্মের উপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ না করা হয়।

সরকার খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করবে বলেও জানান তিনি।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই পিইটি ফিল্ম?

পিইটি ফিল্ম বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্য।

ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত আকিজ বায়াক্স ফিল্মস কারখানায় এই পণ্য উৎপাদিত হয়।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি—

বছরে প্রায় ১০ হাজার টন পিইটি ফিল্ম রপ্তানি হয়।
উৎপাদনের বড় অংশ দেশীয় বাজারেও বিক্রি করা হয়।
কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৪২ হাজার টনেরও বেশি।

প্যাকেজিং শিল্পে এই পণ্যের চাহিদা বিশ্বজুড়েই দ্রুত বাড়ছে।

বিশ্ববাজারে কত বড় এই শিল্প?

ভারতভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ওরিয়ন মার্কেট রিসার্চ-এর ২০২৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী,

বর্তমানে বিশ্ব পিইটি ফিল্ম বাজারের আকার প্রায় ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজার প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

ফলে এই শিল্পে বাংলাদেশের সম্ভাবনাও যথেষ্ট বড় বলে মনে করা হচ্ছে।

এর আগেও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তদন্ত করেছে ভারত

এটাই প্রথম নয়।

ভারত এর আগেও বাংলাদেশের একাধিক পণ্যের বিরুদ্ধে অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত করেছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

পাট ও পাটজাত পণ্য (২০১৭ সাল থেকে শুল্ক কার্যকর)
হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড
ফ্লোট গ্লাস
ফিশিং নেট

এছাড়া একসময় রহিমআফরোজের ব্যাটারি নিয়েও ভারত অ্যান্টি-ডাম্পিং ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল।

পরে বিষয়টি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO)-তে যাওয়ার পর ভারত সেই উদ্যোগ থেকে সরে আসে।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পক্ষে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে পণ্য রপ্তানি করা বাস্তবসম্মত নয়।

তার বক্তব্য, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের উচ্চ ব্যয়ের কারণে বাংলাদেশের উৎপাদন খরচ বরং বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে বাংলাদেশকে আবারও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) দ্বারস্থ হওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে। অতীতেও এমন পদক্ষেপে ইতিবাচক ফল মিলেছিল বলে তিনি মনে করেন। আগামী ৬ আগস্টের শুনানির পর তদন্ত আরও এগোবে।

#India #Bangladesh #PETFilm #AntiDumping #TradeNews #DGTR #Exports #BangladeshExports #IndiaBangladesh #BusinessNews

Exit mobile version