শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নতুন অভিযোগ, শাপলা চত্বরের ঘটনা ঘিরে মামলা

Sheikh Hasina ICT Case involving charges filed at Bangladesh International Crimes Tribunal

Sheikh Hasina ICT Case: বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নতুন করে অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০১৩ সালে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে পুলিশের অভিযানে মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ মোট ৪১ জনের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। মামলাটিকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এবং বিচারব্যবস্থায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

অভিযোগপত্রে তৎকালীন সরকারের সময় সংঘটিত পুলিশি অভিযানের ভূমিকা এবং শাপলা চত্বরে ঘটে যাওয়া মৃত্যুর ঘটনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। একই সঙ্গে বেশ কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা এবং অন্যান্য ব্যক্তির বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। মামলার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন অভিযুক্ত বর্তমানে হেফাজতে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্যদিকে কয়েকজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

এই ঘটনাকে বুঝতে গেলে ফিরে তাকাতে হবে ২০১৩ সালের মে মাসের সেই উত্তাল সময়ের দিকে। হেফাজতে ইসলামের একটি বড় সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

শাপলা চত্বরের সেই রাত ঘিরেই নতুন অভিযোগ

২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার কেন্দ্রস্থলে বড় সমাবেশের আয়োজন করেছিল হেফাজতে ইসলাম। সংগঠনটির পক্ষ থেকে তৎকালীন সরকারের কাছে ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল। এসব দাবির মধ্যে ইসলাম ও ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। সমাবেশের অনুমতি থাকলেও পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান কর্মসূচির রূপ নেয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার সমাবেশকারীদের রাজধানী ছাড়ার নির্দেশ দিলেও তারা অবস্থান চালিয়ে যান। এর পরেই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের অভিযোগ সামনে আসে।

শাপলা চত্বরের আশপাশের এলাকায় সেদিন রাতের অভিযানের পর কতজন নিহত হয়েছিলেন, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা দাবি করা হয়েছে। সেই মৃত্যুর ঘটনাকেই এবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে ঘিরে মৃত্যুর ঘটনায় শেখ হাসিনা এবং অন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মামলার পরবর্তী প্রক্রিয়ায় অভিযোগগুলির বিচারিক মূল্যায়ন এবং প্রমাণ যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

অভিযুক্তদের তালিকায় সাবেক মন্ত্রী থেকে নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও

শেখ হাসিনার পাশাপাশি এই মামলায় আরও ৪০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নাম রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

একই সঙ্গে কয়েকজন পলাতক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক সেনাপ্রধানসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বিরুদ্ধেও এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সাবেক মন্ত্রী এবং পুলিশের কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ মোট নয়জন গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্ত বর্তমানে হেফাজতে রয়েছেন এবং বিচারপ্রক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

তবে এই মামলার ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—অভিযোগ দায়ের হওয়া এবং আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক বিষয় নয়। বিচারপ্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য, নথি, প্রমাণ এবং অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফলে অভিযোগের রাজনৈতিক গুরুত্ব যতই বেশি হোক, আইনি বিচারের ক্ষেত্রে প্রমাণের বিষয়টিই শেষ পর্যন্ত মুখ্য হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অতীতেও দেশের রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত বিভিন্ন মামলার বিচার করেছে। শেখ হাসিনাকে ঘিরে সাম্প্রতিক মামলাগুলিও সেই ধারাবাহিকতায় নতুন করে আন্তর্জাতিক নজর কেড়েছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও জটিল

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই নতুন অভিযোগ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি গত কয়েক বছরে ব্যাপকভাবে বদলে গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান এবং সেখানেই অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

এর আগে ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনকে কেন্দ্র করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আরেকটি মামলা হয়েছিল। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ওই মামলায় গত বছরের নভেম্বরে তাঁকে অনুপস্থিত অবস্থায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অর্থাৎ, বর্তমান মামলার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর বিচারিক প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে অনুপস্থিত অবস্থায় বিচার এবং অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন মহলে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিচারপ্রক্রিয়া তাই শুধু একটি আইনি বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা এবং মানবাধিকার নিয়েও নানা প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে।

২০১৩ সালের ঘটনাপ্রবাহে কী ঘটেছিল?

২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকার পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে উত্থাপিত ১৩ দফা দাবির মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন দাবি ছিল। সমাবেশকে ঘিরে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়ো হন।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ধর্মীয় বই বিক্রির দোকান ও অন্যান্য স্থাপনায় আগুন লাগানো, বাস ও দোকান ভাঙচুর এবং গাছ কেটে রাস্তা অবরোধ করার মতো ঘটনাও ঘটেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া মতিঝিল ও পুরানা পল্টনসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরকারি স্থাপনা, ব্যাংক এবং রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগও সামনে এসেছিল। সেই সময়ের বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল এবং আন্দোলনকারীদের খাদ্য ও জল সরবরাহে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানকে কেন্দ্র করে বহু মানুষের মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। কিন্তু নিহতের সঠিক সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। সেই বিতর্কের অবসান ঘটাতে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়েছে।

এবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া মামলায় সেই ঘটনাগুলিরই আইনি পুনর্মূল্যায়নের পথ খুলে গেল। মামলার বিচার এগোলে ২০১৩ সালের ঘটনাপ্রবাহ, পুলিশের ভূমিকা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য সামনে আসতে পারে।

শেখ হাসিনা এবং অন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এই মামলার পরবর্তী ধাপ হবে বিচারিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতি। অভিযোগ গ্রহণের পর আদালতে মামলার বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ধাপ সম্পন্ন হবে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপন, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ—সবকিছুর মধ্য দিয়েই মামলাটি এগিয়ে যাওয়ার কথা।

এই মামলার রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। কারণ, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অধ্যায়। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একাধিক আইনি পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তবে এই ধরনের মামলায় দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর বদলে পূর্ণাঙ্গ বিচারপ্রক্রিয়া এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য উদঘাটন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা তখনই তৈরি হয়, যখন প্রত্যেক অভিযুক্ত ন্যায়সঙ্গত বিচার পাওয়ার সুযোগ পান এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনের ভিত্তিতে শাস্তি নিশ্চিত হয়।

শাপলা চত্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ তাই আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। এখন নজর থাকবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং মামলার বিচারিক অগ্রগতির দিকে।

#sheikhhasinaictcase #sheikhhasina #internationalcrimestribunal #bangladeshpolitics #hefazateislam #shaplachattar #bangladeshnews #awamileague

Exit mobile version