UPI 10 Years: ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআই-এর পথচলার দশ বছর পূর্ণ হল। ২০১৬ সালের ২৫ আগস্ট যাত্রা শুরু করা এই তাৎক্ষণিক অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা গত এক দশকে দেশের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনের ধরন অনেকটাই বদলে দিয়েছে। দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইউপিআইকে ভারতের ডিজিটাল অর্থপ্রদানের যাত্রায় একটি ‘বড় মোড়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একইসঙ্গে তিনি সাধারণ মানুষকে ইউপিআই ব্যবহারের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে ইউপিআই-এর ব্যাপক বিস্তারের বিষয়টিও। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে যেখানে ইউপিআই-এর মাধ্যমে মাত্র ১ কোটি ৭৮ লক্ষ লেনদেন হয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে সেই সংখ্যা বেড়ে ২৪,১৬২ কোটিরও বেশি হয়েছে। অর্থাৎ এক দশকে লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার গুণ বেড়েছে।
দশ বছর আগে শুরু, এখন দৈনন্দিন লেনদেনের বড় মাধ্যম
২০১৬ সালের ২৫ আগস্ট জাতীয় পেমেন্টস কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়ার উদ্যোগে এবং ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নিয়ন্ত্রক তত্ত্বাবধানে ইউপিআই সাধারণ মানুষের জন্য চালু হয়। তার আগে ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে ২১টি সদস্য ব্যাঙ্ককে নিয়ে এর পরীক্ষামূলক সূচনা হয়েছিল। পরে বিভিন্ন ব্যাঙ্ক নিজেদের ইউপিআই-সমর্থিত মোবাইল পরিষেবা চালু করলে সাধারণ মানুষের কাছে এর ব্যবহার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
একই বছরের ডিসেম্বর মাসে ভীম নামের সরকারি অর্থপ্রদান পরিষেবাও চালু হয়। এরপর স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ইউপিআই ধীরে ধীরে ছোট দোকান থেকে বড় ব্যবসা, ব্যক্তিগত অর্থপ্রদান থেকে বিল মেটানো—বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বার্তায় ইউপিআই-এর এই ব্যাপক বিস্তারকে ভারতের জন্য গর্বের বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, একটি দশক আগে শুরু হওয়া উদ্যোগ কীভাবে দেশের অর্থপ্রদানের ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনেছে, তার প্রতিফলনই বর্তমান পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে।
লেনদেনের সংখ্যায় অবিশ্বাস্য বৃদ্ধি
ইউপিআই-এর দশ বছরের যাত্রার সবচেয়ে বড় দিকগুলির একটি হল লেনদেনের বিপুল বৃদ্ধি। সরকারি অর্থ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে ইউপিআই-এর মাধ্যমে ১ কোটি ৭৮ লক্ষ লেনদেন হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে সেই সংখ্যা বেড়ে ২৪,১৬২ কোটিরও বেশি হয়েছে।
শুধু লেনদেনের সংখ্যাই নয়, অর্থের মোট মূল্যও দ্রুত বেড়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে ইউপিআই-এর মাধ্যমে লেনদেনের মোট মূল্য ছিল প্রায় ০.০৭ লক্ষ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে তা বেড়ে প্রায় ৩১৪ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক দশকে লেনদেনের মোট মূল্য চার হাজার গুণেরও বেশি বেড়েছে।
এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, ইউপিআই আর শুধুমাত্র প্রযুক্তিনির্ভর একটি অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা নয়। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে এটি এখন সরাসরি যুক্ত।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ইউপিআই
ইউপিআই-এর ব্যবহার শুধু ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে ১১টি দেশে এই ভারতীয় তাৎক্ষণিক অর্থপ্রদান ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য। গ্রিস ও মালদ্বীপ সাম্প্রতিক সময়ে এই ব্যবস্থাকে গ্রহণ করেছে।
একটি মাত্র মোবাইল পরিষেবার মাধ্যমে একাধিক ব্যাঙ্কের হিসাব পরিচালনা, অর্থ স্থানান্তর এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে অর্থপ্রদান করার সুবিধাই ইউপিআই-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এর ফলে ব্যবহারকারীদের জন্য অর্থপ্রদানের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হয়েছে।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ইউপিআই-তে দ্বিস্তরীয় পরিচয় যাচাই এবং প্রান্ত থেকে প্রান্ত পর্যন্ত তথ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে দ্রুততার পাশাপাশি নিরাপদ অর্থপ্রদানের বিষয়টিও এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।
ভোক্তার জন্য অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই অর্থপ্রদান
ইউপিআই ব্যবস্থার বিস্তারের সঙ্গে অর্থপ্রদানের খরচের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অর্থপ্রদান ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থার আইনে পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট সংক্রান্ত ব্যবস্থা আনা হয়েছে। তবে সাধারণ ভোক্তার ইউপিআই-এর মাধ্যমে অর্থপ্রদানের ক্ষেত্রে কোনও চার্জ রাখা হয়নি।
এর ফলে ছোট অঙ্কের অর্থপ্রদানেও এই ব্যবস্থা ব্যবহার করা সহজ হয়েছে। রাস্তার পাশের ছোট দোকান থেকে শুরু করে বিভিন্ন পরিষেবার ক্ষেত্রে মোবাইলের মাধ্যমে সরাসরি অর্থ পাঠানোর প্রবণতা দ্রুত বেড়েছে।
এক দশক পূর্তিতে তাই ইউপিআই-এর সাফল্য শুধু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক লেনদেনের অভ্যাসের পরিবর্তন, দ্রুত অর্থপ্রদানের সুযোগ এবং দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার।
প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘বড় মোড়’ ইউপিআই
দশ বছর পূর্তির দিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউপিআই-এর পথচলাকে ভারতের ডিজিটাল অর্থপ্রদানের যাত্রায় একটি বড় মোড় হিসেবে উল্লেখ করেন। একইসঙ্গে তিনি ইউপিআই ব্যবহারকারীদের তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের মধ্যে দিয়ে ইউপিআই-এর এক দশকের যাত্রাকে দেশের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে লেনদেনের বিপুল বৃদ্ধি এবং দেশের বাইরে এর গ্রহণযোগ্যতা ভারতীয় ডিজিটাল অর্থপ্রদানের পরিসর যে অনেকটাই বদলে দিয়েছে, তা স্পষ্ট।
দশ বছর আগে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া একটি ব্যবস্থা কীভাবে কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে, ইউপিআই-এর পরিসংখ্যানই তার বড় প্রমাণ। আগামী দিনে এর ব্যবহার আরও কতটা বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতীয় অর্থপ্রদানের এই মডেল কতটা বিস্তার লাভ করে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
