দুর্নীতি ঢাকবেন না, সত্য প্রকাশ করুন—সাংবাদিকদের সামনে স্পষ্ট বার্তা শমীক ভট্টাচার্যর

সত্য প্রকাশে ভয় নয়, সাংবাদিকদের বড় বার্তা শমীক ভট্টাচার্যর

Samik Bhattacharya on Press Freedom addressing journalists and urging the media to expose corruption without political bias during a public event.

Samik Bhattacharya on Press Freedom: নির্ভীক সাংবাদিকতার জন্য আয়োজিত এক সম্মাননা অনুষ্ঠানে সাংবাদিকতার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্যে উঠে এল পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস, অতীতের সাংবাদিকতা, বর্তমান সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য।

শমীক ভট্টাচার্য বলেন, স্বাধীনতার পর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় ডা. বিধানচন্দ্র রায় পূর্বসূরি প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের ব্যবহৃত মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেননি। তিনি বিধানসভার পিছনের সারির একটি আসনে বসে দায়িত্ব পালন শুরু করেছিলেন। তাঁর দাবি, অজয় মুখোপাধ্যায়, জ্যোতি বসু, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও সেই প্রথা বজায় রেখেছেন।

তিনি বলেন, ষাটের দশকে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলেও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ছিল। সেই সময় সরকারকে কঠোর সমালোচনা করা হলেও সংবাদ প্রকাশে এত বাধা ছিল না। বর্তমানে দুর্নীতির ঘটনা থাকলেও সেগুলি তুলে ধরার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের উপর বিভিন্ন ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে।

শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্যে উঠে আসে, সাংবাদিকদের কাজ নির্ভীকভাবে সত্য তুলে ধরা। কিন্তু বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই সংবাদমাধ্যমকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে একজন সাংবাদিককে অনেক সময় নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে যুক্ত বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এতে সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে “মাইক ধরা সাংবাদিকতা” অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। দ্রুত সংবাদ পরিবেশনের প্রতিযোগিতায় অনেক সময় তথ্যের গভীরতা ও বিশ্লেষণ হারিয়ে যাচ্ছে। যদিও ডিজিটাল মাধ্যমের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুত সংবাদ পৌঁছাচ্ছে, তবুও অনুসন্ধানী ও তথ্যনির্ভর সাংবাদিকতার চর্চা আগের তুলনায় কমে যাচ্ছে বলে তাঁর মত।

শমীক ভট্টাচার্য জানান, অতীতে নির্বাচন বা রাজনৈতিক সংঘর্ষের সময় বহু সাংবাদিক আক্রান্ত হয়েছেন। ক্যামেরা ভাঙা, সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়া কিংবা ফুটেজ কেড়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও পশ্চিমবঙ্গে ঘটেছে। তাঁর মতে, একজন সাংবাদিকের কাজ রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার করা নয়, বরং তথ্যভিত্তিক সংবাদ মানুষের সামনে তুলে ধরা।

তিনি বলেন, প্রত্যেক সাংবাদিকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতামত থাকতে পারে। কিন্তু সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সেই মতামত যেন পেশাগত দায়িত্বকে প্রভাবিত না করে। সাংবাদিকের প্রথম দায়িত্ব সত্য তুলে ধরা এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে ক্ষমতাসীনদেরও প্রশ্ন করা।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়েও নিজের মন্তব্যের ব্যাখ্যা দেন শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর দাবি, ১৯৩৯ সালের আগে এবং পরে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্যের মধ্যে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তাঁর মতে, সালের আগে নেতাজি হিন্দু মহাসভার কিছু অবস্থানের সমালোচনা করলেও পরবর্তী সময়ে বিনায়ক দামোদর সাভারকরের কিছু ভূমিকার প্রশংসাও করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর সম্পূর্ণ রাজনৈতিক যাত্রাপথকে দেখতে হবে।

সবশেষে শমীক ভট্টাচার্য সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী রাখতে স্বাধীন ও সাহসী সাংবাদিকতার বিকল্প নেই। তাঁর কথায়, বর্তমান সময়ে সাংবাদিকদের কাজ আগের তুলনায় আরও কঠিন হয়ে উঠেছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের কণ্ঠস্বর সীমিত করার চেষ্টা হচ্ছে বলে মানুষের মধ্যে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, সেটিকে অস্বীকার করা যায় না। তবে তিনি সাংবাদিকদের সত্যনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ থেকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
বর্তমান সরকারের কোনও ক্ষেত্রেই যদি দুর্নীতি, তোলাবাজি বা অনিয়মের ঘটনা সামনে আসে, তাহলে সংবাদমাধ্যমের উচিত নির্ভয়ে সেই খবর প্রকাশ করা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্পে বিনিয়োগ কিংবা অন্য কোনও সরকারি প্রকল্পে যদি কোনও ত্রুটি বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকে, তবে তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। তাঁর কথায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি বিজেপির নেতা, কর্মী বা সমর্থকও হন, তবুও সংবাদমাধ্যমের উচিত নিরপেক্ষভাবে সেই তথ্য প্রকাশ করা। রাজনৈতিক পরিচয় দেখে নয়, সত্যের স্বার্থে এবং জনস্বার্থে সংবাদ পরিবেশন করাই সাংবাদিকদের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

Exit mobile version