Ruhul Kabir Rizvi BNP Acting Secretary General: বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পরিবর্তন করল বিএনপি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মহাসচিবের পদ থেকে সরে দাঁড়াতেই তাঁর জায়গায় দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পেলেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দলীয় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, দলীয় কার্যালয় পরিচালনা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকা রিজভীর উপরেই আপাতত দলের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব অর্পণ করল বিএনপি। এর আগে তাঁকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছিল। ফলে মির্জা ফখরুলের বিদায়ের পর দলের নতুন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে রিজভীর দায়িত্ব গ্রহণকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
মির্জা ফখরুলের পদত্যাগের পরেই নতুন সিদ্ধান্ত
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর বৃহস্পতিবার বিএনপির মহাসচিবের পদ থেকে লিখিতভাবে পদত্যাগ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০১১ সালে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নেওয়ার পর ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে নিজের অবস্থান শক্ত করেন তিনি। পরে ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে দলের মহাসচিব নির্বাচিত করা হয়।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার পর থেকেই তাঁর ছেড়ে যাওয়া মহাসচিবের পদে কে আসবেন, তা নিয়ে বিএনপির অন্দরে আলোচনা শুরু হয়েছিল। দলের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার নাম নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞ এবং দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রুহুল কবির রিজভীর উপরেই আস্থা রাখল দল।
বিএনপির পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, দলীয় গঠনতন্ত্রের ৭ (খ) ৬ ধারা অনুযায়ী জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে। অর্থাৎ মির্জা ফখরুলের পদত্যাগের পর দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক নেতৃত্বে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা দ্রুতই পূরণ করল বিএনপি।
দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা রিজভীর হাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক পরিচয় বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে বহুদিনের। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন। পরবর্তীতে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে এসে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে দলের সাংগঠনিক কর্মসূচি, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলের বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁকে দীর্ঘদিন সামনের সারিতে দেখা গেছে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময়েও বিএনপির কর্মসূচি নিয়ে নিয়মিত সক্রিয় থেকেছেন রিজভী। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে ঘিরে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি দলীয় কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। গণমাধ্যমের সামনে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দীর্ঘদিনের এই প্রত্যক্ষ সম্পর্কই তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় কারণ হয়ে উঠেছে বলে দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় কার্যালয়কেন্দ্রিক কার্যক্রম এবং দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার অভিজ্ঞতা নতুন দায়িত্বে তাঁকে সুবিধা দেবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
কেন রিজভীর উপরেই আস্থা রাখল বিএনপি?
মহাসচিবের পদটি বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ। দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে মহাসচিবের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় একজন এমন নেতাকে বেছে নেওয়া হয়েছে, যিনি দীর্ঘদিন ধরে দলের কেন্দ্রীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
রিজভীর ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—দলের কঠিন সময়ে তিনি নিয়মিত প্রকাশ্যে দলের অবস্থান তুলে ধরেছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে শুরু করে দলীয় কার্যালয়ের কার্যক্রম, বিভিন্ন সময়ে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি বিএনপির সাংগঠনিক পরিসরে তাঁকে পরিচিত মুখ করে তুলেছে।
এর আগে তাঁকে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়। অর্থাৎ ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার আগে দলের নীতিনির্ধারণী পর্ষদেও তাঁর অবস্থান নিশ্চিত হয়েছিল। ফলে নতুন দায়িত্বে তিনি শুধু সাংগঠনিক স্তরেই নয়, দলের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী কাঠামোর সঙ্গেও সমন্বয় করে কাজ করার সুযোগ পাবেন।
এই কারণেই রিজভীর নিয়োগকে হঠাৎ নেওয়া কোনও সিদ্ধান্তের বদলে দলের অভ্যন্তরে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
আপাতত ভারপ্রাপ্ত, সামনে জাতীয় কাউন্সিল
তবে রুহুল কবির রিজভীর এই দায়িত্ব গ্রহণকে আপাতত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কারণ বিএনপি চলতি বছরেই জাতীয় কাউন্সিল করার পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। কাউন্সিলের পর দলের পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব কে হবেন, সেই সিদ্ধান্ত তখন নতুন করে নেওয়া হতে পারে।
অর্থাৎ বর্তমানে রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দলের দায়িত্ব সামলালেও ভবিষ্যতে তাঁকেই পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়। জাতীয় কাউন্সিলেই দলের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে কাউন্সিল পর্যন্ত সময়টিও বিএনপির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর দলীয় নেতৃত্বে পরিবর্তন, সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে নতুন মুখ এবং সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে রদবদল—সব মিলিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক কাঠামো এখন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে রিজভীর ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
তাঁর সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হবে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমকে ধারাবাহিক রাখা এবং শীর্ষ নেতৃত্বের পরিবর্তনের মধ্যেও দলীয় কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা।
মির্জা ফখরুলের বিদায়ে আরও কোন পরিবর্তন বাকি?
মহাসচিবের পদে পরিবর্তন এলেও বিএনপির অভ্যন্তরে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাকি রয়েছে। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত একাধিক পদে ভবিষ্যতে পরিবর্তন আসতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
বিশেষ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে নজর রয়েছে। ফলে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বিএনপির দলীয় কাঠামোতে যে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, রিজভীর নিয়োগ তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলির একটি।
এদিকে রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দলীয় সংগঠনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্কের কারণে তাঁর হাতে আপাতত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়াকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। দলের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ এবং কেন্দ্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিজ্ঞতা নতুন দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার মাধ্যমে তার আপাতত সমাধান করল দল। তবে এটি স্থায়ী সাংগঠনিক পরিবর্তন নাকি জাতীয় কাউন্সিল পর্যন্ত একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা—তার উত্তর মিলবে আগামী দিনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে।
#RuhulKabirRizvi #BNP #BNPLeadership #BangladeshPolitics #MirzaFakhrul #BangladeshNationalistParty
