জাতিসংঘে মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর বক্তব্যে ক্ষুদ্রঋণ, সামাজিক ব্যবসা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, উদ্যোক্তা তৈরি এবং নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয়গুলি ছিল—
ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছর
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, বাংলাদেশে যে ক্ষুদ্রঋণের ধারণা তৈরি হয়েছিল, তা এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আমেরিকাতেও এই ধারণা গ্রহণ করা হয়েছে এবং সেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, শুরুতে নিউইয়র্ক শহরের দরিদ্র হিস্পানিক মহিলাদের নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। পরে কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের মধ্যেও এই কাজ ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখানে ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে। এরপর অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেও ক্ষুদ্রঋণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশে মূলত মহিলাদের নিয়ে ক্ষুদ্রঋণের কাজ শুরু হলেও পরে প্রশ্ন ওঠে, পুরুষদের কেন এর আওতায় আনা হবে না। ফলে মহিলাদের পাশাপাশি পুরুষদের জন্যও এই ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থায় একের পর এক নতুনত্ব যোগ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছর পূর্তি উদ্যাপনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশেও দরিদ্র মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে বাংলাদেশের তৈরি এই ধারণা ব্যবহৃত হচ্ছে। জাতি বা সম্প্রদায়ের কোনও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে না থেকে এটি হিস্পানিক, কৃষ্ণাঙ্গ, এশীয় এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে বাধা দূর করার কথা
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ক্ষুদ্রঋণের কাজ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়লেও নিয়মকানুনের কারণে অনেক সময় কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই যে সমস্ত বাধা রয়েছে, সেগুলি দূর করার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বিশেষভাবে সঞ্চয়ের বিষয়টি উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে সঞ্চয় নেওয়ার সুযোগ থাকলে সেই সঞ্চয়ের অর্থ ব্যবহার করে আরও বেশি মানুষকে ঋণ দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় সঞ্চয়ের অর্থ এবং ঋণ দেওয়ার কাজ আলাদা রাখতে হয়।
তিনি বলেন, সাধারণত ব্যাংকের কাজই হল মানুষের কাছ থেকে আমানত নেওয়া এবং সেই অর্থ ঋণ হিসেবে দেওয়া। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে সেই একই ব্যবস্থা করা যায় না। তাঁর মতে, এই বাধাগুলি নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের জন্য কাজ করা দরকার।
সামাজিক ব্যবসার ধারণা
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছর পূর্তির পাশাপাশি সামাজিক ব্যবসার ধারণাকেও গুরুত্ব দিয়ে উদ্যাপন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রচলিত অর্থনৈতিক ধারণায় মনে করা হয়, মানুষ অর্থ উপার্জন করে এবং অর্থ উপার্জন থেকেই সুখ পায়। কিন্তু তাঁর মতে, মানুষের সুখের মাত্র একটি দিক নেই।
তিনি বলেন, অর্থ উপার্জন থেকে সুখ পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু অন্য মানুষকে সুখী করা বা মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার মধ্যে আরও গভীর আনন্দ রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মানুষের সমস্যার সমাধান করার জন্যও ব্যবসা করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ব্যবসার উদ্দেশ্য শুধু অর্থ উপার্জন হওয়া প্রয়োজন নেই। মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করা, মানুষের সামনে থাকা বাধা দূর করা এবং মানুষের জীবনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার জন্যও ব্যবসাকে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এই ধারণাকেই তিনি সামাজিক ব্যবসা হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সামাজিক ব্যবসায় মুনাফা ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে নেওয়ার বদলে সেই অর্থ আবার ব্যবসার মধ্যেই বিনিয়োগ করা হয়, যাতে পরিষেবা আরও বড় আকারে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়।
স্বাস্থ্য পরিষেবায় সামাজিক ব্যবসা
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রেও সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে কাজ করা হচ্ছে। ছোট পরিসরের স্বাস্থ্য পরিষেবা দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে তা বড় করা হয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে ১৫৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। একটি কেন্দ্র থেকে যে অর্থ পাওয়া যায়, তা আবার নতুন স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরির কাজে বিনিয়োগ করা হয়। এভাবে একই অর্থ বারবার ব্যবহার করে পরিষেবা সম্প্রসারিত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। অনেক জায়গায় চিকিৎসক নেই, প্রয়োজনীয় পরিষেবা নেই। সেই কারণে গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
টেলিফোনের মাধ্যমে চিকিৎসা পরিষেবা
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, বাংলাদেশে টেলিফোন পরিষেবার একটি বড় নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছিল, যাতে দরিদ্র মানুষের কাছেও যোগাযোগের সুবিধা পৌঁছয়। সেই ব্যবস্থাকেই স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
তিনি জানান, টেলিফোনে যোগাযোগ করলে সরাসরি চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা যায়। চিকিৎসকের কোনও সহকারী প্রথমে সমস্যার কথা শুনে নোট করে পরে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছে দেবে—এমন ব্যবস্থা নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ফোনের অপর প্রান্তে সরাসরি চিকিৎসক থাকেন।
প্রয়োজনে চিকিৎসক পরীক্ষার পরামর্শ দেন। পরীক্ষা করা হলে তার ফলাফল চিকিৎসক এবং রোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর চিকিৎসক রোগীকে আবার ফোন করে সমস্যার বিষয়ে জানান এবং কী করতে হবে সে বিষয়ে পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে হওয়া সমস্ত তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। ফলে পরবর্তী সময়ে রোগী আবার ফোন করলে তাঁকে নতুন করে সব সমস্যার কথা বলতে হয় না। চিকিৎসক আগের সমস্ত তথ্য দেখতে পারেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষও এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য চিকিৎসকের কাছে সংরক্ষিত রাখতে পারেন।
গ্রামাঞ্চলে চোখের চিকিৎসা
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে চোখের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও কাজ করা হচ্ছে। এমন জায়গায় চোখের চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে আগে এই ধরনের পরিষেবা ছিল না।
তিনি জানান, একদিকে উন্নতমানের চোখের চিকিৎসাকেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে, অন্যদিকে তার নিচের স্তরে দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা এবং প্রাথমিক চোখের চিকিৎসার জন্য কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে।
বিশেষ করে শিশুদের চোখ পরীক্ষা করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্য, অনেক সময় কোনও শিশু ঠিকমতো দেখতে না পাওয়ার কারণে পড়াশোনায় ভালো করতে পারে না। কিন্তু পরিবার বা শিক্ষকরা বিষয়টি বুঝতে পারেন না।
তাই স্কুলের শিশুদের চোখ পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে তিনি জানান। প্রয়োজন হলে তাদের চশমা দেওয়ার ব্যবস্থার কথাও তিনি বলেন।
তিনি জানান, বর্তমানে দশম চোখের চিকিৎসাকেন্দ্র তৈরির দিকে এগোনো হচ্ছে। প্রতিটি কেন্দ্র নিজেদের পরিষেবা থেকে যে উদ্বৃত্ত অর্থ তৈরি করবে, তা ব্যবহার করে পরবর্তী কেন্দ্র তৈরি করা সম্ভব হবে।
তাঁর মতে, এটাই সামাজিক ব্যবসার শক্তি—একবার কোনও পরিষেবা শুরু করে থেমে যাওয়া নয়, বরং সেই পরিষেবা থেকেই নতুন পরিষেবা তৈরির ব্যবস্থা করা।
চাকরি খোঁজা নয়, চাকরি তৈরি
মুহাম্মদ ইউনূস শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মূলত চাকরি খোঁজার জন্য মানুষকে প্রস্তুত করে। স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করে, ডিগ্রি নিয়ে চাকরি পাওয়াকেই সাফল্যের পথ হিসেবে দেখা হয়।
কিন্তু তাঁর মতে, মানুষ জন্মগতভাবে শুধু চাকরি খোঁজার জন্য তৈরি নয়। মানুষ চাকরি তৈরি করতে পারে, অর্থাৎ উদ্যোক্তা হতে পারে।
এই ধারণাকে সামনে রেখে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় চালু করার কথা তিনি জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শুধু ডিগ্রি পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই শিক্ষার্থীদের নিজেদের ব্যবসা শুরু করার জন্য উৎসাহ দেওয়া হবে। ব্যবসা শুরু করতে প্রয়োজন হলে অর্থের ব্যবস্থাও করা হবে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা যাতে শুধু একটি কাগজের ডিগ্রি পাওয়াকে সাফল্য মনে না করেন, সেই লক্ষ্যেই এই নতুন শিক্ষাব্যবস্থার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তিনটি শূন্যের পৃথিবী
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকবে—তিনটি শূন্যের পৃথিবী তৈরি করা।
এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের শুরু থেকেই প্রস্তুত করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়ার প্রশিক্ষণ এবং বাস্তবে ব্যবসা শুরু করার সুযোগ থাকবে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেওয়ার জায়গা হবে না। শিক্ষার্থীদের নিজেদের উদ্যোগ শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়াই হবে এর অন্যতম লক্ষ্য।
শেষে মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার ৫০ বছর পূর্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, এই অভিজ্ঞতাগুলি একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া এবং আরও বিস্তৃতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।













