Kolkata Protest Journalist Attack: শিক্ষা সংক্রান্ত আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কলকাতায় শুক্রবারের বিক্ষোভ ঘিরে তৈরি হওয়া উত্তেজনা এবার নতুন মাত্রা পেল। আন্দোলনের সময় সাংবাদিকদের হেনস্থা ও হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, বিক্ষোভের আড়ালে যারা অশান্তি তৈরি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ করা হবে। প্রশাসনের দাবি, ইতিমধ্যেই প্রায় ৭০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাঁদের কেউই ছাত্র নন এবং প্রকৃত আন্দোলনকারীদের অংশও নন।
শুক্রবার ধর্মতলায় বিক্ষোভ চলাকালীন পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ। সেই সময় সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে জলের বোতল এবং জুতো ছোড়ার অভিযোগ সামনে আসে। ঘটনায় বেশ কয়েকজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জনকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এই ঘটনার পর সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি বিক্ষোভের নামে হিংসা বা বিশৃঙ্খলা বরদাস্ত করা হবে না বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে প্রশাসন।
৭০ জনকে চিহ্নিত করার দাবি, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, শুক্রবারের ঘটনার তদন্তে প্রায় ৭০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই ব্যক্তিদের মধ্যে কেউই পড়ুয়া নন এবং তাঁরা প্রকৃত ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নন। এমনকি তাঁদের কেউ নিজেদের কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবেও পরিচয় দেননি বলে দাবি করেছেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলনের নামে যারা বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে এবার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে এবং চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সদ্য পাস হওয়া গুন্ডাদমন আইন প্রয়োগের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নষ্ট করার চেষ্টা করলে প্রশাসন কোনওভাবেই নরম মনোভাব দেখাবে না। দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা ঘটানোর আগে কেউ একাধিকবার ভাবতে বাধ্য হয়। তাঁর কথায়, এই ধরনের কঠোর আইন কেন প্রয়োজন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিই তার প্রয়োজনীয়তা মানুষের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছে।
সাংবাদিকদের উপর হামলা নিয়ে সরব মুখ্যমন্ত্রী
শুক্রবারের বিক্ষোভে সাংবাদিকদের উপর হামলার অভিযোগকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে প্রশাসন। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের আক্রান্ত হওয়া কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর বক্তব্য, সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে কোনও ধরনের আক্রমণ বা হেনস্থা বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ঘটনার প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, পুলিশকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংযত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তাঁর দাবি, বিক্ষোভ চলাকালীন পুলিশকে বারবার প্ররোচিত করার চেষ্টা করা হলেও বাহিনী সেই প্ররোচনায় পা দেয়নি। প্রশাসনের উদ্দেশ্য ছিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় সংঘর্ষ এড়ানো।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, মিছিল একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছনোর পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। সেই সময় বিক্ষোভকারীদের একাংশের কাছ থেকে জুতো ও জলের বোতল ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। একইসঙ্গে সাংবাদিকদেরও নিশানা করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, পুলিশকে লাঠিচার্জে বাধ্য করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করার চেষ্টা হতে পারে, কিন্তু পুলিশ সেই ফাঁদে পা দেয়নি।
এই ঘটনায় ছয়জন সাংবাদিক গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। ঘটনাটি সামনে আসার পর সাংবাদিক সংগঠন এবং সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে কড়া বার্তা
শুক্রবারের ঘটনার প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী পাঁচজনের নামও প্রকাশ্যে এনেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজাবাগানের আফরোজ, খিদিরপুরের নাহিদ, একবালপুরের তানবির ও নিজাম এবং ওয়াটগঞ্জের রাহুল জামাল—এই পাঁচজনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের দুষ্কৃতী হিসেবে উল্লেখ করে জানান, চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গুন্ডাদমন আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা এবং তাঁদের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে। অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে তা-ও তদন্তের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রশাসনের বক্তব্য, কোনও রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এক বিষয় নয়। গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার থাকলেও সেই প্রতিবাদের সময় সাংবাদিক, পুলিশ বা সাধারণ মানুষের উপর হামলা কিংবা সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাতটি মামলা, তদন্তে একাধিক ধারায় অভিযোগ
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, শুক্রবারের ঘটনার পর মোট সাতটি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে করা অভিযোগের ভিত্তিতেও মামলা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সাংবাদিকদের তরফে মোট পাঁচটি অভিযোগ জমা পড়েছে এবং সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু হয়েছে।
এর পাশাপাশি পুলিশের পক্ষ থেকেও একটি স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। মামলাগুলিতে বেআইনি জমায়েত, হিংসাত্মক জমায়েত, অপরাধমূলক কার্যকলাপ, সরকারি আধিকারিকদের কাজে বাধা এবং অশান্তিতে উসকানি দেওয়ার মতো অভিযোগের ভিত্তিতে আইনি পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, হেয়ার স্ট্রিট থানা এবং এন্টালি এলাকায় শুক্রবারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামলা দায়ের হয়েছে। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিয়ো ফুটেজ খতিয়ে দেখছেন। পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের অভিযোগও তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
কালো ব্যাজ পরে প্রতিবাদের সিদ্ধান্ত
সাংবাদিকদের উপর হামলার প্রতিবাদে শনিবার বিজেপি বিধায়কদের তরফে প্রতীকী প্রতিবাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মধ্যাহ্নভোজের বিরতির সময় বিধায়করা কালো ব্যাজ পরে প্রতিবাদ জানাবেন বলে জানা গিয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং তাঁদের কাজের স্বাধীনতার বিষয়টি সামনে আনা হবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। রাজনৈতিক আন্দোলন বা বিক্ষোভের সময় সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে সাধারণ মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দেন। সেই কাজ করতে গিয়ে তাঁদের আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ উঠলে তা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্যও উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
মুখ্যমন্ত্রীও সাংবাদিকদের উপর হামলার নিন্দা করে জানিয়েছেন, বাংলায় এই ধরনের ঘটনা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর বক্তব্য, কোনও প্রতিবাদের ভাষা হিংসা হতে পারে না এবং সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে আক্রমণও কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
