Puja Flower Recycling: পুজো শেষ, দেবতার চরণে দেওয়া ফুলেরও শেষ! কিন্তু সেই ফুলই যদি আবর্জনার স্তূপে না গিয়ে নতুন জীবনের গল্প বলে? মন্দিরের পুজোয় ব্যবহৃত ফুল এবার আর শুধু নদী, পুকুর বা ডাস্টবিনে ফেলার বর্জ্য হয়ে থাকবে না—সেই ফুল থেকেই তৈরি হতে পারে ধূপকাঠি ও আবির। কলকাতার চিনার পার্কে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এমনই এক পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিদিন বিভিন্ন মন্দিরে বিপুল পরিমাণ ফুল ও মালা ব্যবহার করা হয়। পুজো শেষে সেই ফুল যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না হলে তা জলাশয় ও পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ব্যবহৃত ফুল সংগ্রহ করে তা পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে যেমন দূষণ কমানোর চেষ্টা হবে, অন্যদিকে তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও।
পুজোর ফুল আর বর্জ্য নয়, তৈরি হবে নতুন পণ্য
বাংলার বিভিন্ন মন্দিরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ফুল ও মালা পুজোর কাজে ব্যবহৃত হয়। পুজো শেষ হয়ে যাওয়ার পর সেই ফুলগুলির অনেকটাই জমা হয় মন্দির চত্বর বা আশপাশের এলাকায়। কোথাও তা অন্যান্য আবর্জনার সঙ্গে মিশে যায়, আবার কোথাও জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হয়। ধর্মীয় আবেগের কারণে অনেক মানুষ পুজোর ফুল সাধারণ আবর্জনার মতো ফেলতে চান না। ফলে শেষ পর্যন্ত নদী, পুকুর কিংবা অন্য কোনও জলাশয়ে ফেলে দেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়।
এই পরিস্থিতির পরিবর্তন আনতেই ব্যবহৃত ফুল সংগ্রহ করে সেগুলিকে পুনর্ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। অগ্নিমিত্রা পালের বক্তব্য অনুযায়ী, মন্দির থেকে সংগ্রহ করা ফুলকে প্রক্রিয়াজাত করে ধূপকাঠি এবং আবির তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। এর ফলে একদিকে যেমন পুজোর ফুলের সঠিক ব্যবস্থাপনা সম্ভব হবে, অন্যদিকে সেই বর্জ্য থেকেই তৈরি হবে ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী।
পরিবেশ রক্ষার দিক থেকে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ ফুলকে সরাসরি ফেলে না দিয়ে তার পুনর্ব্যবহার করলে বর্জ্যের পরিমাণ কমানো সম্ভব। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পুনর্ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা বাড়তে পারে।
ধূপকাঠিতে ফুটবে পুজোর ফুলের নতুন জীবন
পুজোর ফুল থেকে ধূপকাঠি তৈরির ভাবনাটি এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। মন্দিরে ব্যবহৃত ফুলে থাকা বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানকে কাজে লাগিয়ে সেগুলিকে প্রক্রিয়াজাত করে সুগন্ধযুক্ত ধূপ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ যে ফুল কয়েক ঘণ্টা আগেও ছিল দেবতার চরণে, পুজো শেষে তা আর আবর্জনা হিসেবে পড়ে থাকবে না; বরং নতুন একটি পণ্যের কাঁচামাল হয়ে উঠতে পারে।
এমন উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন মডেল তৈরি হতে পারে। নির্দিষ্ট ব্যবস্থা করে ফুল সংগ্রহ করা, সেগুলি আলাদা করে রাখা এবং পরে প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে।
তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও পরিকাঠামো। কোন মন্দির থেকে কীভাবে ফুল সংগ্রহ করা হবে, কোথায় তা সংরক্ষণ করা হবে এবং কীভাবে ধূপকাঠি তৈরি হবে—এই পুরো প্রক্রিয়াকে একটি সংগঠিত ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে। তবেই উদ্যোগটি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
ফেলে দেওয়া ফুল থেকেই তৈরি হতে পারে আবির
শুধু ধূপকাঠি নয়, পুজোর পরে পড়ে থাকা ফুল থেকে আবির তৈরির কথাও উঠে এসেছে। বিভিন্ন ফুলের প্রাকৃতিক রংকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশবান্ধব আবির তৈরির সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। সেই ভাবনাকেই এবার মন্দিরের ব্যবহৃত ফুলের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এই ধরনের আবির তৈরি করা গেলে রাসায়নিক রঙের উপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে উৎসবের মরশুমে রঙের ব্যবহার বাড়ার সময় পরিবেশবান্ধব বিকল্পের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ফুল থেকে তৈরি আবির বাজারে জনপ্রিয় হলে তা স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি করতে পারে।
তবে ফুল থেকে তৈরি আবিরের ক্ষেত্রে গুণমান, নিরাপত্তা এবং ত্বকের উপযোগিতার মতো বিষয়গুলিও নিশ্চিত করা জরুরি। সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে এবং প্রয়োজনীয় মান বজায় রেখে উৎপাদন করা গেলে এই উদ্যোগ পরিবেশবান্ধব পণ্যের বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি বাড়তে পারে কর্মসংস্থান
এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা। ব্যবহৃত ফুল সংগ্রহ থেকে শুরু করে তা বাছাই, শুকনো করা, প্রক্রিয়াজাত করা এবং শেষ পর্যন্ত ধূপকাঠি বা আবির তৈরির জন্য একাধিক স্তরে মানুষের প্রয়োজন হতে পারে।
ফলে স্থানীয় স্তরে ছোট শিল্প বা স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির মাধ্যমে এই কাজ পরিচালনা করা গেলে বহু মানুষের আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা স্থানীয় উদ্যোগগুলিকে এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব।
একই সঙ্গে মন্দিরগুলিও এই ব্যবস্থার অংশ হতে পারে। প্রতিদিনের ব্যবহৃত ফুল নির্দিষ্ট জায়গায় জমা করা এবং তা সংগ্রহকারী সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও কার্যকর হতে পারে। অর্থাৎ একটি ফুলের জীবনচক্র পুজোর পরেই শেষ না হয়ে নতুন পণ্যের মাধ্যমে আরও একবার শুরু হতে পারে।
চিনার পার্কের অনুষ্ঠানে উঠে এল পরিবেশ ও সমাজের বার্তা
সম্প্রতি কলকাতার চিনার পার্কে সিদ্ধার্থ ইউনাইটেড সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার মিশনের উদ্যোগে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন অগ্নিমিত্রা পাল। সেখানে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী দুধ কুমার মণ্ডল-সহ আরও বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি।
সেখানেই বক্তব্য রাখতে গিয়ে অগ্নিমিত্রা পাল ব্যবহৃত পুজোর ফুলের পুনর্ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানান। তাঁর বক্তব্যে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থাৎ এই উদ্যোগকে শুধুমাত্র বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং পরিবেশ ও অর্থনীতিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি সম্ভাব্য উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে সিদ্ধার্থ ওয়েলফেয়ার মিশনের সাধারণ সম্পাদক বুদ্ধপ্রিয় মহাথেরোও বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শ ও মূল্যবোধ সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই ভবিষ্যতেও এই ধরনের উদ্যোগ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।
পুজোর ফুল থেকে পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
পুজোর ফুল থেকে ধূপকাঠি ও আবির তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন পদ্ধতি, ফুল সংগ্রহের পরিকাঠামো এবং উৎপাদন ব্যবস্থার উপর। তবে ধারণাটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সামনে আনছে—বর্জ্য বলে যাকে আমরা ফেলে দিই, সঠিক ব্যবস্থাপনায় সেটিই আবার সম্পদে পরিণত হতে পারে।
মন্দিরে ব্যবহৃত ফুল যদি পরিকল্পিতভাবে সংগ্রহ করা যায়, তাহলে জলাশয়ে ফুল ফেলার প্রবণতা কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে ফুলের পুনর্ব্যবহারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় উৎপাদন, স্বনির্ভরতা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, পুজোর পর ফেলে দেওয়া ফুলকে নতুনভাবে কাজে লাগানোর এই উদ্যোগ পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন নজর থাকবে, এই পরিকল্পনা কবে থেকে বাস্তবে রূপ নেয় এবং রাজ্যের বিভিন্ন মন্দিরে ব্যবহৃত ফুল সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের জন্য কী ধরনের পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়। সফল হলে আগামী দিনে পুজোর ফুল আর শুধুই বর্জ্য নয়—বরং পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠতে পারে।
