‘ইরান তেল বিক্রি করতে না পারলে কেউ পারবে না’, আমেরিকাকে বড় হুঁশিয়ারি! হরমুজ ঘিরে কি আরও ভয়াবহ সংঘাতের আশঙ্কা?

Iran Strait of Hormuz Warning as Iranian Parliament Speaker warns that Gulf nations may not sell oil if Tehran cannot export crude

Iran Strait of Hormuz Warning: ইরান ও আমেরিকার মধ্যে চলমান সংঘাত এবার নতুন করে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের দিকে বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হুমকির জেরে আশঙ্কা বাড়ছে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে তেল পরিবহণ আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হতে পারে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—ইরান যদি তেল বিক্রি করতে না পারে, তাহলে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলিও যেন স্বাভাবিকভাবে তেল রপ্তানি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করবে তেহরান। তাঁর বক্তব্য, এই সংঘাত এখন ‘সব অথবা কিছুই নয়’-এর পর্যায়ে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও হরমুজ প্রণালীতে ইরানের হামলা হলে ইরানের সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্রে পাল্টা হামলার হুমকি দিয়েছেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন শুধু সামরিক উত্তেজনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব বিশ্ব বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং তেলের দামের উপরও পড়তে পারে।

হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের কড়া বার্তা

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর আগের পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আর ফিরিয়ে নেওয়া হবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম শর্ত হল আমেরিকান বাহিনীর উপস্থিতি না থাকা।

গালিবাফের বার্তায় আরও বলা হয়েছে, যে পরিস্থিতিতে ইরান নিজে তেল বিক্রি করতে পারবে না, সেই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য কোনও দেশকেও তেল বিক্রির সুযোগ দেওয়া হবে না। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হল, ইরানের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এই অঞ্চলের পরিকাঠামোও নিরাপদ থাকবে না এবং হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ নিয়েও তেহরান নিজের অবস্থান থেকে সরে আসবে না।

এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, ইরান এখন হরমুজ প্রণালীকে শুধু একটি জলপথ হিসেবে দেখছে না। বরং এই অঞ্চলকে নিজেদের কৌশলগত নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার অবস্থান নিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণ পথ হিসেবে হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও পৌঁছতে পারে।

ট্রাম্পের পাল্টা হুমকি, জাহাজে হামলা হলে সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংসের বার্তা

ইরানের এই হুঁশিয়ারির আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও অত্যন্ত কড়া বার্তা দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী কোনও জাহাজে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট, ড্রোন বা অন্য কোনও অস্ত্র দিয়ে হামলা করলে আমেরিকা পাল্টা ইরানের একটি সেতু অথবা বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা করবে।

ট্রাম্পের হুমকির মধ্যে রাজধানী তেহরানের আশপাশের পরিকাঠামোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা যে আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই ধরনের পাল্টা হামলার নীতি বাস্তবায়িত হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের কাছে উদ্বেগের বিষয় হল, হরমুজ প্রণালীতে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এর সঙ্গে যদি সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু হয়, তাহলে সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

একের পর এক হামলা, বাড়ছে সামরিক উত্তেজনা

এই সময়ে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাতও অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে একাধিক দফায় হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের সামরিক অভিযান আঞ্চলিক জলপথে বেসামরিক নাবিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হুমকি কমানোর লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।

অন্যদিকে ইরানের বিদেশমন্ত্রী সেয়েদ আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, ইরানের উপর যে কোনও ধরনের আগ্রাসন হলে তার জবাব দেওয়া হবে। ইরানের পরিকাঠামোতে হামলা হলে পাল্টা প্রতিক্রিয়া আরও শক্তিশালী এবং নির্ণায়ক হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, দেশের পশ্চিমাঞ্চলের একাধিক শহরের কাছে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইরাক সীমান্তের কাছে একটি হামলায় হতাহতের খবরও সামনে এসেছে। একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলিও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। কুয়েতের সামরিক কর্তৃপক্ষ তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে শত্রুপক্ষের ড্রোন হামলা মোকাবিলার দাবি করেছে।

ফলে পরিস্থিতি এখন একাধিক স্তরে জটিল হয়ে উঠছে। একদিকে ইরান ও আমেরিকার সরাসরি সংঘাত, অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং তৃতীয়দিকে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

তেলের বাজারে বড় ধাক্কার আশঙ্কা

হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছয়। ফলে এই পথে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাহত হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

ইরানের পক্ষ থেকে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তার অর্থ হল তেহরান নিজের তেল রপ্তানি বন্ধ বা সীমিত হলে অন্য উপসাগরীয় দেশগুলির তেল রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করতে পারে। ইতিমধ্যেই এই সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলির উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।

শুধু তেল নয়, পরিবহণ খরচ বাড়লে তার প্রভাব খাদ্য, শিল্পপণ্য এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন সামগ্রীর দামেও পড়তে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। এই কারণেই হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতিকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং এটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে।

শুধু হরমুজ নয়, লোহিত সাগরেও বাড়ছে উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব শুধু হরমুজ প্রণালীতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাব এল-মান্দেব জলপথ নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত হুথি গোষ্ঠীর তৎপরতার কারণে ওই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়েও আশঙ্কা বাড়ছে। ফলে একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জাহাজ পরিবহণ আরও বড় সমস্যার মুখে পড়তে পারে।

এই পরিস্থিতিতে জাহাজ সংস্থাগুলি বিকল্প পথ বেছে নিতে বাধ্য হলে পণ্য পরিবহণের সময় এবং খরচ উভয়ই বেড়ে যেতে পারে। বিমা খরচও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপর।

ফলে ইরানের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি এবং ট্রাম্পের পাল্টা হুমকি এখন শুধুমাত্র দুই দেশের কূটনৈতিক সংঘাত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তা, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা।

সামনে কি আরও বড় সংঘাত?

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সংঘাত কি আরও বিস্তৃত হবে? নাকি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে? আপাতত প্রকাশ্য বক্তব্যে দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় বলে মনে হচ্ছে।

ইরানের বক্তব্য, তাদের নিরাপত্তা ও তেল রপ্তানির অধিকার নিশ্চিত না হলে তারা পিছিয়ে যাবে না। অন্যদিকে আমেরিকাও হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার অবস্থানে রয়েছে। এই মুখোমুখি অবস্থান যত দীর্ঘ হবে, ততই বাড়বে সংঘাতের অর্থনৈতিক ও মানবিক মূল্য।

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা, একটি ছোট ঘটনা থেকেও বড় ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া শুরু হতে পারে। কোনও জাহাজে হামলা, কোনও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোতে আঘাত বা ভুল বোঝাবুঝি—যে কোনও একটি ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও দ্রুত অবনতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

এই মুহূর্তে তাই গোটা বিশ্বের নজর হরমুজ প্রণালীর দিকে। কারণ ইরানের ‘আমরা না পারলে কেউ পারবে না’ বার্তা এবং ট্রাম্পের পাল্টা সামরিক হুমকি—দুইয়ের সংঘাতে যদি সত্যিই তেল সরবরাহ ও সমুদ্রপথ দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হয়, তাহলে তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের প্রতিটি অর্থনীতিতে পৌঁছতে পারে।

Exit mobile version