Five Faced Vishwakarma: ৫ মুখ, ১০ হাত! বিশ্বকর্মার এমন রূপ কখনও দেখেছেন?
বাংলার মাটিতেই হয় দেবশিল্পীর এই বিরল রূপের পুজো কিন্তু জানেন কি, এখানে যে বিশ্বকর্মাকে পুজো করা হয়, তিনি আমাদের চেনা বিশ্বকর্মা নন!সাধারণত আমরা যাঁকে দেখি, তাঁর এক মুখ, চার হাত। হাতে থাকে নানা অস্ত্র ও কাজের সরঞ্জাম।কিন্তু এই মন্দিরে দেবতার রূপ একেবারেই আলাদা ,পাঁচটি মুখ, দশটি হাত ।প্রতিটি হাতে যেন লুকিয়ে আছে একেকটি শক্তির প্রতীক দেখলেই মনে হবে, এ কি সত্যিই বিশ্বকর্মা?কেন এই অদ্ভুত রূপ?
কেন বাংলার এই জায়গাতেই এমন বিরল মূর্তির আরাধনা হয়?শুধু মূর্তি দেখলেই হবে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু বছরের ইতিহাস, মানুষের বিশ্বাস আর পরম্পরা
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই অদ্ভুত রূপেই দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনা করে আসছেন মানুষ।
বাঁকুড়ার গঙ্গাজলঘাটি ব্লকের কাপিষ্ঠা গ্রাম পঞ্চায়েতের শালবেদিয়া গ্রাম। আর এই গ্রামের বিশ্বকর্মা পুজোর গল্পটা যেন বাংলার মাটিতে লুকিয়ে থাকা এক আশ্চর্য ইতিহাস। কারণ এখানে পুজো হয় না আমাদের চেনা-পরিচিত বিশ্বকর্মার। এখানে দেবশিল্পীর রূপই যেন বদলে যায়। পাঁচটি মুখ, দশটি হাত আর বাহনও হাতি নয়, রাজহাঁস। বছরের পর বছর ধরে এই বিরল রূপেই ভক্তি আর বিশ্বাসের সঙ্গে পূজিত হয়ে আসছেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা।
এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কয়েক পুরুষের আবেগ। গ্রামের প্রবীণদের কথায়, স্বাধীনতার আগে থেকেই শালবেদিয়ায় হয়ে আসছে এই পুজো। গ্রামের কর্মকার সম্প্রদায়ের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল আরাধনা। বাবা পুজো করেছেন, তাঁর আগে দাদু করেছেন, আর সেই পরম্পরাই আজও ধরে রেখেছেন পরিবারের পরের প্রজন্ম। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, কিন্তু বিশ্বকর্মার প্রতি সেই টানটুকু বদলায়নি। বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে সেই বিশ্বাস আরও গভীর হয়েছে।
এই পঞ্চমুখী বিশ্বকর্মার প্রতিটি মুখের মধ্যেই যেন লুকিয়ে রয়েছে শিল্পের একেকটি গল্প। গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, পাঁচটি মুখ পঞ্চশিল্প ও শিল্পীদের প্রতীক। লৌহ, কাষ্ঠ, ধাতু, ভাস্কর্য এবং স্বর্ণ এই পাঁচ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিশ্বকর্মার পাঁচ মুখের ভাবনা। অর্থাৎ শুধু দেবতার আরাধনা নয়, নিজেদের হাতের কাজ, কারিগরি আর শিল্পকেও যেন প্রণাম করেন কর্মকার সম্প্রদায়ের মানুষ।
আর দেবশিল্পীর দশ হাতেও রয়েছে আলাদা তাৎপর্য। হাতে থাকে বেদ, সুদর্শন চক্র, ত্রিশূল, গদা, শঙ্খ, হাতুড়ি, তুলাদণ্ড ও কমণ্ডলু। পাশে থাকেন লক্ষ্মী ও সরস্বতী। আর বাহন হিসেবে রয়েছে হংসরাজ। এই মূর্তির সামনে দাঁড়ালে তাই শুধু বিস্ময় জাগে না, মনে হয় একটি মূর্তির মধ্যেই যেন জড়িয়ে রয়েছে জ্ঞান, শক্তি, শিল্প, সম্পদ আর সৃষ্টির প্রতীক।
এই পুজোর সঙ্গে কর্মকার সম্প্রদায়ের সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর।
পুরাণের বিশ্বাস অনুযায়ী, বিশ্বকর্মার পাঁচ মানসপুত্র মনু, ময়, ত্বষ্টা, শিল্পী ও বিশ্বজ্ঞ পঞ্চশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। কামার, ছুতোর, ধাতুশিল্পী, ভাস্কর এবং স্বর্ণকার বিভিন্ন শিল্পের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের কথা বলা হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই বিশ্বকর্মাকে শুধু দেবতা হিসেবে নয়, নিজেদের শিল্পের আদি গুরু হিসেবেও দেখেন এই সম্প্রদায়ের মানুষ।শালবেদিয়ার মাধব কর্মকার প্রায় ৪০ বছর ধরে এই পঞ্চমুখী বিশ্বকর্মার পুজো করে আসছেন। এই গ্রাম ছাড়াও বাঁকুড়ার আরও কয়েকটি জায়গায় পঞ্চমুখী বিশ্বকর্মার পুজো হয়। ভাদ্র সংক্রান্তির দিন তাই শুধু একটা পুজো হয় না, ফিরে আসে বহু পুরনো স্মৃতি, বংশপরম্পরার বিশ্বাস আর নিজেদের শিকড়কে আঁকড়ে থাকার গল্প।
প্রতি বছর এই বিরল বিগ্রহ দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন শালবেদিয়ায়। কর্মকার সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, এই রূপে বিশ্বকর্মার আরাধনা করলে ব্যবসায় সমৃদ্ধি আসে, বাড়ে কারিগরি দক্ষতা, মঙ্গল হয় পরিবারে। তাই এই পুজো তাঁদের কাছে শুধুই উৎসব নয়। এটি তাঁদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি, নিজেদের শিল্পের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আগামী প্রজন্মের হাতে সেই ঐতিহ্য তুলে দেওয়ার এক অঙ্গীকার। পাঁচ মুখ আর দশ হাতের এই বিশ্বকর্মা যেন আজও বলে চলেছেন শিল্প শুধু জীবিকা নয়, শিল্পের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মানুষের প্রজন্মের পর প্রজন্মের ভালোবাসা।
#fivefacedvishwakarma #vishwakarmapuja #vishwakarma #vishwakarmaidol #rarevishwakarma #vishwakarmatemple #bengaltradition #religiousheritage #vishwakarmatradition













