Bread Price Hike in West Bengal: বাজারে ফের বাড়তে পারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। কাঁচামালের ক্রমবর্ধমান খরচ, অপরিশোধিত তেলের দামের প্রভাব, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে দেশের বড় বড় ভোগ্যপণ্য সংস্থাগুলি জুলাই-সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে ধাপে ধাপে দাম বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারে। এর আগে এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকেই একাধিক বড় সংস্থা গড়ে ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছিল। এবারও সেই প্রবণতা বজায় থাকার ইঙ্গিত মিলছে। তবে শুধু সরাসরি দাম বাড়ানো নয়, একই দামে পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও বাড়তে পারে। অর্থাৎ প্যাকেটের গায়ে দাম একই থাকলেও ভিতরে পণ্যের পরিমাণ কিছুটা কমে যেতে পারে। ফলে দোকানে একই দাম দেখেও ক্রেতার হাতে আসতে পারে কম পণ্য। বিস্কুট, স্ন্যাক্স এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে এই পরিবর্তনের প্রভাব বিশেষভাবে চোখে পড়তে পারে।
কাঁচামালের দাম বাড়তেই বাড়ছে পণ্যের খরচ
ভোগ্যপণ্য শিল্পে পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে কাঁচামালের খরচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তেল, প্যাকেজিং সামগ্রী, খাদ্যশস্য এবং অন্যান্য উপকরণের দামের ওঠানামা সরাসরি উৎপাদন খরচে প্রভাব ফেলে। সেই খরচ বেড়ে গেলে সংস্থাগুলির সামনে সাধারণত দুটি পথ থাকে—একদিকে পণ্যের দাম বাড়ানো, অন্যদিকে একই দামে পণ্যের পরিমাণ কমানো।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই ধরনের কৌশলই দেখা যেতে পারে বলে শিল্পমহলের ইঙ্গিত। এপ্রিল থেকে জুন ত্রৈমাসিকে দেশের অধিকাংশ বড় ভোগ্যপণ্য সংস্থা গড়ে ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছিল। এবার জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকেও একাধিক সংস্থা পর্যায়ক্রমে দাম বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারে।
তবে বাজারের চাহিদা একেবারে দুর্বল হয়ে পড়েনি। বরং উচ্চমূল্যের বা উন্নত মানের পণ্যের চাহিদা এখনও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী বলে সংস্থাগুলির বক্তব্যে উঠে এসেছে। আয় বৃদ্ধির গতিও আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে বলে শিল্পমহলের পর্যবেক্ষণ। ফলে সংস্থাগুলি একদিকে খরচ সামলানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বাজারের চাহিদাও ধরে রাখতে চাইছে।
এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সরাসরি দাম বাড়ালে ক্রেতার ওপর চাপ পড়তে পারে। আবার দাম অপরিবর্তিত রেখে উৎপাদন খরচ বাড়তে থাকলে সংস্থার মুনাফার মার্জিনে চাপ পড়বে। তাই তৃতীয় পথ হিসেবে প্যাকেটের পরিমাণ কমানোর কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
একই দাম, কিন্তু প্যাকেটে কম পণ্য—বাড়ছে ‘শ্রিঙ্কফ্লেশন’-এর আশঙ্কা
ক্রেতাদের জন্য পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে ‘শ্রিঙ্কফ্লেশন’। অর্থাৎ পণ্যের বিক্রয়মূল্য একই রেখে প্যাকেটের ওজন বা পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দেওয়া। বাইরে থেকে দেখে মনে হতে পারে পণ্যের দাম বাড়েনি, কিন্তু বাস্তবে প্রতি গ্রাম বা প্রতি কিলোগ্রাম পণ্যের খরচ বেড়ে যায়।
বিস্কুট, স্ন্যাক্স এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন পণ্যে এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে বলে শিল্পমহলের ইঙ্গিত। কারণ এই ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে কয়েক টাকা দাম বাড়ালেও ক্রেতার প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ৫ টাকা বা ১০ টাকার মতো ছোট দামের প্যাকেটের ক্ষেত্রে সরাসরি দাম বাড়ানোর পরিবর্তে পরিমাণ সামান্য কমানো তুলনামূলকভাবে সহজ কৌশল হতে পারে।
তবে ক্রেতার কাছে এর প্রভাব কম নয়। একটি প্যাকেটের দাম যদি একই থাকে কিন্তু তার ওজন কমে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবারের মাসিক খরচের হিসাবেও পরিবর্তন আসতে পারে। একই পরিমাণ পণ্য কিনতে ক্রেতাকে হয় বেশি প্যাকেট কিনতে হবে, অথবা একই বাজেটে কম পণ্য নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
এই কারণেই বাজারে শুধু ‘দাম কত বাড়ল’—এই প্রশ্নই নয়, ‘একই দামে কতটা পণ্য পাওয়া যাচ্ছে’—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিস্কুটের দামে আসতে পারে নতুন চাপ
বিস্কুট ও বেকারি পণ্যের বাজারে পরিবর্তনের সম্ভাবনা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ব্রিটানিয়ার মতো বড় সংস্থার ক্ষেত্রেও পণ্যের দাম বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেলের চড়া দামের প্রভাবের কারণে ৫ টাকা ও ১০ টাকার বিস্কুটের প্যাকেটে প্রায় ১.৫ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে বাজারের চাহিদা এখনও শক্তিশালী এবং ক্রেতাদের কেনাকাটার প্রবণতা চাঙ্গা রয়েছে বলেও সংস্থার তরফে দাবি করা হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বিস্কুটের মতো দৈনন্দিন পণ্যের দাম সামান্য বাড়লেও তার প্রভাব ব্যাপক হতে পারে। কারণ এটি এমন একটি পণ্য যা শহর থেকে গ্রাম—প্রায় সব ধরনের পরিবারের নিয়মিত বাজারের অংশ।
একটি প্যাকেটের দাম সামান্য বাড়লে এককভাবে তা বড় অঙ্ক মনে না হলেও মাসের পর মাস একই পরিবর্তন চলতে থাকলে পরিবারের মোট খাদ্য ও দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে ছোট দামের প্যাকেটের মূল্যবৃদ্ধি নজরে পড়ে বেশি। কারণ তাঁদের মাসিক বাজারের বড় অংশই নির্ভর করে নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে একাধিক নিত্যপণ্য কেনার ওপর।
শুধু বিস্কুট বা স্ন্যাক্স নয়, খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও ব্যয়ের চাপ নিয়ে সতর্কতার কথা সামনে এসেছে। নেসলে ইন্ডিয়ার ক্ষেত্রে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, খাদ্যপণ্যের বাড়তে থাকা দাম এবং এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই কারণগুলির সম্মিলিত প্রভাবে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খাদ্যপণ্য শিল্পে কাঁচামালের দাম এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব থাকায় সংস্থাগুলিকে একাধিক দিক বিবেচনা করতে হচ্ছে।
একদিকে পণ্যের দাম খুব বেশি বাড়ালে বাজারের চাহিদায় প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে খরচের চাপ সম্পূর্ণ নিজের কাঁধে নিলে ব্যবসায়িক মার্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে আগামী ত্রৈমাসিকে বিভিন্ন সংস্থা কীভাবে মূল্য নির্ধারণ করে, সেটি বিশেষ নজরে থাকবে।
এখানে আবহাওয়ার প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিপণ্যের উৎপাদন এবং সরবরাহে পরিবর্তন হলে খাদ্যপণ্যের কাঁচামালের দামও বদলে যেতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থাও ভোগ্যপণ্যের দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
হিন্দুস্তান ইউনিলিভারেও ২ থেকে ৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত
হিন্দুস্তান ইউনিলিভারের তরফেও একাধিক পণ্যের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত এসেছে। সংস্থার প্রধান নির্বাহীর বক্তব্য অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকের তুলনায় জুলাই-সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে ধাপে ধাপে ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে।
অর্থাৎ বাজারে একবারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে দাম বাড়ানোর কৌশল দেখা যেতে পারে। এতে ক্রেতার চোখে প্রতিটি পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে ছোট বলে মনে হলেও কয়েক মাসের মধ্যে মোট প্রভাব যথেষ্ট বড় হতে পারে।
দেশের বিপুল সংখ্যক পরিবার প্রতিদিন যে সাবান, প্রসাধনসামগ্রী, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পণ্য, খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ব্যবহার করে, তার বড় অংশই বড় ভোগ্যপণ্য সংস্থাগুলির আওতায় পড়ে। তাই এই সংস্থাগুলির মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত সরাসরি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির চাপের মধ্যেই এবার বাড়ল পাউরুটির দাম। ওয়েস্ট বেঙ্গল বেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইমরানের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতি পাউন্ড পাউরুটির দাম ৪ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। ফলে যে পাউরুটি এতদিন বাজারে ৩২ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, তার নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ৩৬ টাকা।
অর্থাৎ, এক লাফে পাউরুটির দামে প্রায় ১২.৫ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। প্রতিদিনের বাজারে পাউরুটি বহু মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের নিয়মিত খাদ্যতালিকার অংশ। তাই দাম বাড়ার এই প্রভাব সরাসরি পরিবারের দৈনন্দিন খরচে পড়তে পারে। ফলে বিস্কুট, স্ন্যাক্স ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের পাশাপাশি এবার পাউরুটির দাম বৃদ্ধিও সাধারণ মানুষের বাজার খরচের ওপর নতুন চাপ তৈরি করল।













