Adani Power Bangladesh: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের পরই আদানি পাওয়ারের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়াকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে না যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পরদিন গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ৮০০ মেগাওয়াটের ইউনিট কারিগরি সমস্যার কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি আরও বেড়েছে বলে বাংলা নিউজ২৪.কম-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ঘটনাগুলির সময়গত মিল থাকলেও তারেক রহমানের ভারত সফর না যাওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার সরাসরি সম্পর্কের কোনও প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে নেই। ফলে রাজনৈতিক সন্দেহ এবং প্রমাণিত তথ্য—দুটিকে আলাদা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল?
বাংলা নিউজ২৪.কম-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে যোগাযোগ চলছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বেও তিনি যাচ্ছেন না।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, ব্রিকস সম্মেলনে দেওয়া আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে। একই সঙ্গে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন বলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।
১০ সেপ্টেম্বর এই অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়। তার পরদিনই আদানি পাওয়ারের গোড্ডা কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার খবর সামনে আসে। এই সময়ের নৈকট্য নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, এই দুই ঘটনার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্রের প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঠিক কী ঘটেছে?
ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। সেখানে ৮০০ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিট রয়েছে। একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কেন্দ্রটির উৎপাদন ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।
আদানির পক্ষ থেকে এর কারণ হিসেবে কারিগরি সমস্যার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বয়লারের একটি সমস্যার কারণে ইউনিটটি বন্ধ হয়। সেটিকে ঠান্ডা করে মেরামতের কাজ শুরু করতে সময় লাগবে এবং পুরোপুরি উৎপাদনে ফিরতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
এর আগে অবশ্য কেন্দ্রটি কয়লা সরবরাহের সমস্যার মধ্যেও ছিল। রেলপথে জট এবং কয়লা পরিবহণে বিধিনিষেধের কারণে গোড্ডা কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় কয়লা পৌঁছাতে সমস্যা হয়েছিল বলে আদানি পাওয়ার জানিয়েছিল। ফলে দিনের কম চাহিদার সময়ে উৎপাদন কমিয়ে সন্ধ্যার বেশি চাহিদার সময়ে সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কেন প্রভাব পড়ছে?
আদানি পাওয়ারের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়া এমন সময়ে ঘটেছে, যখন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও আগে থেকেই নানা সমস্যার মধ্যে রয়েছে। প্রতিবেদনে গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে দেশের বেশ কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছিল না।
এই পরিস্থিতিতে গোড্ডা কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে কোনও একটি বড় কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাতেও পড়তে পারে।
আদানির সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি হয়েছিল ২০১৭ সালে। চুক্তি অনুযায়ী গোড্ডা কেন্দ্র থেকে দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে এই কেন্দ্রের উৎপাদন এবং সরবরাহের ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চুক্তি নিয়ে আগেই উঠেছে নানা প্রশ্ন
আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি নিয়ে এর আগেও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। চুক্তিটিকে ‘অসম’ বলে উল্লেখ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছিল। সেখানে দাবি করা হয়, আদানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটি পরে বিশেষ আইনে করা বিদ্যুৎ চুক্তিগুলি নিয়ে প্রতিবেদন জমা দেয় বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলা নিউজ২৪.কম-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আদানির সঙ্গে করা চুক্তিতে সমস্যা রয়েছে এবং চুক্তিটি বাতিলযোগ্য হলে বিদ্যুৎ বিভাগকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রির কারণে বিদ্যুৎ খাতের উপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে বলেও সেখানে দাবি করা হয়েছে।
বকেয়া বিল নিয়েও আগে থেকেই ছিল টানাপোড়েন
আদানি পাওয়ার ও বাংলাদেশের মধ্যে শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহ নয়, বকেয়া অর্থ নিয়েও আগে থেকে টানাপোড়েন রয়েছে। বাংলা নিউজ২৪.কম-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আদানি পাওয়ার বাংলাদেশকে একাধিকবার বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য চিঠি দিয়েছে। বকেয়া অর্থের কারণে কয়লা কিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কার কথাও ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল।
গোড্ডা কেন্দ্রের ক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট এবং দুটি ইউনিটের প্রতিটির ক্ষমতা ৮০০ মেগাওয়াট। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আদানি পাওয়ারের ২৫ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি হয়েছিল।
কয়লার দাম নিয়েও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও আদানি পাওয়ারের মধ্যে মতবিরোধের কথা ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আদানি বেশি দাম ধরে বিল করছে বলে বাংলাদেশের পক্ষের বক্তব্য এবং বাজারদর ধরে অর্থ পরিশোধের অবস্থানের কথাও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থাৎ বর্তমান সরবরাহ সমস্যার আগেও এই বিদ্যুৎ চুক্তিকে ঘিরে অর্থ, কয়লার দাম এবং বকেয়া বিল নিয়ে একাধিক প্রশ্ন ছিল।
রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্পর্ক কি আছে?
এক দিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছিল। অন্য দিকে, ১০ সেপ্টেম্বর তাঁর ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হওয়ার পরদিনই আদানি পাওয়ারের গোড্ডা কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার খবর আসে।
তবে শুধু সময়ের মিল থেকে দুই ঘটনার মধ্যে কারণ-সম্পর্ক তৈরি করা যায় না। প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে তারেক রহমানের ভারত সফর না যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় আদানি পাওয়ার ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়েছে। বরং আদানির পক্ষ থেকে ইউনিট বন্ধ হওয়ার কারণ হিসেবে কারিগরি সমস্যার কথা বলা হয়েছে।
ফলে এই মুহূর্তে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, আদানি কেন্দ্রের একটি ইউনিট কেন বন্ধ হয়েছে এবং কত দ্রুত তা স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের কোনও বাস্তব সম্পর্ক রয়েছে কি না।
সরকারের সামনে দ্রুত সিদ্ধান্তের প্রশ্ন
আদানি চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশে আগে থেকেই বিতর্ক রয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন করে বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা। এই পরিস্থিতিতে সরকারকে চুক্তির শর্ত, সরবরাহের দায়, বকেয়া অর্থ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন পরিস্থিতি—সবকিছু খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা আলোচনায় এসেছে।
অন্য দিকে, আদানি পাওয়ারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ক্ষেত্রে আগে কয়লা পরিবহণের সমস্যা এবং পরে কারিগরি ত্রুটির কথা জানানো হয়েছে। ফলে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, চুক্তির নথি এবং উৎপাদনের তথ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তারেক রহমানের ভারত সফর না যাওয়া এবং তার পরেই আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার ঘটনা একই সময়ে ঘটেছে—এটি তথ্য। কিন্তু একটি ঘটনা অন্যটির কারণে ঘটেছে, এমন প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি। তাই রাজনৈতিক জল্পনার বাইরে গিয়ে চুক্তির শর্ত, কারিগরি কারণ এবং সরবরাহ পরিস্থিতি খতিয়ে দেখাই এখন মূল বিষয়।
#AdaniPowerBangladesh #AdaniPowerDeal #BangladeshElectricitySupply #AdaniGoddaPowerPlant #BangladeshPowerCrisis #BangladeshGovernmentDecision #IndiaBangladeshPowerDeal













