লিখেছেন সুব্রত আচার্য
শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব সামলাবেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম—এই বক্তব্য সামনে আসতেই দলের অন্দরের বিরোধ প্রকাশ্যে। কলকাতার নিউ টাউনে জ্যেষ্ঠ নেতাদের বৈঠকে উঠেছে আপত্তি। আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রশ্ন তোলা হয়েছে একটি বইয়ের প্রচার নিয়েও। প্রথম কলকাতার দায়িত্বশীল সূত্রের খবর, দ্রুত নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে পারেন শেখ হাসিনা।
আওয়ামী লীগের পরবর্তী সভাপতি কি শেখ ফজলুল করিম সেলিম?
শেখ হাসিনা তেমন কোনও ঘোষণা করেননি। তিনি যা বলেছেন, তার অর্থ কিছুটা আলাদা। কিন্তু তাঁর একটি সাক্ষাৎকারে শেখ সেলিমের নাম উঠে আসার পর থেকেই আওয়ামী লীগের ভিতরে প্রবল অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সেই ক্ষোভ আর দলের অন্দরে সীমাবদ্ধ নেই। কলকাতার নিউ টাউনে জ্যেষ্ঠ নেতাদের বৈঠক থেকে সমাজমাধ্যম—সব জায়গাতেই এখন একই প্রশ্ন, শেখ সেলিমকে হঠাৎ সামনে আনছে কারা?
বিতর্কের শুরু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালকে দেওয়া শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার থেকে।
শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কে দেবেন? তাঁর বোন শেখ রেহানা কি সক্রিয় রাজনীতিতে আসবেন? এই প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, শেখ রেহানা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন।
এরপরই শেখ সেলিমের নাম উল্লেখ করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, “এখন শেখ সেলিম সিনিয়র মোস্ট প্রেসিডিয়াম সদস্য। আমার অনুপস্থিতিতে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।”
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি হল—অনুপস্থিতি।
শেখ হাসিনা বলেননি, তাঁর পরে আওয়ামী লীগের স্থায়ী সভাপতি হবেন শেখ সেলিম। তিনি নিজের অনুপস্থিতিতে দলের দায়িত্ব সামলানোর কথা বলেছেন। কিন্তু এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই শেখ সেলিমকে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ সভাপতি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে দলের ভিতর থেকেই।
নিউ টাউনের বৈঠকে ক্ষোভ
শেখ সেলিমকে ঘিরে অসন্তোষ যে শুধু বিচ্ছিন্ন কয়েকজন নেতা-কর্মীর মধ্যে নেই, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে কলকাতায় আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বৈঠকে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার রাতে কলকাতার নিউ টাউনে শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই এবং সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিনের বাসায় ওই বৈঠক হয়। সেখানে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের আট থেকে দশজন জ্যেষ্ঠ নেতা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম এবং ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদুল হাসান রিপন।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র বিডিনিউজকে জানিয়েছে, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে শেখ সেলিম সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন—এমন ইঙ্গিতে নেতাদের একটি অংশ প্রকাশ্যেই হতাশা ও ক্ষোভ জানান।
এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে বোঝা যাচ্ছে, আপত্তি শুধু আওয়ামী লীগের নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে নেই। দলের সাংগঠনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং একসময় সরকার পরিচালনায় থাকা নেতাদের একাংশও শেখ সেলিমকে সামনে আনার বিষয়টি সহজভাবে নিচ্ছেন না।
বৈঠকের জায়গাটিও তাৎপর্যপূর্ণ। শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় শেখ হেলাল উদ্দিনের নিউ টাউনের বাসায় বসেই দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা এই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ নেতৃত্বের প্রশ্নে বিরোধ এখন আওয়ামী লীগের একেবারে উপরতলায় পৌঁছে গিয়েছে।
শেখ সেলিমকে নিয়ে নেতাদের আপত্তি কোথায়?
বিডিনিউজের অন্য একটি প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ নেতার আপত্তির আরও কিছু কারণ উঠে এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতার অভিযোগ, শেখ সেলিমের বাড়িতে দলীয় বৈঠকে যেসব আলোচনা হয়, সেগুলি দ্রুত বাইরে চলে যায়। অন্য এক নেতা তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ওঠা দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন।
অর্থাৎ বিতর্কটি শুধু দলের সভাপতির পদ নিয়ে নয়। শেখ সেলিমের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক ভূমিকা এবং দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা তাঁর উপর কতটা আস্থা রাখতে পারছেন—প্রশ্ন উঠেছে সেখানেও।
ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বিস্ফোরক প্রশ্ন
ঘটনা এখানেই থেমে থাকেনি।
আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি লেখায় সরাসরি প্রশ্ন তোলা হয়েছে—শেখ সেলিমের নাম হঠাৎ সামনে আনা হল কেন? তাঁকে সামনে আনছেন কারা? শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় ভারতীয় সাংবাদিক কেন বারবার শেখ সেলিমের প্রসঙ্গ তুলেছেন?
পোস্টটিতে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে, শেখ সেলিমকে সামনে আনার পিছনে বিশেষ কোনও পরিকল্পনা থাকতে পারে। বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তির ভূমিকা নিয়েও সেখানে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তবে এই অভিযোগের সমর্থনে কোনও নথি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এই অংশটি এখনও পোস্টে তোলা দাবি। কিন্তু আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড পেজে এমন লেখা প্রকাশিত হওয়াটাই রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
দলের ভিতরে ক্ষোভ না থাকলে নেতৃত্বের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এমন প্রশ্ন নিজস্ব পেজে জায়গা পাওয়ার কথা নয়।
বই বিক্রি, না নেতৃত্বের প্রচার?
ফেসবুক পোস্টটির সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অংশ একটি বইকে ঘিরে।
সেখানে লেখা হয়েছে, “কিছুদিন আগে শেখ সেলিম নিজে বিভিন্ন নেতা-কর্মী, সাংবাদিক ও সুধীজনকে ফোন করে কথিত ওই ভারতীয় সাংবাদিকের নতুন প্রকাশিত একটি বই কেনার জন্য অনুরোধ করেন।”
এরপর পোস্টে আরও গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে—“ওই বইতেই শেখ সেলিমকে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে প্রজেক্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ বই কেনার অনুরোধটি ছিল আসলে নিজের নেতৃত্বের প্রচারণা।”
এই অভিযোগ সত্য হলে ঘটনাটি আর সাধারণ বই বিক্রির প্রচারে আটকে থাকে না। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—বইয়ের প্রচার, শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার এবং সেখানে শেখ সেলিমের নাম উঠে আসার মধ্যে কোনও পরিকল্পিত যোগসূত্র রয়েছে কি?
অবশ্য পোস্টে বইটির সংশ্লিষ্ট অংশ, ফোনালাপের প্রমাণ কিংবা অন্য কোনও নথি দেওয়া হয়নি। শেখ সেলিমও এই অভিযোগের প্রকাশ্য জবাব দিয়েছেন বলে এখনও জানা যায়নি। ফলে অভিযোগকে এখনই প্রমাণিত তথ্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কিন্তু প্রশ্নগুলি উঠেছে দলের নিজস্ব পরিসর থেকে। সেটিই এই বিতর্ককে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে।
দলের একটি মহল কি শেখ সেলিমকে ‘প্রজেক্ট’ করছে?
প্রথম কলকাতার দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের একটি মহল গত কয়েক সপ্তাহ ধরে শেখ সেলিমকে পরিকল্পিতভাবে সামনের সারিতে তুলে ধরতে চাইছে। শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারে তাঁর নাম উঠে আসাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না দলের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশ।
সূত্রের দাবি, বিষয়টি নিয়ে দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন। তাঁদের প্রশ্ন, আওয়ামী লীগ যখন তার ইতিহাসের অন্যতম কঠিন রাজনৈতিক সময় পার করছে, তখন সাংগঠনিক বৈঠক বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ছাড়াই একজন নেতাকে কেন ভবিষ্যৎ সভাপতি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হচ্ছে?
এখানেই আসল ফারাক।
শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন এবং শেখ হাসিনার পরে দলের স্থায়ী সভাপতি হওয়া—দুটি এক বিষয় নয়। অথচ একটি মহল সচেতনভাবে এই দুই বিষয়কে মিলিয়ে দিচ্ছে বলেই ক্ষুব্ধ নেতাদের অভিযোগ।
দ্রুত মুখ খুলতে পারেন শেখ হাসিনা
প্রথম কলকাতার দায়িত্বশীল সূত্রগুলি জানিয়েছে, শেখ সেলিমকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের খবর শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছেছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি খুব দ্রুত মুখ খুলতে পারেন।
সূত্রের আরও দাবি, শিগগিরই নতুন একটি সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেবেন। শেখ সেলিমকে দলের স্থায়ী উত্তরসূরি ঘোষণা করা হয়নি—এই বিষয়টি স্পষ্ট করে তিনি বিতর্কের আগুনে জল ঢালার চেষ্টা করবেন।
সেই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হওয়ার আগে পর্যন্ত এটি প্রথম কলকাতার দায়িত্বশীল সূত্রের দেওয়া খবর। তবে দলের ভিতরের অসন্তোষ যে শেখ হাসিনাকে দ্রুত অবস্থান স্পষ্ট করার চাপে ফেলেছে, নিউ টাউনের বৈঠকের পরে তা আরও পরিষ্কার।
এখন প্রশ্ন শুধু শেখ সেলিম সভাপতি হবেন কি না, সেটি নয়।
বড় প্রশ্ন হল, তাঁকে সামনে আনছে কারা? একটি সাক্ষাৎকারের বক্তব্যকে কেন শেখ হাসিনার উত্তরাধিকার পরিকল্পনা হিসেবে দেখানো হচ্ছে? বইয়ের প্রচারের সঙ্গে নেতৃত্বের প্রচারের কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি? আর কলকাতায় দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা যখন প্রকাশ্যেই ক্ষোভ জানাচ্ছেন, তখন আওয়ামী লীগের ভিতরের বিভাজন ঠিক কতটা গভীরে পৌঁছেছে?
শেখ হাসিনার নতুন বক্তব্য হয়তো আপাতত বিতর্ক কিছুটা থামাতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে যে লড়াই প্রকাশ্যে এসে গিয়েছে, শুধু একটি ব্যাখ্যায় তার স্থায়ী সমাধান হবে কি না—সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
তথ্য যাচাইয়ের শেষ সময়: ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ভারতীয় সময় রাত ১১টা ৫৫ মিনিট।
#sheikhhasinaawamileagueleadership #sheikhhasina #awamileague #bangladeshpolitics #awamileagueleadership #sheikhfazlulkarimselim #bangladeshpoliticsnews #awamileagueinternalconflict #awamileaguemeeting #sheikhhasinanews #bangladeshnews













