Shirshendu Mukhopadhyay Interview: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একান্ত সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তাঁর জন্মভূমি, শৈশবের স্মৃতি এবং বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের নানা কথা। প্রথম কলকাতার সম্পাদক সুব্রত আচার্য কে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে সাহিত্যিকের ব্যক্তিগত জীবন, স্মৃতির টান এবং দুই বাংলার সাংস্কৃতিক যোগসূত্রের কথাও বিশেষভাবে জানা যায়।
বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধু একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নয়। ময়মনসিংহের মাটিতে জন্ম, ব্রহ্মপুত্রের সামনে শৈশব, কালীবাড়ি লেনের বাড়ি, বড় বড় নৌকা, পাটের চাষ আর পাট পচানোর সেই দৃশ্য—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে স্মৃতি ও শিকড়ের ভিতর দিয়ে। তাই ভারত ও বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্কের টানাপোড়েন তাঁর কাছে কেবল দুই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সমীকরণ নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু পুরনো এক আবেগের জায়গা।
প্রথম কলকাতার সম্পাদক সুব্রত আচার্যকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বাংলা সাহিত্যের এই প্রবীণ কথাসাহিত্যিক কথা বলেছেন তাঁর জন্মভূমি ময়মনসিংহের স্মৃতি থেকে শুরু করে প্রয়াত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, সাহিত্যজীবনের আড্ডা, বর্তমান প্রজন্মের মোবাইল-আসক্তি এবং ভারত–বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে নিজের ভাবনার কথা। তাঁর কথায় এসেছে একটি গভীর আক্ষেপ—যে দুই দেশকে তিনি আরও কাছাকাছি দেখতে চেয়েছিলেন, সেই দুই দেশের মধ্যে আজ কেন শত্রুতার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, তা তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তাঁর কথায়, দুই দেশের মানুষের সম্পর্ক আরও অবাধ ও সহজ হওয়াই ছিল তাঁর প্রত্যাশা।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ময়মনসিংহে। তাঁর কথায়, বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সবচেয়ে গভীর জায়গাটি তৈরি হয়েছে শৈশবের স্মৃতিতে। তিনি মনে করেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ তার শৈশব ও কৈশোরের জায়গাগুলিতে বারবার মনে মনে ফিরে যায়। বাস্তবে সেই জায়গায় ফিরে যাওয়া সবসময় সম্ভব হয় না, আর ফিরে গেলেও হয়তো আগের মতো অনুভূতি তৈরি নাও হতে পারে। কিন্তু স্মৃতির ভিতর সেই ফিরে যাওয়া থামে না।
ময়মনসিংহের বাড়ির কথা বলতে গিয়ে তাঁর স্মৃতিতে ভেসে ওঠে মাটির ভিতের বাড়ি, টিনের ঘর এবং তার সামনে থাকা ব্রহ্মপুত্র। কালীবাড়ি লেনে তাঁদের বাড়ির সামনে ছিল নদী। বড় বড় নৌকা যেত, পাটের চাষ হতো, পাট পচানো হতো—এই সমস্ত দৃশ্য তাঁর শৈশবের বাংলাদেশের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
তাঁর কাছে সেই সময়ের জীবন ছিল অনেক বেশি সরল। তখন হাতে হাতে মোবাইল ছিল না, ছিল না টেলিভিশন বা নানা ধরনের আধুনিক যন্ত্র। ছুটি পেলে ঘোরাঘুরি, সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানো, ঘোড়ায় চড়া—এই সাধারণ আনন্দগুলিই ছিল জীবনের অংশ। তাই সেই সময়ের কথা মনে পড়লে তাঁর ভালো লাগে। আবার একইসঙ্গে তিনি জানেন, সেই সময়ে আজকের মতো এত সুযোগ-সুবিধাও ছিল না। ফলে শৈশবকে মনে পড়ার মধ্যে যেমন টান রয়েছে, তেমনই বর্তমান জীবনের সুবিধাগুলির বাস্তবতাও তিনি অস্বীকার করেন না।
ময়মনসিংহে পরে ফিরে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তখন সেই পুরনো বাড়িটিকে আর খুঁজে পাননি। শহরটি অনেকটাই বদলে গিয়েছে। তবু স্মৃতির ভিতরে ময়মনসিংহ রয়ে গিয়েছে সেই পুরনো ছবিতেই—নদী, নৌকা, পাট, বাড়ি আর কৈশোরের দিনগুলির সঙ্গে মিশে।
বাংলাদেশের প্রতি তাঁর টান তাই কোনও সাময়িক আবেগ নয়। তাঁর নিজের কথায়, রাষ্ট্র মানুষের নিত্যসঙ্গী হলেও পরিণত বয়সে মানুষ তার গ্রাম, শহর ও পুরনো দিনের স্মৃতির কাছে ফিরে যায়। সেই ফিরে যাওয়া বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি মনের ভিতরের।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে সম্পর্ক: বাঙাল পরিচয়ের চেয়ে লেখক হিসেবে বন্ধুত্ব (Shirshendu Mukhopadhyay Interview)
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়—দুজনেই বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ নাম। দুজনের জন্মই বাংলাদেশের মাটিতে। সাক্ষাৎকারে যখন তাঁদের মধ্যে ‘বাঙাল’ হিসেবে কোনও বিশেষ টানের কথা জানতে চাওয়া হয়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় জানান, তাঁদের সম্পর্কটা শুধু বাঙাল পরিচয়ের ভিত্তিতে তৈরি হয়নি।
তাঁর কথায়, সুনীলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল লেখক হিসেবে। একইভাবে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও তাঁর বন্ধুত্ব ছিল, যদিও শক্তির জন্ম দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায়। অর্থাৎ তাঁদের বন্ধুত্বকে কোনও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখেননি তিনি। সাহিত্য ও ব্যক্তিগত সম্পর্কই ছিল মূল জায়গা।
সুনীলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের আরেকটি বিশেষ দিক ছিল—তাঁরা একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতেন না। একই সময়ে পাশাপাশি লিখেছেন, একই সাহিত্যজগতে কাজ করেছেন, কিন্তু একজনের ভালো লেখা মানেই অন্যজনের জন্য কোনও প্রতিযোগিতা—এমন মানসিকতা তাঁদের মধ্যে ছিল না।
বরং কোনও লেখা ভালো লাগলে একজন আরেকজনের প্রশংসা করতেন। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কথায়, তাঁদের মধ্যে ছিল ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্মানের সম্পর্ক। আজকের মতো একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা বা ঈর্ষার মানসিকতা তাঁদের সময়ে ছিল না বলেই তিনি মনে করেন।
সুনীলের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সহকর্মীজীবনের কথাও উঠে এসেছে সাক্ষাৎকারে। আনন্দবাজার পত্রিকায় তাঁরা পাশাপাশি বসতেন। বিশেষ করে বিকেলের দিকে অফিস প্রায় ফাঁকা হয়ে গেলে দুজনের মধ্যে অনেক কথা হতো। সেই আলোচনার বিষয় শুধু সাহিত্য ছিল না। আধ্যাত্মিকতা, সিনেমা, ক্রিকেটসহ নানা প্রসঙ্গ নিয়ে তাঁদের কথা হতো।
সুনীল তাঁর বিভিন্ন ছদ্মনাম—নীললোহিত, সনাতন পাঠক ইত্যাদি—নিয়ে লিখতেন। সেই লেখার পেছনের আলাদা মানসিকতা নিয়ে শীর্ষেন্দুর সঙ্গে কথাও হয়েছে। ‘প্রথম আলো’-র নাম ঠিক করার সময়ও সুনীল তাঁর সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন বলে তিনি জানান। তাঁর স্মৃতিতে এই সম্পর্ক তাই শুধু দুই সাহিত্যিকের পরিচয় নয়; দীর্ঘদিনের সহকর্মী, বন্ধু এবং পরস্পরের লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল দুই মানুষের সম্পর্ক।
মানুষ হিসেবে সুনীল কেমন ছিলেন? (Shirshendu Mukhopadhyay Interview)
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্যিক পরিচিতি নিয়ে যত কথা হয়, মানুষ সুনীলের চরিত্রের একটি দিক শীর্ষেন্দুর কথায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তাঁর মতে, সুনীলের মধ্যে এমন এক আকর্ষণ ছিল, যা মানুষকে সহজেই তাঁর কাছে টেনে আনত।
তিনি বলেন, সুনীলের মধ্যে ঈর্ষাপরায়ণতা ছিল না, অহংকার ছিল না। তিনি মানুষকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করতেন। কারও সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলা বা কাউকে ধমক দেওয়ার স্বভাব তাঁর ছিল না। বরং কারও সঙ্গে পরিচয় হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই মানুষটি সুনীলকে ভালোবেসে ফেলতেন—এমনটাই তাঁর অভিজ্ঞতা।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মতে, এই গুণ অর্জন করার বিষয় নয়। মানুষ কিছু গুণ নিয়ে জন্মায়। সুনীলের মধ্যে সেই বিরল গুণটি ছিল।
সুনীলের জন্মদিনের স্মৃতিও এসেছে কথায়। জীবিত অবস্থায় তাঁর জন্মদিন প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালিত হতো। রবীন্দ্রসদন বা অন্য কোনও হলে সেই অনুষ্ঠান হতো এবং শীর্ষেন্দুও একাধিকবার সেখানে আমন্ত্রিত হয়েছেন। সেখানে সুনীলকে নিয়ে কথা বলেছেন, তাঁর জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
তাঁর কথায়, শেষের দিকে সুনীলের শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছিল। জীবনযাপনের অনিয়মও তার একটি কারণ ছিল বলে তিনি মনে করেন। সুনীলের মৃত্যু বাংলা সাহিত্যের জন্য বড় ক্ষতি—এ বিষয়ে তাঁর কোনও দ্বিধা নেই। বন্ধু হিসেবে ব্যক্তিগত ক্ষতি তো হয়েছেই, পাশাপাশি সাহিত্যও হারিয়েছে একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখককে।
শীর্ষেন্দুর কাছে সুনীল তাই শুধু সমসাময়িক একজন সাহিত্যিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন একজন বন্ধু, যাঁর সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং আড্ডা, আলোচনা, পারস্পরিক সম্মান এবং ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
বাংলাদেশে শেষ কবে গিয়েছেন? (Shirshendu Mukhopadhyay Interview)
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের কথা উঠতেই শীর্ষেন্দু জানান, প্রায় দশ বছর আগে তিনি শেষবার বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। বিশ্ব সাহিত্য উৎসবে যোগ দিতে গিয়েছিলেন সেখানে। তার পরে আর যাওয়া হয়নি।
বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগও নেই। মাঝে মাঝে বাংলাদেশ থেকে কোনও পাঠক কলকাতায় এলে দেখা করে যান। অতীতে প্রকাশকরাও আসতেন, কিন্তু এখন সেই যোগাযোগও আর আগের মতো নেই।
বাংলাদেশে আবার যাওয়ার কোনও পরিকল্পনা আছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরে তাঁর ব্যক্তিগত বাস্তবতার কথাও উঠে আসে। তাঁর বয়স এখন একানব্বই চলছে। শরীর আগের মতো ভালো নেই। ছেলে-মেয়েরাও তাঁকে এখন আর সহজে কোথাও যেতে দিতে চান না। তার সঙ্গে তাঁর খাদ্যাভ্যাসের বিষয়টিও রয়েছে। তিনি নিরামিষভোজী হওয়ায় বাইরে গিয়ে নানা অসুবিধা হয় বলেও জানান।
ফলে ময়মনসিংহে তাঁর স্মৃতি যত গভীরই হোক, বাস্তবে বাংলাদেশে আবার যাওয়ার পরিকল্পনা এখন তাঁর নেই। কিন্তু যাওয়া না গেলেও সেই বাংলাদেশ তাঁর স্মৃতির মধ্যে রয়েছে। ময়মনসিংহের বাড়ি, ব্রহ্মপুত্র, শৈশবের দিন, নদীর সামনে দাঁড়িয়ে দেখা নৌকা—সবই তাঁর মনে ফিরে আসে।
এই জায়গাটিই তাঁর কাছে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের মূল। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির বাইরে, একটি মানুষের শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জন্মভূমির স্মৃতি।
মোবাইল থেকে শিশুদের দূরে রাখা নিয়ে দায়িত্ব কার? (Shirshendu Mukhopadhyay Interview)
সাক্ষাৎকারের অন্য একটি অংশে বর্তমান প্রজন্মের মোবাইল ব্যবহারের প্রসঙ্গও উঠে আসে। তিনি বলেন, ছোটদের হাতে মোবাইল তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের দায়িত্ব রয়েছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক সময় শিশুকে শান্ত রাখার জন্য বা চুপ করিয়ে রাখার জন্য বাবা-মা নিজেরাই মোবাইল হাতে তুলে দেন। শিশুরা তখন খেলায় মগ্ন হয়ে পড়ে। এর ফলে ধীরে ধীরে মোবাইলের প্রতি আসক্তি তৈরি হতে পারে।
নিজের নাতনির উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, তার বয়স তেরো বছর এবং তাকে মোবাইল দেওয়া হয় না। একবার মোবাইল ব্যবহার করায় তার মা-বাবা তাকে শাসন করেছিলেন। তাঁর মতে, সন্তানকে মোবাইলের আসক্তি থেকে দূরে রাখার ক্ষেত্রে বাবা-মাকেই সংযত এবং কঠোর হতে হবে।
শুধু শিশুকে দোষ দিয়ে লাভ নেই—এই কথাটিই তিনি স্পষ্ট করে বলেন। কারণ মোবাইল শিশুর হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক সময় বড়রাই নেন। তাঁর মতে, শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষের মধ্যেই মোবাইল ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। তাই এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শাসন ও সচেতনতা দুটোই দরকার।
তবে তিনি সব তরুণকে একভাবে দেখতেও চান না। তাঁর বক্তব্যে এসেছে, বর্তমান প্রজন্মের অনেকে পড়াশোনা ও কর্মজীবন নিয়ে ব্যস্ত এবং সবাইকে একইভাবে মোবাইল-আসক্ত বলে দেখা ঠিক নয়। কিন্তু ছোটদের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলেই তিনি মনে করেন।
ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে শীর্ষেন্দুর আক্ষেপ: ‘বন্ধু দেশ থেকে শত্রু দেশ হয়ে যাচ্ছি’
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলির একটি ছিল ভারত–বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্ক। দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে শীর্ষেন্দুর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর ব্যক্তিগত আক্ষেপ।
তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ভারত ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ছে বলে যে আলোচনা চলছে, সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ কোথায়। উত্তরে তিনি বলেন, তিনি ঠিক জানেন না। কিন্তু নিজের একটি পুরনো প্রত্যাশার কথা জানান।
তাঁর ইচ্ছা ছিল, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মতো ভারত ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যেও যাতায়াত আরও সহজ হবে। পাসপোর্ট বা ভিসার জটিলতা থাকবে না, মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে সহজে যেতে পারবে—এমন একটি সম্পর্কের কথা তিনি ভেবেছিলেন।
কিন্তু তাঁর সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং তিনি মনে করছেন, দুই দেশের মধ্যে এখন একটি শত্রুতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আর এই পরিস্থিতিই তাঁর কাছে সবচেয়ে দুঃখজনক।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘আমরা বন্ধু দেশ না হয়ে শত্রু দেশ হয়ে যাচ্ছি, এটা আমার পক্ষে একটা দুঃখজনক ব্যাপার। এটাকে আমি মানতে পারি না।’
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিভাজন ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রসঙ্গও তাঁর বক্তব্যে এসেছে। তিনি এই ধরনের রাজনীতিকে পছন্দ করেন না বলে জানান। তাঁর কাছে দুই দেশের মানুষের সম্পর্ক আরও সহজ, স্বাভাবিক এবং ঘনিষ্ঠ হওয়া উচিত ছিল।
তাঁর বক্তব্যে কোনও রাজনৈতিক সমীকরণের ব্যাখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মানুষের সম্পর্ক। কারণ তাঁর কাছে বাংলাদেশ মানে শুধু একটি রাষ্ট্র নয়। সেটি তাঁর জন্মভূমি, শৈশব এবং স্মৃতির দেশ। তাই সেই দেশের সঙ্গে ভারতের দূরত্ব তৈরি হওয়ার বিষয়টি তিনি একজন সাহিত্যিক এবং একজন মানুষের জায়গা থেকেই দেখছেন।
সুনীল বেঁচে থাকলে কীভাবে দেখতেন এই সম্পর্ক? (Shirshendu Mukhopadhyay Interview)
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলাদেশ নিয়ে দীর্ঘদিন লিখেছেন এবং বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল—এই প্রসঙ্গ সামনে রেখে শীর্ষেন্দুকে প্রশ্ন করা হয়, সুনীল আজ বেঁচে থাকলে বর্তমান পরিস্থিতিতে কষ্ট পেতেন কি না।
উত্তরে তিনি জানান, বাংলাদেশ চাইলে ভারতীয় সাহিত্যিকদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করা সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নটি এখন আগের মতো সহজ নয়। ভারতীয় সাহিত্যিকদের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা থাকলেও সেই ইচ্ছা পূরণ করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।
তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, চাওয়া শুধু এক পক্ষের থাকলে হবে না। দুই দেশের সম্পর্ক ভালো করার জন্য দুই পক্ষেরই উদ্যোগ দরকার। শেষ পর্যন্ত তিনি চান, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও ভালো এবং আরও মজবুত হোক।
এই কথার মধ্যেই তাঁর বক্তব্যের মূল সুরটি স্পষ্ট হয়ে যায়। ময়মনসিংহে জন্ম নেওয়া একজন সাহিত্যিকের কাছে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক কোনও দূরের রাজনৈতিক বিষয় নয়। তাঁর শৈশবের নদী, বাড়ি, নৌকা, পাটের গন্ধ, কৈশোরের স্মৃতি এবং দীর্ঘ জীবনের সাহিত্যিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সেই দেশ জড়িয়ে আছে।
তাই দুই দেশের মধ্যে যখন দূরত্বের কথা ওঠে, তাঁর কণ্ঠে আসে আক্ষেপ। তিনি যে সম্পর্কের কথা ভেবেছিলেন, সেখানে সীমান্ত থাকতে পারে, রাষ্ট্র আলাদা থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের যাতায়াত, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ভালোবাসার পথে যেন এতটা দূরত্ব না থাকে—এই প্রত্যাশাই তাঁর কথার ভিতরে বারবার ফিরে এসেছে।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কথায় শেষ পর্যন্ত একটি সরল আকাঙ্ক্ষাই থেকে যায়—দুই দেশের সম্পর্ক আরও ভালো হোক, আরও মজবুত হোক। তাঁর কাছে সেই সম্পর্কের ভিত্তি রাজনীতির চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে মানুষের সম্পর্ক, ভাষা, সাহিত্য, স্মৃতি এবং দুই বাংলার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যোগাযোগ।
বিস্তারিত জানতে অবশ্যই দেখুন প্রথম কলকাতা (PROTHOM KOLKATA) youtube চ্যানেল
#shirshendukumhopadhyayinterview #shirshendukumukhopadhyay #bengaliliterature #banglaliterature #bengaliauthor #bengaliwriter #bangladesh #westbengal #bengaliculture #literatureinterview #authorinterview #twobengals #banglasahitya













