Taslima Nasrin Bangladesh Remarks: কলকাতায় দীর্ঘ উনিশ বছর পর ফিরে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করলেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন। জয় গোস্বামীকে ঘিরে বিতর্ক বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রসঙ্গের পাশাপাশি তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নারীর অধিকার, মৌলবাদের উত্থান, মাদ্রাসা শিক্ষা, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতার, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
তসলিমা নাসরিন বলেন, “রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদা হতে পারে। কিন্তু সেই কারণে কারও মুখ বন্ধ করে দেওয়া যায় না। প্রত্যেক মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত।” তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমতকে সম্মান করাই প্রকৃত উদারতার পরিচয়।
নারীর অধিকার নিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে সব নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত হওয়া জরুরি। ধর্মভেদে আলাদা আইন নয়, আইনের চোখে সবাই সমান মর্যাদা পাক।” তাঁর বক্তব্য, নারীর সম্পত্তির অধিকার ও আইনি সমতা নিশ্চিত না হলে প্রকৃত সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে তসলিমা বলেন, “কিছু কিছু মাদ্রাসা জিহাদ তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে।” তিনি আরও দাবি করেন, “অনেক মাদ্রাসায় শিশুদের উপর নির্যাতন, এমনকি যৌন নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। এই ধরনের প্রতিষ্ঠান সমাজের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।” তাঁর মতে, এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ও ভারতের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কী হবে, সেটা দুই দেশের রাজনীতিবিদরাই ভালো বলতে পারবেন।” তবে একইসঙ্গে তাঁর আশা, “আমি চাই বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক সবসময় বন্ধুত্বপূর্ণ থাকুক।”
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যে অবদান রেখেছে, তা আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি, তারা কখনও অস্বীকার করি না।” তাঁর দাবি, বাংলাদেশের অধিকাংশ যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল মানুষও ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের পক্ষেই রয়েছেন।
বাংলাদেশে মৌলবাদের প্রসঙ্গে তসলিমা বলেন, “বাংলাদেশে কিছু পাকিস্তানপন্থী জিহাদি গোষ্ঠী আছে, যারা ভারতের বিরুদ্ধে প্রচার চালায়। কিন্তু তারা বাংলাদেশের সব মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে না।” তাঁর মতে, যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল মানুষেরা এখনও দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই চান।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে অকারণে বন্দি করে রাখা হয়েছে। তাঁর মুক্তির দাবিতে আমরা প্রতিবাদ করছি।” তিনি আরও জানান, “বাংলাদেশের মুক্তচিন্তার মানুষ যেমন প্রতিবাদ করছেন, তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রগতিশীল বাংলাদেশিরাও তাঁর মুক্তির দাবি তুলেছেন।”
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তসলিমা বলেন, “অনেকেই ঝুঁকি নিয়েও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। কেউ জেলে যাচ্ছেন, কেউ দেশ ছেড়ে বাইরে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। তবুও প্রতিবাদ থামেনি।”
মৌলবাদের উত্থান নিয়ে তিনি বলেন, “আগে কখনও মৌলবাদী শক্তিকে এত বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখা যায়নি। এখন তাদের উত্থান উদ্বেগের বিষয়।” তাঁর মতে, “যারা নারীর অধিকার বা সংখ্যালঘুদের অধিকার মানে না, তাদের শক্তিশালী হওয়া দেশের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।”
মুক্তচিন্তার মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তসলিমা। তাঁর কথায়, “আজ বহু মুক্তচিন্তার মানুষ বাংলাদেশ ছেড়ে নেপাল, ভারত, ইউরোপ বা আমেরিকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন। দেশে নিরাপদ পরিবেশ নেই বলেই তারা বাইরে চলে যাচ্ছেন।”
সরকারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, “সরকার ধর্মকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইছে। এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।” তাঁর মতে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্ম নয়, নাগরিকের অধিকার, স্বাধীনতা ও আইনের শাসনই হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি।
তসলিমা নাসরিনের এই বক্তব্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নারীর সমান অধিকার, মৌলবাদের বিরোধিতা, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির দাবি এবং ভারত-বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বজায় রাখার আহ্বান বিশেষভাবে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও মুক্তচিন্তার মানুষ এখনও গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধের পক্ষেই সোচ্চার রয়েছেন।
#TaslimaNasrin #Bangladesh #FreedomOfExpression #IndiaBangladesh #Women’sRights #Secularism #ChinmoyKrishnaDas #BangladeshPolitics
