Tarique Rahman UNGA Speech: জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাত, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, নিরস্ত্রীকরণ, ফিলিস্তিন, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নারী ও তরুণদের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বক্তব্য রাখেন।
যুদ্ধ, সংঘাত ও বিশ্বশান্তি
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানবসৃষ্ট সংঘাতের কারণে অশান্তি ও মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে বলে বক্তব্যে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তাঁর কথায়, যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন এবং বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে পড়ছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।
“যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।”
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত।
নিরস্ত্রীকরণের প্রসঙ্গে তিনি জানান, বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ফিলিস্তিন নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান
ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়েও বক্তব্য রাখেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের উদ্বেগ রয়েছে।
“আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারসহ তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ পুনরায় তার অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে।”
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কড়া বার্তা
রোহিঙ্গা সংকট ছিল বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘ নয় বছরের বেশি সময় ধরে মায়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এর ফলে বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মায়ানমারে এবং তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত।
“বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের মাতৃভূমি মায়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়াই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান।”
রোহিঙ্গা সংকটের চূড়ান্ত সমাধানের জন্য জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় এবং কার্যকর সমর্থন প্রত্যাশা করেন তিনি। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে অদূর ভবিষ্যতে এটি একটি মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশের উদ্যোগ
জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলার বিষয়টিও গুরুত্ব পায় তাঁর বক্তব্যে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণে তেমন ভূমিকা না রাখলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বহন করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে আরও জোরালো পদক্ষেপের প্রত্যাশা জানানো হয়।
বাংলাদেশে পরিবেশ সুরক্ষায় নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি শুরু হয়েছে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও সৌরশক্তির ব্যবহারের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বন্যার সমস্যা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন তিনি।
সুন্দরবনে জলসরবরাহ ও প্রবাহ বৃদ্ধি, বৃহৎ জলাশয়ের মাধ্যমে জল সংরক্ষণ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজের কথাও তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য রাখেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।
তিনি বলেন, জনগণই সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গে তিনি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে দীর্ঘ সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পর বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
দেশ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সরকার পুনরুদ্ধার, পুনঃস্থাপন ও পুনর্গঠন—এই তিনটি কৌশল অনুসরণ করছে বলেও জানান তিনি।
অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও তরুণদের নিয়ে পরিকল্পনা
বাংলাদেশের সামনে নতুন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার উদ্যোগের কথা জানান তিনি।
ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন তিনি। দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরির কথাও উল্লেখ করেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে নতুন উদ্যোগের জন্য ৫ কোটি ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
নারী, পরিবার ও সামাজিক সুরক্ষা
দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী উল্লেখ করে নারী শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তা তৈরিকে সরকারের অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন তারেক রহমান।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারীদের জন্য আর্থিক সহায়তার সুযোগ সম্প্রসারণের কথাও জানান তিনি।
অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথাও বক্তব্যে তুলে ধরেন। প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে দেওয়া পারিবারিক কার্ডকে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলা
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তারেক রহমান।
শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ এবং আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশ ব্যয় করার পরিকল্পনার কথা বলেন তিনি।
প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাগ, পোশাক এবং বিনামূল্যে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরেন।
খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিক্ষা কার্যক্রমে খেলাধুলাকে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানান। সারাদেশে আয়োজিত একটি ফুটবল প্রতিযোগিতায় ২০ লক্ষের বেশি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে আগামীর বিশ্বের ভবিষ্যৎ হিসেবে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশের কথা বলেন তিনি।
বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতাকে নতুন সম্ভাবনা হিসেবে তুলে ধরে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
তিনি বলেন, প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় কোনো দেশ যেন পিছিয়ে না থাকে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকাশের সুফল ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বার্তা
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তারেক রহমান।
“রাষ্ট্রের নাগরিকদেরকে ক্ষমতাহীন রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না।”
তিনি এমন একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, কল্যাণমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেন, যেখানে দল-মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারবেন।
তাঁর বক্তব্যে তরুণদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন, নারীদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা এবং শিশুদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ তৈরির কথাও উঠে আসে।