লিখেছেন
সুব্রত আচার্য
সম্পাদক, প্রথম কলকাতা
Tarique Rahman Dinesh Trivedi Meeting: ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের দরজা বন্ধ করলেন না বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আবার ব্রিকস আউটরিচে যোগ দিতে নয়াদিল্লি যাওয়ার আমন্ত্রণেও এখনই সম্মতি দিলেন না। বরং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার অভিযুক্তদের বাংলাদেশে ফেরানোর প্রশ্নটি ভারতের সামনে তুলল ঢাকা।
ফলে কূটনৈতিক বল এখন অনেকটাই দিল্লির কোর্টে।
ভারত কি বাংলাদেশের এই দুই দাবির ক্ষেত্রে কোনও দৃশ্যমান পদক্ষেপ করবে? নাকি অমীমাংসিত বিষয়গুলি পাশে রেখেই তারেক রহমানকে নয়াদিল্লিতে এনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে আলোচনার পথ তৈরি করবে?
এই প্রশ্নের উত্তরেই ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায়ের দিকনির্দেশ লুকিয়ে রয়েছে।
বৈঠকে কী হল?
১০ অগাস্ট ঢাকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
বৈঠকের পরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে জানানো হয়, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া দ্রুত করার বিষয়টি ভারতের সামনে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলায় অভিযুক্তদের বাংলাদেশে ফেরাতেও ভারতের সহযোগিতা চেয়েছে ঢাকা।
ওই মামলার প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তাঁর সহযোগী আলমগীর হোসেনকে গত মার্চে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ থেকে গ্রেফতার করেছিল রাজ্য পুলিশের এসটিএফ। তাঁদের বিরুদ্ধে হাদি হত্যায় যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখা যাবে না।
তারেক রহমান বৈঠকে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একটি ‘উপযুক্ত পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
এই দুটি শব্দই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—‘উপযুক্ত পরিবেশ’।
আমন্ত্রণ আছে, সম্মতির ঘোষণা নেই
ভারত আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তাঁকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে—এ কথা ঢাকার পক্ষ থেকেও স্পষ্ট করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, আমন্ত্রণটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কিন্তু দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকের পরেও তারেক রহমান নয়াদিল্লি যাচ্ছেন—এমন কোনও ঘোষণা ঢাকা করেনি।
তার অর্থ এই নয় যে সফর বাতিল হয়ে গিয়েছে। সম্মেলনের আগে এখনও সময় রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার বাংলাদেশের সরকারের।
তবে বৈঠকে শেখ হাসিনা ও হাদি হত্যা মামলার অভিযুক্তদের প্রসঙ্গ ওঠা এবং একই সঙ্গে ভারত সফরের বিষয়ে সম্মতির ঘোষণা না আসা—দুটি ঘটনাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বলেও দেখা কঠিন।
শেখ হাসিনাকে নিয়ে দিল্লির দ্বিধা
সম্প্রতি নয়াদিল্লির একটি অনুষ্ঠান থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার কথাও বলেছেন।
ভারতের বক্তব্য, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি সংস্থা আয়োজন করেছিল। ভারত সরকার এর সঙ্গে যুক্ত ছিল না। শেখ হাসিনার বক্তব্যও দিল্লির সরকারি অবস্থান নয়।
কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রক সেই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়নি। ঢাকার অভিযোগ, আগেই উদ্বেগ জানানোর পরেও ভারতের মাটি ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলেও সতর্ক করেছে বাংলাদেশ।
দিল্লির সমস্যাটি এখানেই।
একদিকে শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের নির্বাচনের পরে তৈরি হওয়া নতুন সরকারের সঙ্গেও স্বাভাবিক ও কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে নয়াদিল্লি।
কিন্তু শেখ হাসিনা ভারতে থেকে নিয়মিত বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে সরব হলে তারেক রহমানের সরকারের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করা ভারতের পক্ষে কঠিন হতে পারে।
হাদি মামলাই কি আস্থার প্রথম পরীক্ষা?
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ অত্যন্ত জটিল বিষয়। দুই দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও শুধু রাজনৈতিক দাবি উঠলেই কাউকে ফেরানো যায় না। অভিযোগের প্রকৃতি, আদালতের প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় নথি এবং সম্ভাব্য সাজার মতো একাধিক বিষয় বিবেচনায় আসে।
তাই শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে দিল্লি দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
তুলনায় হাদি হত্যা মামলার অভিযুক্তদের ফেরানোর প্রশ্নটি অপেক্ষাকৃত নির্দিষ্ট। পশ্চিমবঙ্গে গ্রেফতার হওয়া দু’জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে ভারত দ্রুত আইনি ও কূটনৈতিক সহযোগিতা করলে ঢাকা সেটিকে আস্থা ফেরানোর একটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরতে পারবে।
অবশ্য এখানেও আদালত ও আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। কূটনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেও সেই প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
ভারত বাংলাদেশের অনুরোধে কত দ্রুত সাড়া দেয় এবং প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়ায় কতটা সহযোগিতা করে—এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
নেপথ্যে তারেক রহমানের রাজনৈতিক হিসাব
তারেক রহমানের জন্যও বিষয়টি সহজ নয়।
ভারতের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে তিনি নয়াদিল্লি গেলে সেটি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে। নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে আলাদা বৈঠক হলে সফরটির রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়বে। তবে এমন কোনও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এখনও নিশ্চিত হয়নি।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ কিংবা হাদি মামলার অভিযুক্তদের ফেরানোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়াই তিনি ভারত সফরে গেলে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি প্রশ্ন তুলতে পারে—দিল্লির কাছ থেকে ঢাকা কী পেল?
এই তথ্যগুলি একসঙ্গে রাখলে আমার বিশ্লেষণ হচ্ছে, তারেক রহমান ভারতকে প্রত্যাখ্যান করছেন না। তবে সফরের আগে বাংলাদেশের উদ্বেগগুলিকে দিল্লি গুরুত্ব দিচ্ছে—এমন অন্তত একটি ইতিবাচক বার্তা তিনি চাইতে পারেন।
‘উপযুক্ত পরিবেশ’ তৈরির দায়িত্ব কার?
তারেক রহমানের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখানেই।
তিনি বলেননি, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এগোবে না। আবার কোনও শর্ত ছাড়াই নয়াদিল্লির আমন্ত্রণ গ্রহণও করেননি। বরং সম্পর্কের অগ্রগতিকে একটি ‘উপযুক্ত পরিবেশ’-এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
ঢাকার বার্তাটি সম্ভবত এমন—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রয়োজন, আলোচনা প্রয়োজন এবং শীর্ষস্তরের বৈঠকও প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের উদ্বেগগুলিকে দিল্লি যে গুরুত্ব দিচ্ছে, তার অন্তত একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণও চাই।
সেটি হাদি মামলার অভিযুক্তদের ফেরানোর প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হতে পারে। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতার ক্ষেত্রে স্পষ্ট সীমারেখা হতে পারে। অথবা প্রত্যর্পণের অনুরোধ নিয়ে ভারতের একটি আনুষ্ঠানিক ও যুক্তিসংগত জবাব হতে পারে।
দিল্লির সামনে তিনটি পথ
ভারতের সামনে এখন তিনটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে।
প্রথমত, হাদি মামলায় দ্রুত আইনি সহযোগিতার মাধ্যমে ঢাকাকে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া।
দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে তাড়াহুড়ো না করলেও ভারতের মাটি থেকে তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতার বিষয়ে অবস্থান আরও স্পষ্ট করা।
তৃতীয়ত, অমীমাংসিত বিষয়গুলির মধ্যেই তারেক রহমানের ভারত সফর এবং মোদী–তারেক বৈঠকের আয়োজন করে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে জট কাটানোর চেষ্টা করা।
দিল্লি সম্ভবত এই তিনটি পথেরই সমন্বয় করার চেষ্টা করবে। কারণ ভারত যেমন শেখ হাসিনাকে ঘিরে নিজের আইনি ও কৌশলগত অবস্থান হঠাৎ বদলাতে চাইবে না, তেমনই বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করাও নয়াদিল্লির স্বার্থে নয়।
তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের দরজা বন্ধ করেননি। তবে দিল্লি–ঢাকার নতুন সম্পর্ক যে পুরনো রাজনৈতিক সমীকরণে চলবে না, সেই বার্তাও তিনি দিয়ে রেখেছেন।
এখন নজর থাকবে তিনটি ঘটনায়—হাদি হত্যা মামলায় ভারতের পদক্ষেপ, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে দিল্লির অবস্থান এবং ব্রিকস আউটরিচে তারেক রহমানের যোগদান নিয়ে ঢাকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
কথার জোর নয়, তথ্যের জোরে বিশ্লেষণ। কোনও শিবিরের মন জোগানো নয়—ঘটনাপ্রবাহের পরীক্ষায় টিকে থাকা।
লেখকের সাথে যোগাযোগ: [email protected]
#TariqueRahman #DineshTrivedi #BangladeshIndiaRelations #SheikhHasina #IndiaBangladesh #BangladeshPolitics #BRICSSummit #DiplomaticMeeting #Geopolitics














