Sonam Wangchuk Hunger Strike: দীর্ঘ ২৬ দিনের অনশনের পর অবশেষে অনশন ভাঙলেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। সরকারের তরফে যন্তরমন্তরে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনও আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার আশ্বাস পাওয়ার পরই তিনি অনশন শেষ করার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানা গিয়েছে। শুক্রবার রাতে গুরুগ্রামের মেডান্তা হাসপাতালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে তাঁর অনশন ভাঙার মুহূর্ত ধরা পড়ে ক্যামেরায়। সেই সময় তাঁর পাশে ছিলেন স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমোও।
মধ্যরাতের পর একটি পোস্টে ওয়াংচুক জানান, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা, ড. জিতেন্দ্র সিং এবং লাদাখের অ্যাপেক্স বডির প্রবীণ নেতাদের উপস্থিতিতে তিনি ২৬ দিন পর অনশন ভেঙেছেন। তাঁর বক্তব্য, বিভিন্ন শর্ত নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর এবং দেশে সম্ভাব্য হিংসার আশঙ্কার কথা মাথায় রেখেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে কোন কোন শর্তে তিনি অনশন ভাঙলেন, তা বিস্তারিত একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জানাবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে তাঁর আবেদন, তাঁরা যেন সতর্ক থাকেন এবং কোনওভাবেই হিংসার পথে না যান। তাঁর কথায়, আন্দোলনের মূল লক্ষ্য যেন কোনওভাবেই হিংসাত্মক পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
সরকারের আশ্বাসেই কি শেষ হল ২৬ দিনের অনশন?
মেডান্তা হাসপাতাল থেকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে সোনম ওয়াংচুক অনশন ভাঙছেন। তাঁকে এক কাপ থেকে জল বা পানীয় পান করিয়ে অনশন শেষ করাতে দেখা যায় মন্ত্রীদের। সেই সময় ওয়াংচুক বলেন, তিনি অনশন ভাঙতে পেরে কৃতজ্ঞ ও খুশি।
সরকারের তরফে দেওয়া আশ্বাসগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল, দিল্লির যন্তরমন্তরে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে না। পাশাপাশি, ২০২৬ সালের ২০ জুলাই সংসদ ভবনের দিকে মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কোনও আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার বিষয়ে সরকার ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বলে জানানো হয়।
কেন্দ্রের তরফে আরও জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এবং দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে সংসদে আলোচনা করা হবে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক নেট ও নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা পরীক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও সরকার ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
সোনম ওয়াংচুক পরে জানান, প্রায় দুদিন ধরে দীর্ঘ আলোচনার পর তিনি সরকারের কাছ থেকে এই আশ্বাস পেয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের আশ্বাস মিলেছে—ব্যর্থ বা ত্রুটিপূর্ণ পরীক্ষা ব্যবস্থার দায়বদ্ধতা নিয়ে সংসদে আলোচনা, সাম্প্রতিক নিট প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা পড়ুয়াদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা না করার প্রতিশ্রুতি।
প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলনেই ছিলেন ওয়াংচুক
২৮ জুন থেকে অনশনে বসেছিলেন সোনম ওয়াংচুক। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার, পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দায়বদ্ধতা এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার দাবিতে তিনি এই অনশন শুরু করেছিলেন। তিনি যন্তরমন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনকারীদের সঙ্গেও অবস্থান করছিলেন।
তবে আন্দোলন চলাকালীন তাঁকে গত শনিবার প্রতিবাদস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং প্রথমে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে তাঁর চিকিৎসা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন ওয়াংচুক। তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগও তোলেন। পরে আদালতের অনুমতিতে তাঁকে মেডান্তা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
অনশনের ২৬ দিনে তাঁর ওজন অন্তত ১১ কিলোগ্রাম কমে গিয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। দীর্ঘ অনশনের ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চলার এবং দ্রুত আগের ওজন ফিরে পাওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তাঁর সুস্বাস্থ্য কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
আন্দোলনের পাশে থাকার বার্তা, তবে দাবি এখনও বহাল
সোনম ওয়াংচুক অনশন ভাঙলেও আন্দোলনের সমস্ত দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে—এমনটা নয়। ককরোচ জনতা পার্টির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি এখনও বহাল রয়েছে।
দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে ওয়াংচুকের অনশন শেষ হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তিনি ওয়াংচুকের সাহস ও আত্মত্যাগের প্রশংসা করে বলেন, নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে তিনি গোটা দেশের বিবেককে জাগিয়ে তুলেছেন। তাঁর মতে, দেশের জন্য ওয়াংচুকের জীবন অত্যন্ত মূল্যবান।
অন্যদিকে, ওয়াংচুক নিজেও আন্দোলনকারীদের হিংসা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর এই বার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ছাত্রসমাজের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সেই আবহে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের উপরেই জোর দিয়েছেন তিনি।
এর আগেও একাধিকবার অনশনে বসেছেন সোনম ওয়াংচুক
শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক এর আগেও বিভিন্ন দাবি নিয়ে একাধিকবার অনশন করেছেন। ২০২৪ সালে লাদাখের পরিবেশ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার জন্য আইনি অধিকার ও সাংবিধানিক সুরক্ষার দাবিতে তিনি দীর্ঘ অনশন করেছিলেন। সেই সময় প্রায় ১১,৫০০ ফুট উচ্চতায় তীব্র ঠান্ডার মধ্যে খোলা আকাশের নিচে ২১ দিন জল ও লবণের উপর নির্ভর করে ছিলেন তিনি।
লাদাখের জন্য রাজ্যের মর্যাদা এবং সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় বিশেষ সুরক্ষার দাবিতেও তাঁর আন্দোলন দেশজুড়ে আলোচনায় এসেছিল। গত বছর এই দাবিকে ঘিরে লাদাখে বিক্ষোভ হিংসাত্মক হয়ে ওঠার পর জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অধীনে প্রায় ছয় মাস আটক ছিলেন তিনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর কাজ এবং বিকল্প শিক্ষার দর্শনও তাঁকে জাতীয় স্তরে পরিচিতি দিয়েছে। তাঁর শিক্ষাদর্শ এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে বলিউডের জনপ্রিয় ছবি ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর ফুংসুক ওয়াংডু চরিত্রের মিল রয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। যদিও ছবির চরিত্রটি সরাসরি তাঁর জীবনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি নয়, তবুও চরিত্রটির অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস হিসেবে তাঁর নাম প্রায়ই উঠে আসে।
২৬ দিনের দীর্ঘ অনশন শেষে সোনম ওয়াংচুক আপাতত অনশন ভেঙেছেন। সরকারের আশ্বাসের পর তাঁর এই সিদ্ধান্ত আন্দোলনের ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। তবে শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষার স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা নিয়ে যে প্রশ্নগুলি তিনি তুলেছেন, সেগুলির বাস্তব সমাধান কতটা দ্রুত হয়, সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কারণ, অনশন শেষ হলেও প্রশ্নগুলি এখনও শেষ হয়নি। দেশের লক্ষ লক্ষ পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার উত্তর এখন সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপেই খুঁজছেন আন্দোলনকারীরা।
#sonamwangchuk #hungerstrike #sonamwangchukprotest #educationreforms #questionpaperleak #studentprotest #jantarMantar #ladakh #india
