Mohan Bhagwat Vishwaguru: টরন্টোয় হিন্দু বিশ্ববন্ধু সমাবেশে মোহন ভাগবতের বার্তা, শক্তিধর রাষ্ট্র হওয়ার প্রতিযোগিতার বদলে মানবসেবা, বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান, আশ্রয়দান ও জ্ঞান ভাগ করে নেওয়ার ঐতিহ্যকেই ভারতের বিশ্বগুরু হয়ে ওঠার মূল শক্তি বলে তুলে ধরলেন তিনি।
বিশ্বের দরবারে কোনও দেশের পরিচয় কি শুধু তার সামরিক শক্তি, অর্থনীতি কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব দিয়ে তৈরি হয়? নাকি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দীর্ঘ ঐতিহ্যও একটি দেশের আন্তর্জাতিক পরিচয়ের ভিত্তি হতে পারে? কানাডার টরন্টোয় এক অনুষ্ঠানে এই প্রশ্নেরই অন্যরকম উত্তর তুলে ধরলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রধান মোহন ভাগবত। তাঁর বক্তব্য, ভারত ‘মহাশক্তি’ হওয়ার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ‘বিশ্বগুরু’ হয়ে ওঠেনি; বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানো, জ্ঞান ভাগ করে নেওয়া, বিপন্ন মানুষকে আশ্রয় দেওয়া এবং বৈচিত্র্যকে সম্মান করার ঐতিহ্যের মধ্য দিয়েই ভারতের এই পরিচয় তৈরি হয়েছে।
টরন্টোয় আয়োজিত ‘হিন্দু বিশ্ব বন্ধু—বন্ধুত্বের মাধ্যমে বিশ্বকে আপন করে নেওয়া’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভাগবত ভারতের সভ্যতাগত ভাবনা, মানবিকতা, বৈচিত্র্য এবং ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর ধারণাকে সামনে আনেন। অনুষ্ঠানে কানাডার বিভিন্ন প্রদেশ থেকে দুই হাজারেরও বেশি প্রতিনিধি অংশ নেন বলে আয়োজকদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।
‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার অর্থ শক্তির প্রদর্শন নয়
মোহন ভাগবতের বক্তব্যের মূল জায়গাটি ছিল ভারতের বিশ্বপরিচয়। তাঁর দাবি, ভারত অতীতে কোনও দেশ দখল করে বা রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করে নিজের প্রভাব তৈরি করেনি। বরং জ্ঞান, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে ভারতীয় সভ্যতার প্রভাব বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই কারণেই তাঁর মতে, ভারতের ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার ধারণাকে কেবল শক্তিধর রাষ্ট্র হওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ঠিক নয়।
টরন্টোর অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ভারতকে কেউ মহাশক্তি বলতে পারেন, কিন্তু ভারতের ঐতিহাসিক পরিচয় শুধুমাত্র সেই শক্তির উপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মানুষের জন্য কাজ করা এবং নিজের সভ্যতাগত মূল্যবোধের মাধ্যমে অন্যদের উপকার করাই ভারতের দীর্ঘ ঐতিহ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে ভাগবত আসলে ‘বিশ্বগুরু’ শব্দটির একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার অর্থ অন্যের উপর কর্তৃত্ব করা নয়; বরং প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানো। অর্থাৎ ক্ষমতার জায়গা থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার বদলে মানবিক দায়িত্বের জায়গা থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার ভাবনাকেই তিনি সামনে এনেছেন।
আশ্রয় দেওয়ার ঐতিহ্য থেকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
নিজের বক্তব্যে ভারতের ইতিহাসের বিভিন্ন উদাহরণও তুলে ধরেন ভাগবত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোল্যান্ডের শরণার্থীদের জামনগরের মহারাজার আশ্রয় দেওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিপন্ন মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার ঐতিহ্য ভারতের সমাজ ও সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ।
শুধু অতীত নয়, আধুনিক সময়ের ঘটনাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সময় ভারতীয় সামরিক বিমানে শুধু ভারতীয় নাগরিকদের নয়, আরও সাতটি দেশের নাগরিকদের উদ্ধার করার উদাহরণ দেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে এই ঘটনাগুলি ভারতের আন্তর্জাতিক মানবিক ভূমিকার উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে।
ভাগবতের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ভারতে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আশ্রয় পাওয়ার ইতিহাস। তিনি মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি এবং পারসি সম্প্রদায়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, বিভিন্ন সময়ে নিপীড়নের মুখে পড়া মানুষ ভারতে আশ্রয় পেয়েছেন। তাঁর মতে, এই সহাবস্থান ও আশ্রয়ের ঐতিহ্য ভারতের সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
এখানেই তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে মানবিকতার প্রশ্নটি যুক্ত হয়ে যায়। কোনও রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি কেবল তার অর্থনৈতিক পরিসর বা সামরিক সক্ষমতার উপর নির্ভর করে না—দুর্যোগ, যুদ্ধ কিংবা বিপদের সময়ে সেই দেশ অন্যদের জন্য কী করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভাগবত তাঁর বক্তব্যে সেই দিকটিই গুরুত্ব দিয়েছেন।
বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্য, বললেন ভাগবত
টরন্টোর বক্তব্যে ভারতীয় সমাজের বৈচিত্র্য নিয়েও কথা বলেন আরএসএস প্রধান। তাঁর মতে, বহু ভাষা, বহু সম্প্রদায়, বহু বিশ্বাস ও নানা জীবনধারা ভারতীয় বাস্তবতার স্বাভাবিক অংশ। এই বৈচিত্র্যকে তিনি ঐক্যের বিরোধী হিসেবে দেখার বদলে ঐক্যেরই একটি প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
তিনি বলেন, বৈচিত্র্য প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রকাশ, আর ঐক্য তার ভিতরের বাস্তবতা। তাই ভিন্নতাকে মুছে ফেলার বদলে তাকে গ্রহণ ও সম্মান করার প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর বক্তব্যে ‘গ্রহণ’ এবং ‘সম্মান’-এর উপর বিশেষ জোর ছিল।
এই প্রসঙ্গে তিনি ‘হিন্দু’ শব্দটিরও নিজের ব্যাখ্যা দেন। তাঁর মতে, হিন্দুত্বকে কোনও নির্দিষ্ট ভাষা, উপাসনার পদ্ধতি বা জীবনযাপনের ধরন দিয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি এমন একটি ধারণার কথা বলেন যেখানে অন্যকে সম্মান করা এবং বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
এই বক্তব্য রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ আরএসএস দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় সমাজ, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে নিজেদের ব্যাখ্যা সামনে রেখে এসেছে। টরন্টোর বক্তৃতায় সেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যার সঙ্গে মানবিকতা ও বৈচিত্র্যের প্রসঙ্গকে পাশাপাশি রাখা হয়েছে।
‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর বার্তা
মোহন ভাগবতের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া ধারণাগুলির একটি ছিল ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’। অর্থাৎ, সমগ্র পৃথিবীকে একটি পরিবার হিসেবে দেখার ভাবনা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মানুষের চেহারা, ভাষা, সংস্কৃতি বা জীবনযাপনে পার্থক্য থাকলেও মানবিকতার জায়গায় মানুষের মধ্যে একটি মৌলিক ঐক্য রয়েছে।
এই ধারণার ভিত্তিতেই তিনি অন্যের সেবা করাকে দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিজের উন্নতির সঙ্গে অন্যের কল্যাণের বিষয়টিও যুক্ত থাকা উচিত। একটি দেশ যত বেশি উন্নত হবে, সেই উন্নতির সুফল যদি বৃহত্তর মানবসমাজের কাজে লাগে, তবেই সেই উন্নতির অর্থ আরও গভীর হয়।
টরন্টোর অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তুও ছিল বন্ধুত্ব, সংলাপ, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং যৌথ দায়িত্ব। কানাডার দশটি প্রদেশ থেকে দুই হাজারের বেশি সদস্যের উপস্থিতির কথা জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে কানাডিয়ান হিন্দুস ফর আউটরিচ, রিলেশনস অ্যান্ড ডায়ালগ বা CHORD; ১৭৫টিরও বেশি সংগঠন এতে সহযোগিতা করেছিল।
ফলে ভাগবতের বক্তব্য শুধু ভারতকে ‘বিশ্বগুরু’ হিসেবে তুলে ধরার দাবি নয়, প্রবাসী ভারতীয় ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক যোগাযোগের বার্তাও বহন করেছে।
#MohanBhagwat #Vishwaguru #RSS #India #Toronto #HinduVishwaBandhu #VasudhaivaKutumbakam #IndianCivilisation #ServiceToHumanity














