Jaishankar AI Global South: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিবর্তন যেন বিশ্বের মধ্যে নতুন বিভাজন তৈরি না করে, রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভার পার্শ্ববর্তী একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এমনই বার্তা দিলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। মঙ্গলবার ‘সমমনস্ক উন্নয়নশীল দেশ ও বন্ধু’ দেশগুলির উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির মধ্যে আরও সহযোগিতার ওপর জোর দেন।
হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জয়শঙ্করের বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ, এর বিকাশের গতি এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে। এই বিতর্কের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিবর্তন যাতে নতুন বৈষম্য বা বিভাজনের কারণ না হয়, সে বিষয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলির অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতার আহ্বান
বৈঠকে জয়শঙ্কর ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, জলবায়ুজনিত ধাক্কা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ওপর বাড়তে থাকা চাপ মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে আরও সহযোগিতার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে সরবরাহ ব্যবস্থা, অর্থনীতি, জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তার বিষয়গুলিও উঠে আসে।
জয়শঙ্কর বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থা, অর্থ এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোনও ধরনের বাধা বা নিয়ন্ত্রণকে মেনে নেওয়া বা বৈধতা দেওয়া উচিত নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উন্নয়নের কেন্দ্রে রয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা। জ্বালানির প্রাপ্যতা এবং দাম রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা উচিত নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
খাদ্য নিরাপত্তাকেও তিনি অভিন্ন লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেন। বিশেষ করে শস্য এবং সার সরবরাহের ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা দ্রুত মোকাবিলার প্রয়োজন বলে তিনি জানান।

ন্যায্য বাণিজ্য ও শিল্পায়নের অধিকারের কথা
বৈঠকে জয়শঙ্কর ন্যায্য অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থার ওপরও জোর দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এমন বাণিজ্য ব্যবস্থা থাকা দরকার যা উন্নয়নশীল দেশগুলির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করবে এবং তাদের শুধুমাত্র ভোক্তায় পরিণত করবে না।
তিনি বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলির শিল্পায়নের অধিকার অস্বীকার করা উচিত নয়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ এবং শিল্প গড়ে তোলার অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তার বিষয়টিও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমুদ্রযাত্রী ও বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা বজায় রাখার ওপর তিনি জোর দেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে জয়শঙ্করের বার্তা
জয়শঙ্করের বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে যে পরিবর্তন আসছে, তা যেন নতুন বিভাজন তৈরি না করে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বিষয়গুলির সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতেও উন্নয়নশীল বিশ্বের অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।
এই বক্তব্য এমন সময় এসেছে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের গতি এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে বিতর্ক চলছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের গতি এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রযুক্তি জগতের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যেও মতবিরোধ রয়েছে। সেই আলোচনার মধ্যে ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যানের নামও এসেছে।
রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে নিউ ইয়র্কে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতাদের সমাবেশের সময়ই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ আরও সামনে এসেছে। উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা নিয়ে রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্ট
হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওপেনএআই ২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি প্রকাশের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বর্তমান পর্বকে নতুন মাত্রা দেওয়ার পর থেকেই এই প্রযুক্তির নিরাপদ বিকাশ নিয়ে আলোচনা চলছে। ওপেনএআই আন্তর্জাতিকভাবে সম্মত নিরাপত্তা মানদণ্ড তৈরির আহ্বান জানিয়েছে, যাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ নিরাপদভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।
এরই মধ্যে সোমবার রাষ্ট্রসংঘের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্যানেল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে ক্রমশ আরও সক্ষম হয়ে ওঠা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০টিরও বেশি দেশের নেতারা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলের বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা পরীক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। মানুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য একটি নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তৈরির সম্ভাবনার কথাও সেখানে উঠে এসেছে।
গুতেরেসের আন্তর্জাতিক চুক্তির আহ্বান, ভিন্ন অবস্থানে ট্রাম্প
রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও মঙ্গলবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, সরকার থেকে ক্ষমতা অল্প কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা এবং ব্যক্তির হাতে চলে যাওয়ার একটি বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
গুতেরেসের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পরিবর্তন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে এবং এর পূর্ণাঙ্গ পরিণতি বোঝার ক্ষমতার থেকেও প্রযুক্তির বিকাশের গতি এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ বিষয়ে সমঝোতার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি তুলে ধরেন।
অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের গতি কমানোর আহ্বানের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের গতি কমালে চিন প্রযুক্তির দৌড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
সোমবার সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় যে জিতবে, সে-ই জিতবে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, বর্তমানে চিন এবং অন্যান্য দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে রয়েছে এবং সেই অবস্থান ধরে রাখার জন্য তিনি কাজ চালিয়ে যাবেন।
জয়শঙ্করের বক্তব্যে অবশ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের সঙ্গে উন্নয়নশীল বিশ্বের অংশগ্রহণ এবং নতুন বিভাজন এড়ানোর বিষয়টিকেই সামনে রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভার পার্শ্ববর্তী এই বৈঠকে তাঁর বক্তব্যের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোয় উন্নয়নশীল দেশগুলির অংশগ্রহণ নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস
#Jaishankar #AI #GlobalSouth #ArtificialIntelligence #AISafety #AIGovernance #UNGA #India #AIRegulation #GlobalAI














