Indian Seafarers Hormuz Attack: হরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, তারই একটি চাঞ্চল্যকর ছবি সামনে এসেছে। ২১ ভারতীয় নাবিককে নিয়ে একটি জাহাজ ইরানের ছোট ছোট নৌযানের ঘেরাও এবং গুলিবর্ষণের মুখে পড়েছিল বলে দাবি করেছে ভারতীয় নাবিকদের একটি সংগঠন। ঘটনাটি ঘটেছিল চলতি বছরের ২২ এপ্রিল। সম্প্রতি সেই ঘটনার ভিডিও প্রকাশ্যে এসেছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, জাহাজের ভিতরে আতঙ্কিত নাবিকেরা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটছেন এবং আক্রমণের আশঙ্কায় নিজেদের আড়াল করছেন। ঘটনাটি সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক জলপথে কর্মরত ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ভারতের বন্দর, জাহাজ চলাচল ও জলপথ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই ঘটনায় থাকা ২১ ভারতীয় নাবিকই নিরাপদে রয়েছেন।
হরমুজ প্রণালিতে ঠিক কী ঘটেছিল?
২২ এপ্রিল একটি জাহাজে মোট ২২ জন কর্মী ছিলেন, যাঁদের মধ্যে ২১ জনই ভারতীয়। সেই সময় জাহাজটি হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচল করছিল। ভারতীয় নাবিকদের সংগঠনের প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, একাধিক ছোট নৌযান জাহাজটিকে ঘিরে ফেলেছে। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠার পর জাহাজের কর্মীরা ভেতরের সরু পথ ও নিরাপদ জায়গায় গিয়ে নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করেন। সংগঠনটির দাবি, ওই নৌযানগুলির পক্ষ থেকে জাহাজের দিকে গোলাবর্ষণও করা হয়েছিল।
ভারতীয় নাবিকদের সংগঠনটির বক্তব্য, ঘটনাটি সাধারণ জলদস্যু হামলার মতো ছিল না। তাদের দাবি, জাহাজটিকে ঘিরে ফেলা ছোট নৌযানগুলির সঙ্গে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা যুক্ত ছিলেন। প্রকাশিত ভিডিওতে একটি কাঁধে বহনযোগ্য রকেটচালিত অস্ত্র ছোড়ার দৃশ্যও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঘটনাটির বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য আলাদা হতে পারে—তাই ভিডিও ও সংগঠনটির দাবিকে সেই হিসেবেই দেখা জরুরি।
আতঙ্কে জাহাজের ভিতরে আশ্রয় নিলেন নাবিকেরা
ভিডিওটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ হল জাহাজের কর্মীদের নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার দৃশ্য। বাইরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নাবিকেরা জাহাজের সরু করিডর ও ভেতরের অংশে ছুটে যান। তাঁদের লক্ষ্য ছিল সরাসরি বিপদের জায়গা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়া।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বা সংঘাতের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলির উপরেই পড়ে না, বাণিজ্যিক জাহাজ এবং সেগুলিতে কর্মরত অসংখ্য নাবিকও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যান। প্রকাশ্যে আসা এই ভিডিও সেই ঝুঁকির বাস্তব চিত্রই সামনে এনেছে।
নাবিকদের সংগঠনটির বক্তব্য, শুধু নিরাপত্তা নির্দেশিকা বা সতর্কবার্তা দিয়ে এই ধরনের পরিস্থিতিতে বেসামরিক নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলির জন্য আরও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে বলেই তারা মনে করছে।
বিশ্বের সমুদ্রপথে ভারতীয় নাবিকদের বড় ভূমিকা
এই ঘটনার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় ভারতীয় নাবিকদের আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কারণে। ২০২৬ সালের নাবিক কর্মীবাহিনী সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিপাইনের পর ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নাবিক সরবরাহকারী দেশ। বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক কর্মীবাহিনীতে ভারতীয়দের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক কর্মীবাহিনীর প্রায় ১২.১৬ শতাংশ ভারতীয়। পাশাপাশি বিশ্বের মোট জাহাজের কর্মকর্তাদের মধ্যেও ভারতীয়দের উপস্থিতি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক জলপথে কোনও সংঘাত তৈরি হলে তার প্রভাব ভারতীয় কর্মীদের উপর পড়ার সম্ভাবনাও কম নয়।
হরমুজ প্রণালির মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে এই বাস্তবতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাণিজ্যিক জাহাজগুলি সামরিক সংঘাতের অংশ না হয়েও কখনও কখনও সংঘাতের সরাসরি ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে। ২১ ভারতীয় নাবিককে ঘিরে প্রকাশিত ভিডিও সেই আশঙ্কাকেই আরও স্পষ্ট করেছে।
নিরাপত্তা নিয়ে নাবিক সংগঠনের প্রশ্ন
ঘটনার ভিডিও প্রকাশের পর ভারতীয় নাবিকদের সংগঠনটি বেসামরিক নাবিকদের সুরক্ষা নিয়ে আরও জোরালো পদক্ষেপের দাবি তুলেছে। তাদের বক্তব্য, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় শুধু নির্দেশিকা জারি করলেই নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রয়োজনে নৌবাহিনীর উপস্থিতি বা আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা মনে করছে।
সংগঠনটির মতে, বাণিজ্যিক জাহাজের কর্মীরা কোনও সামরিক সংঘাতের পক্ষ নন। তাঁদের প্রধান কাজ পণ্য পরিবহন এবং জাহাজ পরিচালনা। কিন্তু আন্তর্জাতিক জলপথে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তাঁদেরও প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনার পরিস্থিতিতে বেসামরিক জাহাজের জন্য আলাদা নিরাপত্তা কাঠামো থাকা প্রয়োজন বলে তাদের দাবি।
এই ঘটনার ক্ষেত্রে অবশ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, জাহাজে থাকা ২১ ভারতীয় নাবিক শেষ পর্যন্ত নিরাপদে রয়েছেন। ভারতের বন্দর, জাহাজ চলাচল ও জলপথ মন্ত্রকের পক্ষ থেকেও তাঁদের নিরাপদ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই পথের গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু স্থানীয় পরিস্থিতিই নয়, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং সমুদ্রপথে কর্মরত নাবিকদের নিরাপত্তাও প্রভাবিত হতে পারে।
বর্তমানে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতকে ঘিরে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যেই ২১ ভারতীয় নাবিককে নিয়ে জাহাজের উপর হামলার ভিডিও সামনে আসায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে আরও একটি বাস্তবতা—যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থেকেও সাধারণ কর্মীরা সংঘাতের সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যেতে পারেন। জাহাজের কর্মীরা কোনও পক্ষের যোদ্ধা নন, অথচ তাঁদের কাজের প্রয়োজনে এমন জলপথ পেরোতে হয় যেখানে সামরিক উত্তেজনা মুহূর্তে তাঁদের জীবনকে বিপন্ন করতে পারে।
২২ এপ্রিলের ওই ঘটনার ভিডিও তাই শুধু একটি পুরনো ঘটনার দৃশ্য নয়; আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে কর্মরত ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। ২১ ভারতীয় নাবিকের নিরাপদে ফিরে আসা অবশ্যই স্বস্তির খবর। কিন্তু তাঁদের ঘিরে প্রকাশ্যে আসা সেই আতঙ্কের দৃশ্য ভবিষ্যতে সংঘাতপূর্ণ জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও মনে করিয়ে দিচ্ছে।














