Indian Media History:
উপসম্পাদকীয়
লিখেছেন সুব্রত আচার্য
১৯৪৭ সালে ভারত যখন স্বাধীন হল, তখন খবরের জগৎ বলতে প্রধানত সংবাদপত্র ও বেতার। ছাপাখানা কম, কাগজের জোগান সীমিত, যোগাযোগব্যবস্থাও দুর্বল। কলকাতায় সকালে প্রকাশিত খবর দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছতে কয়েক দিন লেগে যেত। টেলিভিশন তখনও ভারতে আসেনি। মোবাইল, ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল কল্পনার বাইরে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার সময় আকাশবাণীর কেন্দ্র ছিল মাত্র ছ’টি—দিল্লি, বোম্বে, কলকাতা, মাদ্রাজ, তিরুচিরাপল্লি ও লখনউ। বেতার পরিষেবা পৌঁছত দেশের মাত্র আড়াই শতাংশ এলাকায় এবং ১১ শতাংশ মানুষের কাছে।
তৎকালীন সংবাদপত্রের সঠিক সর্বভারতীয় সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। কারণ আজকের মতো কেন্দ্রীয় নিবন্ধনব্যবস্থা তখন ছিল না। প্রথম প্রেস কমিশনের সুপারিশের পরে ১৯৫৬ সালে সংবাদপত্রের নিবন্ধকের দপ্তর তৈরি হয়।
তার পর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে।
কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের সর্বশেষ হিসাব বলছে, ২০২৪-২৫ সালের শেষে ভারতে নিবন্ধিত প্রকাশনা ছিল ১ লক্ষ ৫৪ হাজার ৫২৩টি। এর মধ্যে দৈনিক ২২ হাজার ৭৫৯ এবং সাপ্তাহিক ৪৭ হাজার ৭৩৬। পাক্ষিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক ও অন্যান্য প্রকাশনা মিলিয়ে ৮৩ হাজার ৪৭০।
এই হিসাব অবশ্য নথিভুক্ত প্রকাশনার। সবগুলি নিয়মিত প্রকাশিত হয় না। বহু পত্রপত্রিকার নাম সরকারি খাতায় থাকলেও বাজারে তাদের দেখা মেলে না। তা সত্ত্বেও স্বাধীনতার সময়ের সীমিত পরিসর থেকে ভারতের সংবাদপত্র কতটা বিস্তৃত হয়েছে, সংখ্যাগুলিই তার সাক্ষ্য দেয়।
বেতারের পরে এল টেলিভিশন। দূরদর্শনের একচেটিয়া সময় পেরিয়ে দেশে বেসরকারি চ্যানেলের বিস্ফোরণ ঘটল। ট্রাইয়ের ২০২৪-২৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের অনুমোদনপ্রাপ্ত বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল ছিল ৯১৮টি। চালু ছিল ৩৮৮টি বেসরকারি এফএম কেন্দ্র এবং ৫৩১টি কমিউনিটি রেডিয়ো স্টেশন।
এর পরে ইন্টারনেট এসে খবরের প্রচলিত হিসাবটাই বদলে দিল।
ট্রাই জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চের শেষে দেশে ইন্টারনেট সংযোগের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯৬ কোটি ৯১ লক্ষ। এটি অবশ্য পৃথক ব্যবহারকারীর হিসাব নয়। একজনের নামে একাধিক সংযোগ থাকতে পারে। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যাই বলে দেয়, খবর দেখা, পড়া এবং ছড়িয়ে দেওয়ার অভ্যাস কতটা বদলে গিয়েছে।
আজ সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমও জনমত গঠনে বড় ভূমিকা নিচ্ছে। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, এক্স কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ এখন খবর ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান জায়গা। আগে কোন সংবাদ পাঠকের কাছে পৌঁছবে, তা ঠিক করতেন সম্পাদক ও সংবাদকক্ষ। এখন একটি স্মার্টফোনই একজন সাধারণ মানুষকে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং মুহূর্তের মধ্যে তার প্রচারক করে তুলতে পারে।
এই পরিবর্তনের সুফল অস্বীকার করার উপায় নেই। গ্রামের ঘটনা দ্রুত শহরে পৌঁছচ্ছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ প্রশাসনের নজরে আসছে। বড় সংবাদমাধ্যমে জায়গা না পাওয়া অনেক বিষয় ডিজিটাল মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসছে। ছোট ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যমও নিজেদের পাঠক-দর্শক তৈরি করছে। কোনও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আগের মতো সহজে আড়াল করে রাখা কঠিন।
কিন্তু স্বাধীনতার এই প্রসার দায়িত্ববোধ বাড়াতে পারেনি সর্বত্র। যাচাইয়ের আগেই খবর প্রকাশিত হচ্ছে। অন্য দেশ বা পুরনো ঘটনার ছবি নতুন বলে চালানো হচ্ছে। ভিডিয়োর সুবিধাজনক অংশ কেটে উদ্দেশ্যমূলক প্রচার চলছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠলেই আদালতের রায়ের আগেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে দেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তিগত বিরোধ মেটানো, ভয় দেখানো কিংবা কারও সামাজিক সম্মান নষ্ট করার কাজেও কোনও কোনও মাধ্যমকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
মূলধারার গণমাধ্যমও এই ব্যাধির বাইরে নয়। বিজ্ঞাপন হারানোর আশঙ্কা, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা, মালিকের ব্যবসায়িক স্বার্থ বা ব্যক্তিগত সুবিধার কারণে কখনও তুচ্ছ খবর বড় হয়ে ওঠে। আবার গুরুত্বপূর্ণ খবর জায়গাই পায় না। পাঠক বা দর্শক টানতে এমন শিরোনাম দেওয়া হয়, যার সঙ্গে মূল প্রতিবেদনের সামান্যই মিল থাকে।
প্রায় দুই দশক ধরে গণমাধ্যমে কাজ করার সুবাদে এই পরিবর্তন খুব কাছ থেকে দেখেছি। সংবাদ প্রতিদিন ও খবর ৩৬৫ দিন-এ কাজ করেছি। বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছি। এখনও বাংলাদেশের একটি বড় সংবাদমাধ্যমে কাজ করছি। বর্তমানে ডিজিটাল মাধ্যম প্রথম কলকাতা এবং পাক্ষিক সংবাদপত্র সময়ের প্রথম কলকাতা পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছি। যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সে দেশের গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছি। সাংবাদিক হিসাবে রাষ্ট্রসংঘে উপস্থিত থাকার সুযোগও হয়েছে।
এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে একটি কথাই বলতে পারি—প্রযুক্তি বদলায়, খবর প্রকাশের গতি বদলায়, পাঠকের অভ্যাসও বদলায়। কিন্তু সাংবাদিকতার প্রাথমিক শর্ত বদলায় না। সেই শর্ত হল বিশ্বাসযোগ্যতা।
সব গণমাধ্যমকে অবশ্য এক মাপকাঠিতে বিচার করা অন্যায় হবে। এখনও বহু সাংবাদিক আর্থিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক চাপ এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়েও সত্য প্রকাশ করছেন। দুর্নীতির খবর সামনে আনছেন। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করছেন। দুর্গম এলাকা থেকে সাধারণ মানুষের কথা তুলে ধরছেন। তাঁদের কাজের উপরেই সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের অবশিষ্ট বিশ্বাস দাঁড়িয়ে আছে।
ভারতের সংবিধানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা আলাদা মৌলিক অধিকার হিসাবে লেখা নেই। সংবিধানের ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদে স্বীকৃত বাক্স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের মধ্যেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ভিত্তি রয়েছে। প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৮-এ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থার মান বজায় রাখার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বের সম্পর্কটি আইনেও স্বীকৃত।
সমস্যার সমাধান শুধু নতুন আইন বা নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে সম্ভব নয়। সংবাদ এবং মতামতের ব্যবধান স্পষ্ট রাখতে হবে। অভিযোগ প্রকাশের আগে অভিযুক্তের বক্তব্য নেওয়া জরুরি। ভুল খবর প্রকাশিত হলে দায় এড়িয়ে নয়, গুরুত্ব দিয়ে সংশোধন করতে হবে। মালিকানা, বিজ্ঞাপন এবং স্বার্থের সংঘাত নিয়েও পাঠকের কাছে স্বচ্ছ থাকা প্রয়োজন। পাঠক-দর্শকের দায়িত্বও কম নয়। চমকপ্রদ কোনও খবর পেলেই যাচাই না করে তা অন্যের কাছে পাঠানো বন্ধ করতে হবে।
আগামী দিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংবাদ সংগ্রহ, অনুবাদ, সম্পাদনা ও প্রচার আরও সহজ করবে। একই প্রযুক্তিতে নকল ছবি, কণ্ঠস্বর ও ভিডিয়োও তৈরি হবে। ফলে সত্য-মিথ্যা আলাদা করার কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠবে। তখন বড় অফিস, দামি ক্যামেরা বা বিপুল দর্শকসংখ্যা দিয়ে কোনও সংবাদমাধ্যমের মান বিচার করা যাবে না। বিচার হবে তার প্রকাশিত খবর কতটা নির্ভরযোগ্য, তা দিয়ে।
গণমাধ্যমকে স্বাধীন থাকতেই হবে। কারণ ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার অধিকার ছাড়া গণতন্ত্র সুস্থ থাকতে পারে না। কিন্তু সেই স্বাধীনতার নামে অপতথ্য ছড়ানো, চরিত্রহনন করা বা ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার অধিকার কারও নেই। স্বাধীনতার আট দশক পরে ভারতীয় গণমাধ্যমের সামনে তাই সবচেয়ে কঠিন কাজ—নিজের স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং সেই স্বাধীনতার মর্যাদাও রাখা। ( লেখক সময়ের প্রথম কলকাতা পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক )













