Sujit Chattopadhyay Teacher: বছরে মাত্র দু’টাকায় পড়িয়েছেন গ্রামের দরিদ্র পড়ুয়াদের, তাই এলাকার মানুষের কাছে তিনি ‘ফকির মাস্টার’। প্রায় ৪০ বছর শিক্ষকতার পর অবসরেও থামেননি। ২০২১ সালে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত সুজিত চট্টোপাধ্যায়ের শিক্ষাজীবনের এই গল্প আজও অনুপ্রেরণার।
প্রথম কলকাতা: মাত্র দু’টাকা। বছরে এই সামান্য টাকাতেই একসময় গ্রামের পড়ুয়াদের পড়াতেন পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের উত্তর রামনগরের বাসিন্দা সুজিত চট্টোপাধ্যায়। এলাকার মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ‘ফকির মাস্টার’ নামে, আর তাঁর সেই পাঠশালার নাম ‘সদাই ফকিরের পাঠশালা’। শিক্ষকতা তাঁর কাছে শুধু পেশা ছিল না, ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক নিরলস চেষ্টা। প্রায় চার দশক স্কুলে শিক্ষকতা করার পর অবসর নিলেও পড়ানো থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি তিনি। বরং অবসরের পর শুরু করেছিলেন গ্রামের দরিদ্র ও দুঃস্থ পরিবারের পড়ুয়াদের জন্য নিজের বাড়িতেই পাঠশালা। বছরে এক টাকা দিয়ে শুরু হওয়া সেই পড়ানোর পারিশ্রমিক পরে বেড়ে হয় দু’টাকা। সঙ্গে চারটি চকোলেট! বছরের পর বছর ধরে এমনভাবেই পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিয়েছেন তিনি। ২০২১ সালে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন সুজিত চট্টোপাধ্যায়। বয়সের ভারে এখন সেই পাঠশালা বন্ধ হলেও তাঁর গল্প থেকে যায় শিক্ষার প্রতি এক বিরল দায়বদ্ধতার উদাহরণ হয়ে।
‘মাস্টারমশাই, আমাদের পড়াবেন?’
গল্পের শুরু আজ থেকে প্রায় ২২ বছর আগে। অবসর নেওয়ার পর কী করবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর সুজিত চট্টোপাধ্যায়ের কাছে যেন আগে থেকেই জানা ছিল। পড়ানোই ছিল তাঁর ভালোবাসা। সেই সময় কয়েকজন পড়ুয়া এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, “মাস্টারমশাই, আমাদের পড়াবেন?” রাজি হয়ে যান তিনি। কিন্তু তারপরই আসে স্বাভাবিক প্রশ্ন—পড়ানোর জন্য কত টাকা নেবেন?
সুজিতবাবুর উত্তর শুনে পড়ুয়াদের বিস্মিত হওয়ারই কথা। তিনি বলেন, “বছরে এক টাকা দিতে পারবি?” এত সামান্য পারিশ্রমিকে যে সত্যিই একজন শিক্ষক পড়াতে পারেন, তা হয়তো তাঁদের কাছে অবিশ্বাস্যই লেগেছিল। কিন্তু সেই এক টাকা দিয়েই শুরু হয় ‘সদাই ফকিরের পাঠশালা’।
সময়ের সঙ্গে সেই পারিশ্রমিক বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু তা বেড়ে মাত্র দু’টাকা। অর্থাৎ বছরে দু’টাকা দিয়েই পড়ুয়ারা তাঁর কাছে পড়ার সুযোগ পেত। সঙ্গে থাকত চারটি চকোলেট। টাকা দিয়ে শিক্ষাকে মাপার বদলে তিনি যেন পড়ুয়াদের সঙ্গে তৈরি করেছিলেন এক অন্যরকম সম্পর্ক—যেখানে শিক্ষক ছিলেন পথপ্রদর্শক, আর পড়াশোনা ছিল ভবিষ্যৎ গড়ার হাতিয়ার।
গ্রামেই থেকে গড়েছেন পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ
পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের রামনগরেই চলত এই ব্যতিক্রমী পাঠশালা। রামনগর উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক সুজিত চট্টোপাধ্যায় প্রায় ৪০ বছর স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। অবসর নেওয়ার পরও তাঁর পড়ানোর ইচ্ছা শেষ হয়ে যায়নি। বরং সেই ইচ্ছাই তাঁকে নিয়ে যায় গ্রামের দরিদ্র পরিবারের পড়ুয়াদের কাছে।
একসময় বড় শহরের স্কুলে পড়ানোর সুযোগও পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নিজের মাটি ছেড়ে যেতে চাননি। গ্রামের স্কুলেই থেকে গিয়েছেন দীর্ঘদিন। কম বেতন পেলেও গ্রামের ছেলেমেয়েদের পড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি। অবসরের পর নিজের বাড়িতেই শুরু করেন পাঠশালা।
নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের পাশাপাশি প্রথম থেকে তৃতীয় বর্ষের পড়ুয়ারাও তাঁর কাছে পড়াশোনা করেছেন। আশপাশের একাধিক গ্রামের দরিদ্র ও দুঃস্থ পরিবারের সন্তানরা এই পাঠশালায় এসে পড়াশোনা করতেন। একসময় সকাল, দুপুর এবং রাত—তিনটি সময় মিলিয়ে প্রায় হাজারের কাছাকাছি পড়ুয়া তাঁর কাছে পড়তে আসতেন বলে জানা যায়।
এই পাঠশালার আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ছাত্রীদের উপস্থিতি। তাঁর পাঠশালার প্রায় ৮০ শতাংশ পড়ুয়াই ছিল ছাত্রী। অর্থাৎ গ্রামের মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রেও এই পাঠশালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।
শুধু পড়াশোনা নয়, মানবিকতার পাঠও দিয়েছেন
সুজিত চট্টোপাধ্যায়ের পাঠশালার গল্প শুধু কম টাকায় পড়ানোর গল্প নয়। তাঁর কাছে পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার পাশাপাশি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার পাঠও দেওয়া হয়েছে।
থ্যালাসেমিয়া রোগীদের সাহায্য করার কাজেও যুক্ত ছিলেন এই পাঠশালার পড়ুয়ারা। ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে ১০ টাকা করে চাঁদা সংগ্রহ করে তা রোগী পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন সুজিতবাবু। অর্থাৎ বইয়ের পাতার বাইরেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা পেতেন পড়ুয়ারা।
এই দিক থেকেই ‘সদাই ফকিরের পাঠশালা’ আলাদা হয়ে ওঠে। শিক্ষকতা এখানে শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি বা নম্বর পাওয়ার মধ্যে আটকে ছিল না। সমাজের প্রতি সহমর্মিতা, দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যকে সাহায্য করার মানসিকতাও ছিল এই শিক্ষার অংশ।
আজ যখন শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক নিয়ে নানা ধরনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা সামনে আসে, তখন সুজিত চট্টোপাধ্যায়ের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের এই অধ্যায় নিঃশব্দে অন্য এক ছবির কথা মনে করিয়ে দেয়। কোনও প্রচার বা বড় আয়োজন ছাড়াই একজন শিক্ষক কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্মের পড়ুয়ার জীবনে প্রভাব ফেলতে পারেন, তাঁর জীবন তারই উদাহরণ।
পদ্মশ্রী সম্মান, তবুও পরিচয় সেই ‘ফকির মাস্টার’
সুজিত চট্টোপাধ্যায়ের এই দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রার স্বীকৃতি এসেছে জাতীয় স্তরেও। ২০২১ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়। কিন্তু সম্মান পাওয়ার পরও তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে ‘ফকির মাস্টার’ নামটিই যেন সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে রয়েছে।
কারণ তাঁর কাজের মূল কথাটিই ছিল নিঃস্বার্থভাবে পড়ানো। যেখানে শিক্ষার সঙ্গে অর্থের হিসাব জুড়ে যাওয়া খুব স্বাভাবিক, সেখানে তিনি বছরের পর বছর মাত্র এক টাকা, পরে দু’টাকার বিনিময়ে পড়িয়েছেন। তাঁর কাছে পড়তে আসা দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জন্য সেই সামান্য পারিশ্রমিকও যেন প্রতীকী ছিল।
তাঁর বয়স এখন আশির ঘরে। দীর্ঘ শিক্ষকতা, তারপর অবসরের পরও বছরের পর বছর পাঠশালা চালিয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে শরীর আর আগের মতো সঙ্গ দেয়নি। বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যার কারণে শেষ পর্যন্ত বন্ধ করতে হয়েছে ‘সদাই ফকিরের পাঠশালা’। ইচ্ছা থাকলেও বয়সের ভারে আর আগের মতো পড়ানো সম্ভব হয়নি।
তবে পাঠশালা বন্ধ হয়ে গেলেই কি একজন শিক্ষকের কাজ শেষ হয়ে যায়? সুজিত চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে উত্তরটা বোধহয় না। কারণ তাঁর হাতে পড়াশোনা করা অসংখ্য পড়ুয়ার জীবনে তাঁর দেওয়া শিক্ষার ছাপ থেকে যাওয়ার কথা। তাঁর পাঠশালার দরজা হয়তো আজ বন্ধ, কিন্তু তাঁর তৈরি করা সেই শিক্ষার পথ বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে।
দু’টাকার সেই শিক্ষা আজও অমূল্য
‘সদাই ফকিরের পাঠশালা’ হয়তো বড় কোনও ভবন ছিল না। সেখানে আধুনিক পরিকাঠামোর জাঁকজমকও ছিল না। ছিল একজন শিক্ষক, তাঁর পড়ানোর ইচ্ছা এবং গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার সংকল্প।
বছরে দু’টাকার বিনিময়ে পড়ানো—শুনতে যতটা অবিশ্বাস্য, তার থেকেও বড় ছিল এর নেপথ্যের মানসিকতা। সেই কারণেই সুজিত চট্টোপাধ্যায় শুধু একজন শিক্ষক নন, গ্রাম বাংলার শিক্ষার ইতিহাসে একটি অনন্য চরিত্র হয়ে উঠেছেন। তাঁর গল্প মনে করিয়ে দেয়, একজন মানুষের কাছে শিক্ষা যদি কেবল পেশা না হয়ে দায়িত্ব হয়ে ওঠে, তাহলে সীমিত সামর্থ্য দিয়েও তার প্রভাব কতটা বড় হতে পারে।
আজ বয়সের কারণে পাঠশালা বন্ধ। কিন্তু ‘ফকির মাস্টার’-এর সেই পথ থেমে যায়নি। তাঁর পড়ুয়ারা হয়তো ছড়িয়ে পড়েছেন বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন পেশায়। কেউ হয়তো নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, কেউ হয়তো অন্য কারও হাত ধরে এগিয়ে দিয়েছেন। সেই প্রতিটি গল্পের আড়ালেই থেকে যেতে পারে রামনগরের সেই ছোট্ট পাঠশালা এবং এক শিক্ষকের নিঃস্বার্থ পরিশ্রম।
শিক্ষক দিবসে তাই সুজিত চট্টোপাধ্যায়ের মতো শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে শুধু একজন মানুষকে সম্মান জানানো নয়। বরং সেই সমস্ত শিক্ষককে কুর্নিশ জানানো, যাঁরা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও প্রজন্মের পর প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়েছেন শিক্ষার আলো।
#SujitChattopadhyayTeacher #SujitChattopadhyay #FakirMaster #SadayiFakirPathshala #EastBardhaman #Ausgram #Ramnagar #PadmaShriTeacher #PadmaShri2021 #BengaliTeacher #RuralEducation #RuralTeacher #TeacherDay #TeachersOfIndia #InspiringTeacher #FreeEducation #VillageEducation #EducationInBengal














