লিখেছেন অশোক বসু
সেদিন শিডিউল টাইমের বেশ খানিকটা আগেই শ্যুটিং প্যাকআপ হয়ে গেল। আর্টিস্ট হিসেবে উত্তমকুমার রয়েছেন, অথচ শিডিউল টাইমের আগে শ্যুটিং প্যাকআপ হয়ে গেল, এমনটা সচরাচর হয় না। উত্তমকুমারের সময়ের অনেক দাম। ডেট পাওয়া যায় না। যে সময়টা পাওয়া যায়, সবাই চেষ্টা করে সেই সময়ে যতটা বেশি কাজ উত্তমকুমারকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া যায়। অথচ এখানে হল ঠিক উল্টোটা। উত্তমকুমারের দেওয়া মূল্যবান সময়ের কিছুটা বাকি থাকতেই সেদিনের মতো শ্যুটিং শেষ করে দিতে হল। সেদিন শ্যুটিং দেখতে এসেছিলেন সাংবাদিক রবি বসু। হাতে তেমন কাজ না থাকলে এবং স্টুডিও ফ্লোরে উত্তমকুমারের শ্যুটিং থাকলে উনি চলে আসেন। কিছুটা সময় যদি উত্তমকুমারের সঙ্গে কাটিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে এই মানুষটাকে আরও খানিকটা বেশি চিনে নেওয়া যায়।
১৯৬৮ সালে রবিবাবু প্রসাদ পত্রিকার একটা বিশেষ সংখ্যা করেছিলেন উত্তমকুমারকে নিয়ে। উনি তখন প্রসাদ পত্রিকার সম্পাদক। দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল সংখ্যাটা। এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে ওই সংখ্যাটা আবার ছাপতে হয়েছিল। রবিবাবুর একটা পরিকল্পনা ছিল। উত্তমকুমারের জীবনকাহিনি লেখাবেন নামি কোনও লেখককে দিয়ে। উনি সমরেশ বসুকে দিয়ে সেই কাজটা করাবেন ভেবেছিলেন। সমরেশবাবুকে প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। রাজিও ছিলেন সমরেশ। কিন্তু নিজের লেখা নিয়ে অসম্ভব ব্যস্ত থাকায় সমরেশবাবুর পক্ষে রবিবাবুর এই ইচ্ছে পূরণ করা হয়ে ওঠেনি। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়েছিল। রবিবাবু নিজেই লিখবেন উত্তমকুমারের জীবনী। ১৯৭০-৭১ সালে অমানুষ ছবি করার আগে মুম্বই থেকে শক্তি সামন্ত এসেছিলেন লোকেশন দেখতে। সুন্দরবন এলাকায়। গিয়েওছিলেন। সঙ্গে ছিলেন উত্তমকুমার, এই ছবির কাহিনিকার শক্তিপদ রাজগুরু, আর সাংবাদিক রবি বসু। সুন্দরবনেই উত্তমবাবুর সঙ্গে রবিবাবুর কথা হয়েছিল। ১৯৮৬ সালে উত্তমবাবু রবিবাবুর সঙ্গে বসবেন তাঁর একটা পূর্ণাঙ্গ জীবনী লেখার জন্য। সে সময়টা আর উনি পাননি। রবিবাবুর ভয়ানক আক্ষেপ থেকে গেছে।
গতকাল ২ সেপ্টেম্বর শত বর্ষ পূর্ণ হল তাঁর। আজ তাঁর দ্বিতীয় শতকে প্রবেশ। অনেক কিংবদন্তি ছিলেন আমাদের দেশে, ১০০ বছরে যাঁরা অনেকেই ধুলোয় ঢেকে গিয়েছেন। কিন্তু উত্তমকুমার যাননি। মধ্য পঞ্চাশে যে বয়সে তিনি চলে গিয়েছিলেন শতবর্ষেও সেখানেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
ফিরে আসি সেদিনের কথায়।
শ্যুটিং তো প্যাকআপ হয়ে গেল। উত্তমবাবু বললেন, সন্ধেবেলায় আপনার কোনও অ্যাপয়েনমেন্ট আছে নাকি রবিবাবু। রবিবাবু বললেন, না, আমি তো আপনার শ্যুটিং দেখতেই এসেছি। আর ফাঁকে ফোকরে খানিকটা গপ্পোগুজব করব। উত্তমবাবু বললেন, তাহলে চলুন একটু আউটডোর ঘুরে আসি। রবিবাবু বললেন, সে কি! আউটডোরে কার ছবির শ্যুটিং? তাঁর কখন কাজ হওয়ার কথা ছিল? উত্তমকুমার হেসে বললেন, না না, শ্যুটিং নয়। এই আপনি আর আমি কোথাও একটু ঘুরে আসি। রবিবাবু বললেন, কোথায় যাবেন বলুন। উত্তমবাবু বললেন, চলুন ডায়মন্ড হারবার ঘুরে আসি। নারাজ রবিবাবু। বললেন, অত দূর! ফিরতে ফিরতে তো অনেক রাত হয়ে যাবে। আমাকে তো বাড়ি ফিরতে হবে। উত্তমবাবু হেসে বললেন একদিন না হয় বাড়ি নাই ফিরলেন। রবিবাবু বললেন, সেটা হবে না। যত রাতই হোক আমি বাড়ি ফিরে আসি। অতএব না ফিরলে বাড়িতে হইহই পড়ে যাবে। তার চেয়ে চলুন আপনার বাড়িতে বসে খানিকক্ষণ গপ্পোগুজব করে তারপর আমি বাড়ি ফিরে যাই। উত্তমবাবু বললেন, এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ঢুকতে ইচ্ছে করছে না। সারাদিন ইনডোরে কাটিয়ে আবার ইনডোর। না না, চলুন একটু কোথাও ঘুরে আসি। আপনি যখন ডায়মন্ডহারবার যাবেন না তাহলে চলুন একটু আউটরাম ঘাটে গিয়ে বসি। রবিবাবু বললেন, এই ব্রড ডে লাইটে, অসম্ভব একটু সন্ধে হলে একটা নিরিবিলি জায়গা দেখে খানিকক্ষণ বসা যেতে পারে। তাই ঠিক হল। স্টুডিওতেই খানিকক্ষণ কাটিয়ে ওঁরা বেরিয়ে পড়লেন। উত্তমকুমার নিজেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন। চলে গেলেন আউটরাম ঘাটে। একটু অন্ধকার মতো জায়গায় গাড়িটা পার্ক করে। ফোর্ট উইলিয়ামের গায়ে খানিকটা আলো-আঁধারি একটা নিরিবিলি জায়গা দেখে ঘাসের ওপরেই বসে পড়লেন। বসে খোশ মেজাজে গপ্পোগুজব চলতে লাগল। কোনও সিরিয়াস আলোচনা নয়। বরং বলা যেতে পারে ঠাট্টা-ইয়ার্কি করতে করতেই সময় কাটছিল। ভয় ছিল কারও না চোখে পড়ে যান। দু’-চারবার চা ওয়ালা, বাদামওয়ালা ঘুরে গিয়েছে। তাদের দেখে উত্তমবাবু কখনও হাত দিয়ে, কখনও মাথাটা নামিয়ে মুখটা আড়াল করে রেখেছেন। হঠাৎ উত্তমবাবু দাঁড়িয়ে পড়লেন। বললেন, উঠুন রবিবাবু, চলুন আজকে আপনাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাই। রবিবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় যাবেন? উত্তমবাবু বললেন, চলুন না। আমি তো নিয়ে যাচ্ছি আপনাকে। উঠে গাড়িটা যেখানে রাখা ছিল সেখান থেকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। সোজা গাড়ি ছুটল খিদিরপুরের দিকে। পোর্ট কমিশনার্সের অফিস বাড়িটার কাছে এসে থামলেন। উত্তমবাবু গাড়ির জানালা দিয়ে দোতলার একটা জানালার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, ওই জানালাটার পাশে বসে আমি কাজ করতাম। তখন ভালো লাগত না। এখন আবার সেই সময়, সেই জীবনটাতে ফিরে যেতে বড্ড ইচ্ছে করে। লাইফে কোনও টেনশন ছিল না। ডকে যে সব পোর্টার কাজ করছিলেন, তাঁদের দিকে দেখিয়ে বললেন, এরা সব আমার বন্ধু ছিল। কী ভালোবাসত আমাকে। রবিবাবু নিজেও তমলুক থেকে কলকাতায় এসে প্রথম দিকে পোর্ট কমিশনার্সেই টলি ক্লার্ক-এর কাজ করেছিলেন কিছুদিন। কথা বলতে বলতে উত্তমকুমারের গলার স্বর ভারী হয়ে উঠছিল। একটু কাঁপছিলও। চোখের মধ্যে একরাশ দুঃখ। রবিবাবুর মনে হল অভিনয় উত্তমকুমারকে অনেক কিছু দিয়েছে। নাম, যশ, খ্যাতি, প্রতিপত্তি এবং জনপ্রিয়তা। কিন্তু সহজ জীবনটা কেড়ে নিয়েছে। এখন তিনি সাধারণ মানুষের মতো সাধারণের মধ্যে আর মিশে যেতে পারেন না।
সন্ধে তখন রাত্রির দিকে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে কলকাতার দিকে ফিরতে লাগলেন ওঁরা। ফাঁকা রাস্তা। হেস্টিংস-এর ওপর দিয়ে গাড়ি ফিরছে। উত্তমকুমার উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে উঠলেন, আমার জীবনপাত্র উচ্ছলিয়া মাধুরী করেছ দান।
#UttamKumarShooting #UttamKumar #UttamKumarStory #UttamKumarLife #UttamKumarBiography #RabiBasu #BengaliCinema #BengaliActor #BengaliFilmIndustry #UttamKumarMemories #MahanayakUttamKumar #BengaliCinemaHistory #TollywoodHistory













