Uttam Kumar Centenary: উত্তম কুমারের জন্মদিন ও মৃত্যুদিনের বৃষ্টিকে ঘিরে স্মৃতির আবেগ, তাঁর অভিনয়ের কান্না-হাসি এবং ‘অমানুষ’-এর সেই হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত—সব মিলিয়ে এক প্রিয় নায়ককে হারানোর শূন্যতার অনন্য অনুভব। লিখেছেন অনিমেষ বৈশ্য
গুরু, তোমার জন্মদিনে বৃষ্টি। মৃত্যুদিনেও বৃষ্টি। আকাশভাঙ্গা বৃষ্টি। এত বৃষ্টি! কারণ, তুমি লোক ভালো। তোমার হাসি ভালো। তোমার কান্না ভালো। ‘অমানুষ’ ছবিতে তুমি একবার কেঁদেছিলে গুরু। অনিল চট্টোপাধ্যায় পুলিশ অফিসার। তিনি বদলি হয়ে যাচ্ছেন। তুমি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলে, ‘আপনি কি ভাবেন, আপনাকে ছাড়া আমাদের চলবে না? চলবে। এবং খুব ভালো ভাবে চলবে।’ ওরকম গুঁড়ো গুঁড়ো কান্না আমি কাউকে কাঁদতে দেখিনি। গলা ভেঙে আসছিল। তোমার গলায় বৃষ্টি ঝরে পড়ছিল, যেমন আজ পড়ছে। পড়েই যাচ্ছে। ভালো মানুষের কান্না অমনই হয়। কল্কে ফুলের মধুর মতো, শীতের কুয়াশার মতো, হঠাৎ খুঁজে পাওয়া নদীর মতো। আমি তো তোমার দিকে তাকিয়ে বলতে পারছি না গুরু, ‘তুমি কি ভাবো, তোমাকে ছাড়া আমাদের চলবে না?’ না, চলবে না। কেন চলবে?
গুরু, তোমার একশো বছর। ধুর। তোমার আসলে পাঁচশো বছর। হাজার বছরও হতে পারে। তুমি বহুদিন বেঁচে আছ। তুমি বহুদিন রেলগাড়ির কামরায় বসে আছ। ঘুম নেমে এসেছে তোমার চোখে। কখনও পাশে বসে সুচিত্রা, কখনও সুপ্রিয়া। ঝাঁকুনিতে দুই ঘুমন্ত অচেনা মানব-মানবী কাছে চলে আসছে। দুজনের নিশ্বাস মাখামাখি। দূরে ধুধু মাঠ, উড়ন্ত বক। বৃষ্টি নামছে। বৃষ্টি দিগন্তে, বৃষ্টি বুকের কোণে। দিকে দিকে সঘন গগন মত্ত প্রলাপে, প্লাবন-ঢালা শ্রাবণধারাপাতে, সে দিন তিমিরনিবিড় রাতে…। তুমি পৃথিবীর শেষপ্রান্তে গড়িয়ে যাওয়া এক রেলগাড়ির যাত্রী। পোটলায় চিঁড়ে-গুড়, বাতাসা। তোমার মৃত্যু নেই। বোধহয় জন্মও নেই। বৃষ্টির রাতে, নক্ষত্রের কোল ঘেঁষে কেউ একটা নেমে এসেছিল নগরে। সে নিশ্চয় তুমি গুরু। তারপর রাধা-পূর্ণ-প্রাচী, রূপবাণী-অরুণা-ভারতী, মিনার-বিজলি ছবিঘর…। দিকে দিকে শুধু তুমি। ‘সন্ন্যাসী রাজা’ ছবিতে হেমন্তবাবু একটি স্তোত্র গেয়েছিলেন—-কা তব কান্তা কস্তে পুত্র:…। গানের মাঝে সমবেত আওয়াজ উঠছিল, হরি ওম হরি ওম। কী আশ্চর্য গম্ভীর এক দূরান্তরের সুর ভেসে আসছিল। ঈশ্বর আছে কি নেই, আমি জানি না। তবে এটা জানি, পৃথিবী যেদিন শুদ্ধ থাকে, প্রেমিকার ঠোঁটে যেদিন ঝড় বয়, রাখাল বালক গরুর পিঠে ঘুমিয়ে পড়ে হারিয়ে যায় দিকচক্রবালে, সেদিন এমন গান গায় কেউ মেঘের আড়ালে। ওই ছবিতে তুমি ছিলে। তাই ওই গান ভাসছিল ইন্দুতে, সিন্ধুতে। আমার মতো জন্মনাস্তিকও সন্ন্যাসী রাজার মুখের দিকে তাকিয়ে কখন যে গেয়ে উঠেছে, হরি ওম হরি ওম।
জানো গুরু, সিনেমায় যাই থাক, ওই সন্ন্যাসী রাজা ছিলেন আসলে ভাওয়ালের মেজকুমার। ভাওয়ালের এক গ্রামে ছিল আমাদের বাড়ি। ঠাকুরদার মুখে কতবার ভাওয়াল রাজার গল্প শুনেছি। ঠাকুরদা স্পর্শ করেছিলেন রাজাবাবুকে। সিনেমায় যেদিন তোমাকে দেখলাম রাজাবাবুর ভূমিকায়, সেদিন একটা গন্ধ পাচ্ছিলাম। ভবানীপুরের ঘটিপাড়ার গন্ধ নয়, বাংলাদেশের এক পাড়াগাঁয়ের গন্ধ। যেখানে আমার ঠাকুরদার জন্ম, যেখানে সন্ন্যাসী রাজার জন্ম। পর্দার বাইরে সেই গন্ধটা ঘুরঘুর করছিল। মেঘলা আকাশের অমন গন্ধ হয়, স্বর্ণচাঁপার গা বেয়ে বৃষ্টির জল পড়লে অমন গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তুমি ফিরে এলে সন্ন্যাসী হয়ে। গাঁয়ের লোক ভেঙে পড়ল তোমাকে দেখতে। সত্যি হোক, মিথ্যে হোক, প্রিয় মানুষকে এ ভাবেই দেখতে লোক উপচে পড়ে। ওই তো রাজাবাবু, ওই তো রাজাবাবু।
তুমিও তো ফিরে আসো গুরু রোজ। কখনও শিয়ালদা ইস্টিশনের ভিখারি, কখনও বাসের ড্রাইভার, কখনও ফেরিওয়ালা। রোজ তোমাকে দেখি। আর বলে উঠি, ওই তো গুরু, ওই তো গুরু। তোমার যাওয়া নেই, শুধু ফেরা আছে।
এক বর্ষার দুপুরে ‘বন্দনা’ হলে ‘সপ্তপদী’ দেখতে গিয়েছিলাম। তখন কলেজে উঠেছি। পকেটে এক বান্ডিল বিড়ি। বৃষ্টিতে আধভেজা বিড়িতে কিছুতেই আগুন জ্বলছিল না। অনেক কষ্টে যখন এক বুক ধোঁয়া ছাড়লাম, দেখি পোস্টারে তুমি হাসছ গুরু। তোমার দিকে রাগ-রাগ মুখে চেয়ে আছে রিনা ব্রাউন। কী বলব গুরু, বিড়ির অমন মাতাল গন্ধ আর কোনওদিন পাইনি। তারপর কত দিবসরজনী গেল। সিনেমা হলে শপিং মল হল। তোমার পোস্টার কালের গর্ভে ঢাকা পড়ল। তবে আজও যখন ওই সিনেমা হলের পাশ দিয়ে যাই, তোমার গান শুনতে পাই গুরু। কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে, ‘যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো?’
মেঘলা দিনে সেই আধভেজা বিড়ির গন্ধ আসে। ধোঁয়া ওড়ে। বৃষ্টি নামে। তুমি লোক ভালো। তোমার হাসি ভালো। পৃথিবীতে যতদিন বৃষ্টি, ততদিন তুমি। দিকে দিকে সঘন গগন মত্তপ্রলাপে প্লাবন-ঢালা শ্রাবণধারাপাতে…।
ভালো থেকো গুরু।
#UttamKumar #UttamKumarCentenary #MahanayakUttamKumar #BengaliCinema #BengaliActor #IndianCinema #BengaliFilm #UttamKumarLegacy #LegendaryActor














