West Bengal Police Complaint Helpline: রাজ্য পুলিশকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ, জনমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলার লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। সাধারণ মানুষের অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য চালু করা হয়েছে একাধিক টোল-ফ্রি নম্বর। পাশাপাশি নবান্নে আধুনিক কন্ট্রোল রুম, পুলিশ বাহিনীর পরিকাঠামো উন্নয়ন, নতুন যানবাহন, প্রশিক্ষণ, আবাসন সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে এক লক্ষ নতুন পুলিশকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
প্রশাসনের দাবি, পুলিশের ভাবমূর্তি পুনর্গঠন এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানোই এই উদ্যোগগুলির মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, অভিযোগ জানানোর এই পরিষেবা কোনওভাবেই ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা বা মিথ্যা অভিযোগ দায়েরের জন্য ব্যবহার করা যাবে না। ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দিলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগ জানানোর জন্য চালু হল একাধিক টোল-ফ্রি নম্বর
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ জানানোর জন্য আলাদা আলাদা টোল-ফ্রি নম্বর চালু করা হয়েছে। নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে একাধিক টোল-ফ্রি নম্বর চালু করা হয়েছে। এই পরিষেবার মাধ্যমে রাজ্যের যে কোনও প্রান্ত থেকে মানুষ ফোন করে নিজেদের সমস্যা বা অভিযোগ জানাতে পারবেন। অভিযোগ গ্রহণের জন্য নির্ধারিত নম্বরগুলি হল— ১৮০০-৩৪৫-০১৬৬, ১৮০০-৩৪৫-০১৬৭, ১৮০০-৩৪৫-০১৬৮ এবং ১৮০০-৩৪৫-০১৬৯। সংশ্লিষ্ট অভিযোগ দ্রুত নথিভুক্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সিন্ডিকেট সংক্রান্ত অভিযোগের জন্য:
১৫৫৩৩৫
কাটমানি সংক্রান্ত অভিযোগের জন্য:
১৫৫৩৩৪
অনৈতিকভাবে রাস্তা বা টোল আদায় সংক্রান্ত অভিযোগের জন্য:
১৫৫৩৩৭
অবৈধ চোলাই মদ সংক্রান্ত অভিযোগের জন্য:
১৫৫৩৩৯
এছাড়াও সাধারণ প্রশাসনিক অভিযোগ জানানোর জন্য চারটি টোল-ফ্রি নম্বর চালু রয়েছে—
১৮০০-৩৪৫-০১৬৬
১৮০০-৩৪৫-০১৬৭
১৮০০-৩৪৫-০১৬৮
১৮০০-৩৪৫-০১৬৯
প্রশাসনের বক্তব্য, অভিযোগ করার সময় অবশ্যই সঠিক ও সত্য তথ্য দিতে হবে। কারণ একটি অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত, যাচাই এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তাই মিথ্যা অভিযোগ বা কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়রানির জন্য এই নম্বর ব্যবহার করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
নবান্নে আধুনিক কন্ট্রোল রুম, সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পরিষেবা
অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নবান্নে একটি আধুনিক কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এই কন্ট্রোল রুম চালু থাকবে। একসঙ্গে একাধিক টেলিফোন লাইনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অভিযোগ গ্রহণ করা হবে এবং প্রযুক্তির সাহায্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দ্রুত পাঠিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ থাকবে।
সরকারের আশা, এর ফলে সাধারণ মানুষ সহজে অভিযোগ জানাতে পারবেন এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াও আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ হবে।
পুলিশ আধুনিকীকরণে বড় পরিকল্পনা
সরকার জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ও কলকাতা পুলিশকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধাপে ধাপে পুলিশ বাহিনীকে দেওয়া হবে—
আধুনিক ইলেকট্রনিক নজরদারি ব্যবস্থা
সর্বাধুনিক সিসিটিভি প্রযুক্তি
বডি ক্যামেরা
আধুনিক কন্ট্রোল রুম
উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা
আধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম
একই সঙ্গে পুলিশ বাহিনীকে আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ, সংগঠিত এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
চার হাজার পুলিশ গাড়ি বদলানোর পরিকল্পনা
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, বর্তমানে রাজ্য পুলিশের বহু গাড়ির বয়স পনেরো বছরেরও বেশি। অনেক গাড়ির বীমাও নেই। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে পুলিশকর্মী বা সাধারণ মানুষ কেউই বীমার সুবিধা পান না।
এই পরিস্থিতি বদলাতে পর্যায়ক্রমে প্রায় চার হাজার পুলিশ গাড়ি পরিবর্তন করে নতুন ও আধুনিক যানবাহন দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
গুজরাট ও অসমে প্রশিক্ষণ নেবে পুলিশ
পুলিশকর্মীদের দক্ষতা আরও বাড়ানোর জন্য গুজরাটের রক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সহযোগিতায় অসমের তেজপুরে বিএসএফের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পুলিশ অফিসারদের পাঠিয়ে আধুনিক প্রশিক্ষণ ও নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হবে।
বিশেষ তদন্ত সংস্থা গঠন ও আধুনিক পরিকাঠামো
সরকার জানিয়েছে, জাতীয় তদন্ত সংস্থার আদলে রাজ্যে একটি বিশেষ তদন্ত সংস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভারতীয় ন্যায় সংহিতার বিধান, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, মানবাধিকার কমিশন এবং তফসিলি জাতি ও উপজাতি কমিশনের নির্দেশিকা সম্পর্কে পুলিশকর্মীদের আরও প্রশিক্ষিত করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পোস্টিং, আবাসন ও কর্মপরিবেশেও পরিবর্তনের পরিকল্পনা
মহিলা পুলিশকর্মীদের বাড়ির কাছাকাছি পোস্টিং দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন বাড়ির বাইরে কর্মরত পুলিশকর্মীদেরও পর্যায়ক্রমে নিজেদের জেলায় ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রশাসন কাজ করছে।
পুলিশ আবাসনের সংস্কার, পুরনো ব্যারাক মেরামত, নিরাপদ পানীয় জল, শারীরিক অনুশীলনের জায়গা এবং থানাগুলির পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজও ধাপে ধাপে করা হবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে বর্তমানে ৫৫২টি থানা রয়েছে। এর মধ্যে বহু থানায় এখনও পর্যাপ্ত পরিকাঠামো নেই। সেগুলির উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এক লক্ষ নতুন পুলিশকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা
সরকার জানিয়েছে, আগামী দিনে পর্যায়ক্রমে এক লক্ষ নতুন পুলিশকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি যে কোনও আবহাওয়ায় দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই ইতিমধ্যে ২০ হাজার বৃষ্টিরোধী সুরক্ষা কিট পুলিশ বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের ভাবমূর্তি ফেরানোর লক্ষ্য
প্রশাসনের বক্তব্য, অতীতে বিভিন্ন কারণে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ও কলকাতা পুলিশকে আরও দক্ষ, আধুনিক, জবাবদিহিমূলক এবং জনবান্ধব বাহিনীতে পরিণত করাই এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
সরকারের মতে, শুধু প্রযুক্তি বা পরিকাঠামো উন্নয়নই নয়, সাধারণ মানুষের সঙ্গে পুলিশের বিশ্বাসের সম্পর্ক পুনর্গঠনই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। তাই অভিযোগ জানানোর সুযোগ যেমন সহজ করা হয়েছে, তেমনই সেই সুযোগের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করার আবেদনও জানানো হয়েছে।
প্রশাসনের আশা, আধুনিক প্রযুক্তি, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং পরিকাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে আগামী দিনে আরও কার্যকর, দক্ষ ও জনমুখী পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
#WestBengalPolice #PoliceHelpline #PoliceReforms #Nabanna #PublicGrievance #KolkataPolice #LawAndOrder #PoliceModernization #WestBengal
