লিখেছেন সম্পদ চক্রবর্তী
West Bengal Investment: পশ্চিমবঙ্গে সরকার বদলের দু’মাসের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা সামনে এনেছে রাজ্য সরকার। ১১ জুলাই ডানকুনিতে ৬০০ কোটি টাকার একটি শিল্পপ্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, সিন্ডিকেট ও তোলাবাজি বন্ধ এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশ তৈরি করাই শিল্পায়নের প্রথম শর্ত। বিনিয়োগকারীদের জমি পেতে সহায়তা এবং একশো কোটি টাকার বেশি প্রকল্পের জন্য এক জানলা পদ্ধতিতে দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার।
মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, মেজিয়ায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ইস্পাত প্রকল্প, দুর্গাপুরে চার হাজার কোটি টাকার সম্প্রসারণ এবং দুগ্ধশিল্পে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ পরিকল্পনায় রয়েছে। এর সঙ্গে ডানকুনির ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প যুক্ত হয়েছে। তবে এই অঙ্কগুলিকে এখনই সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত বিনিয়োগ বলা যাবে না। কোনওটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছে, কোনওটি ঘোষণার পর্যায়ে এবং কোনওটির কাজ আগামী কয়েক মাসে শুরু হওয়ার কথা।
শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় জানিয়েছেন, পুজোর আগে আরও কয়েকটি শিল্পপ্রকল্প সামনে আসতে পারে। রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, এক বছরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পক্ষেত্রে পরিবর্তনের ছবি দৃশ্যমান হবে। নতুন সরকারের এই বার্তার গুরুত্ব রয়েছে। তবে শিল্পায়নের সম্ভাবনার পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে রাজ্যের বিপুল ঋণভার।
২০২৬–২৭ অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গের মোট রাজ্য অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ২১ লক্ষ ৪৮ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা হবে বলে বাজেটের অনুমান। অর্থবর্ষের শেষে রাজ্যের বকেয়া দায় মোট উৎপাদনের ৩৮ শতাংশে পৌঁছতে পারে। সেই অনুপাত ধরে মোট দায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ৮ লক্ষ ১৬ হাজার কোটি টাকা। এটি সরাসরি বাজেটে দেওয়া কোনও গোলাকার অঙ্ক নয়; রাজ্য অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও দায়ের অনুপাত থেকে পাওয়া হিসাব।
চলতি অর্থবর্ষে শুধু সুদ মেটানোর জন্য বাজেটে রাখা হয়েছে ৫৩ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। পুরনো ঋণের আসল পরিশোধের জন্য বরাদ্দ আরও ৫৪ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ সুদ ও আসল মিলিয়ে ঋণ পরিষেবায় এক বছরে প্রায় ১ লক্ষ ৭ হাজার ৬৪১ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। মুখ্যমন্ত্রী শিল্পমঞ্চে প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকা ঋণের পিছনে ব্যয়ের কথা বলেছিলেন। সরকারি বাজেটের হিসাবে এই এক লক্ষ কোটি টাকা কেবল সুদ নয়; সুদ এবং পুরনো ঋণের আসল পরিশোধ মিলিয়ে এই অঙ্কের কাছাকাছি পৌঁছয়।
বেতন, পেনশন ও সুদ মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের দায়বদ্ধ ব্যয় ২০২৬–২৭ সালে প্রায় ১ লক্ষ ৬২ হাজার ১৯০ কোটি টাকা হতে পারে। এটি রাজ্যের আনুমানিক রাজস্ব আয়ের ৫১ শতাংশ। অর্থাৎ রাজস্ব হিসেবে পাওয়া প্রতি ১০০ টাকার প্রায় ৫১ টাকা নতুন উন্নয়নমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই বেতন, পেনশন ও সুদের মতো নির্দিষ্ট খাতে চলে যাবে।
একই অর্থবর্ষে রাজস্ব ঘাটতি ২১ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা এবং রাজকোষ ঘাটতি ৬২ হাজার ৪২১ কোটি টাকা হবে বলে অনুমান। রাজস্ব ঘাটতির অর্থ, সরকারের দৈনন্দিন আয় দিয়ে দৈনন্দিন ব্যয় সম্পূর্ণ মেটানো যাচ্ছে না। রাজকোষ ঘাটতি পূরণে আবার ঋণ নিতে হয়, যা ভবিষ্যতের দায় আরও বাড়ায়।
এই পরিস্থিতিতে ২০ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। অঙ্কের হিসাবে তা মোট বকেয়া দায়ের প্রায় আড়াই শতাংশ। কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগের টাকা সরকারি কোষাগারে জমা পড়ে না এবং সরাসরি ঋণ শোধেও ব্যবহৃত হয় না। সেই অর্থে কারখানা, যন্ত্রপাতি, জমি ও উৎপাদন পরিকাঠামো তৈরি হয়। রাজ্য লাভ পায় কর্মসংস্থান, বিদ্যুৎ ব্যবহার, সম্পত্তি নিবন্ধন, উৎপাদন এবং পণ্য ও পরিষেবার লেনদেন বাড়ার মাধ্যমে। তার ফলেই ধীরে ধীরে নিজস্ব কর ও কর-বহির্ভূত আয় বাড়তে পারে।
বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের ছবিও পশ্চিমবঙ্গের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট করে। কেন্দ্রীয় শিল্প ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য প্রসার দফতরের হিসাবে, অক্টোবর ২০১৯ থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে বিদেশি প্রত্যক্ষ মূলধনী বিনিয়োগ এসেছে ১৬ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। একই সময়ে মহারাষ্ট্র পেয়েছে প্রায় ৮ লক্ষ ৩১ হাজার কোটি টাকা, কর্নাটক প্রায় ৫ লক্ষ ৪২ হাজার কোটি টাকা। রাজ্যগুলির তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের স্থান ছিল একাদশ। এই হিসাব শুধু বিদেশি প্রত্যক্ষ মূলধনী বিনিয়োগের; দেশীয় বিনিয়োগ এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।
পশ্চিমবঙ্গকে ঘুরে দাঁড়াতে ঠিক কত লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন, তার কোনও সরল সূত্র নেই। কারণ বিনিয়োগের অঙ্কের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তার ধরন, উৎপাদনের পরিমাণ, স্থানীয় কর্মসংস্থান, কর-রাজস্ব এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়।
রাজ্যের সামনে তাই প্রথম লক্ষ্য আট লক্ষ কোটি টাকার দায় এক ধাক্কায় শোধ করা নয়। জরুরি হলো নতুন ঋণের গতি কমানো, রাজস্ব ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, নিজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং ঘোষিত প্রকল্পগুলিকে বাস্তব উৎপাদন ও স্থায়ী কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়া। ডানকুনির শিল্পমঞ্চ থেকে দেওয়া বদলের বার্তা তখনই অর্থবহ হবে, যখন বিনিয়োগের ঘোষণা জমি, কারখানা, কাজ এবং রাজস্ব বৃদ্ধির নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানে ধরা পড়বে।
তথ্যসূত্র : পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬–২৭; পিআরএস লেজিসলেটিভ রিসার্চ; শিল্প ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য প্রসার দফতরের বিদেশি বিনিয়োগ-তথ্য; ১১ জুলাইয়ের শিল্প-অনুষ্ঠানে প্রকাশিত সরকারি বক্তব্য।

