West Bengal Education Reform: শিক্ষক দিবসের মঞ্চ থেকে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ, পড়ুয়াদের সুযোগ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বদলের পরিকল্পনার কথা জানালেন তিনি।
প্রথম কলকাতা: শিক্ষক দিবসের মঞ্চ থেকে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্যে উঠে এল স্কুলের পরিকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ, পড়ুয়াদের নিরাপত্তা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং সরকারি স্কুলের পরিবেশ বদলের প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, রাজ্যের নতুন সরকারের সামনে পথ সহজ নয়। মাত্র চার মাস সময় পেয়েছে সরকার, তার মধ্যেই বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে দিয়ে এগোতে হচ্ছে। তবে শিক্ষা ব্যবস্থার হাল ফেরাতে একাধিক ক্ষেত্রে পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। ১৯ হাজার স্কুলে পরিকাঠামোগত সমস্যা থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বিদ্যুৎ সংযোগ, পরিশ্রুত পানীয় জল, রান্নার ব্যবস্থা, সৌর প্যানেল, শৌচালয়, স্বাস্থ্যবিধি, গ্রন্থাগার ও খেলার মাঠের উন্নতির কথা বলেন। একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের সীমা এবং সংরক্ষণ নীতি মেনে নিয়োগের কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। পাশাপাশি স্বামী বিবেকানন্দ, বিদ্যাসাগর, রাধাকৃষ্ণন এবং ভারতীয় পরম্পরার প্রসঙ্গ টেনে শিক্ষার সঙ্গে মূল্যবোধ ও চরিত্র গঠনের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেন তিনি।
‘মাত্র চার মাস পেয়েছি’, কঠিন পথ পেরিয়ে শিক্ষায় বদলের বার্তা West Bengal Education Reform
শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে নিজের সরকারের সময়সীমার প্রসঙ্গ তুলে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, নতুন সরকার মাত্র চার মাস সময় পেয়েছে। সেই সময়ের মধ্যেই নানা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। অনুষ্ঠানের আয়োজনে কিছু ত্রুটি থাকতে পারে বলেও স্বীকার করেন তিনি। তবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও সুন্দর করে তোলার বিষয়ে তাঁর সরকারের লক্ষ্য স্পষ্ট বলে জানান।
শিক্ষা নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বিদ্যাসাগর ও ড. সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণনের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। কর্মদক্ষতার জন্য বিভিন্ন বিদ্যামন্দির ও বিদ্যালয়কে সম্মানিত করার কথাও উল্লেখ করেন। শিক্ষক দিবসের মঞ্চ থেকেই শিক্ষকদের ভূমিকার প্রতি সম্মান জানান তিনি।
তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ভারতীয় পরম্পরাকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার প্রসঙ্গ। বিদ্যাসাগর নারীশিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রে যে ভূমিকা নিয়েছিলেন, সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আজও তাঁর চিন্তা প্রাসঙ্গিক। স্বামী বিবেকানন্দের বই পড়ার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষা শুধু কেতাবি জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তির বিকাশ হওয়া দরকার।
এই ভাবনা থেকেই বিদ্যালয়ের পরিবেশকে আরও সুন্দর ও প্রাণবন্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
১৯ হাজার স্কুলে পরিকাঠামোর সমস্যা, বিদ্যুৎ-জল থেকে শৌচালয়ে জোর West Bengal Education Reform
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকাঠামো নিয়ে বড় অংশ জুড়ে আলোচনা হয়। তিনি জানান, রাজ্যের ১৯ হাজার স্কুলে এখনও পরিকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, কোথাও আবার পড়ুয়াদের জন্য পরিশ্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
বিদ্যালয়ে রান্নার ব্যবস্থা, সৌর প্যানেল এবং জল পরিশোধনের ব্যবস্থা করার কথা বলেন তিনি। ছাত্রছাত্রীদের জন্য আলাদা শৌচালয় এবং স্বাস্থ্যবিধির প্রয়োজনীয়তার কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। মেয়েদের জন্য স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বসানোর কথাও বলেন তিনি।
শুধু ভবন বা বিদ্যুৎ সংযোগ নয়, বিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশ বদলের উপরেও জোর দেন তিনি। গ্রন্থাগারগুলিকে আরও ভালোভাবে সাজানো, খেলার মাঠের উন্নতি এবং বিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করার কথা বলেন। তাঁর মতে, বিদ্যালয় এমন জায়গা হওয়া উচিত যেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি শরীরচর্চা, খেলাধুলা, সংগীত এবং সংস্কৃতির চর্চাও হবে।
বিদ্যালয়ে তবলা, সেটার, হারমোনিয়াম, একতারা ও খঞ্জনির মতো বাদ্যযন্ত্র রাখার কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে কী বললেন শুভেন্দু? West Bengal Education Reform
শিক্ষক নিয়োগের প্রসঙ্গেও একাধিক কথা বলেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার প্রসঙ্গ। মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠিয়ে শিক্ষক নিয়োগের পদ্ধতির বিরোধিতা করে তিনি লিখিত পরীক্ষার উপর জোর দেন। মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর রাখা উচিত নয় বলেও মত দেন তিনি।
সংরক্ষণ নীতি মেনে শিক্ষক নিয়োগ করার কথা বলেন তিনি। একই সঙ্গে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির ক্ষেত্রে যে বৈষম্য হয়েছে বলে তিনি মনে করেন, তা বন্ধ করার কথাও বলেন।
শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব বিশেষজ্ঞদের হাতে দেওয়ার প্রসঙ্গও তাঁর বক্তব্যে আসে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠানের তিনজন সন্ন্যাসীকে রাখার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তবে নিয়োগ পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত সিদ্ধান্তের সবকিছু শিক্ষক দিবসের মঞ্চে জানাতে চাননি বলে জানান।
তাঁর বক্তব্যে শিক্ষকতার মর্যাদার প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, এখনও শিক্ষককে দেখলে অনেকে জুতো খুলে প্রণাম করেন। সেই সম্মান ও মর্যাদা বজায় রাখা প্রয়োজন।
শিক্ষককে পড়ানোর কাজে রাখতে হবে, অন্য কাজে নয়
শিক্ষকদের কাজের পরিধি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য, সারাদিন একজন শিক্ষককে যদি বিদ্যালয়ের অন্যান্য কাজ, বিশেষ করে মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়, তাহলে পড়ানোর মূল কাজটি ব্যাহত হয়।
এই কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষা সহায়ক কর্মী নিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। তাঁর মতে, শিক্ষককে পড়ানোর কাজে আরও বেশি সময় দিতে হবে। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও সহায়ক কাজের জন্য আলাদা কর্মী থাকলে শিক্ষকের মূল দায়িত্ব পালনের সুযোগ বাড়বে।
বিদ্যালয়ের অন্যান্য পরিকাঠামোর কথাও বলেন তিনি। সাইকেল রাখার জায়গা থেকে শুরু করে পড়ুয়াদের নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
একটি বিদ্যালয়ে সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটলে পড়ুয়াকে দূরের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হওয়ার প্রসঙ্গও তিনি উল্লেখ করেন। অর্থাৎ স্কুলের পরিকাঠামোর সঙ্গে পড়ুয়াদের জরুরি নিরাপত্তার বিষয়টিকেও একইভাবে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত মেলে।
খেলাধুলা, শরীরচর্চা ও সংস্কৃতিকে ফেরানোর ডাক
শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে খেলাধুলার সম্পর্ক নিয়েও বিস্তারিত কথা বলেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য, বিদ্যালয়গুলিতে খেলাধুলার উপর যথেষ্ট নজর দেওয়া হয়নি। তাই হারিয়ে যাওয়া খেলাধুলার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন রয়েছে।
ব্রতচারীর মতো শরীর গঠনের চর্চা ফিরিয়ে আনার কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষার্থী বাহিনীর চর্চা ফিরিয়ে আনার কথাও বলেন। খোখো, হাডুডু-সহ বিভিন্ন দেশীয় খেলাকে বিদ্যালয়ে ফেরানোর উপর জোর দেন।
মেদিনীপুরের কিছু বিদ্যালয়ের বড় মাঠ, পুকুর এবং প্রার্থনার জায়গার উদাহরণও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। বহু বিদ্যালয়ে স্বামী বিবেকানন্দ, বিদ্যাসাগর এবং মাতঙ্গিনী হাজরার মূর্তি থাকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, এই ধরনের ঐতিহ্য ও পরিবেশকে ফিরিয়ে আনা দরকার।
শিক্ষার্থীদের বক্তৃতা ও তাৎক্ষণিক বক্তৃতার অভ্যাস তৈরি করার কথাও বলেন তিনি। নিজের কলেজ জীবনের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে জানান, বক্তৃতা দেওয়া এবং তাৎক্ষণিকভাবে কথা বলার অভ্যাসের মাধ্যমে তিনি নিজেও শিখেছেন। বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার সেই অভ্যাসকে প্রভাবিত করছে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
মোবাইল ফোন, পাঠ্যক্রম ও মূল্যবোধ নিয়েও কড়া বার্তা
বিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহারের প্রসঙ্গেও কথা বলেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য, বর্তমানে সবার হাতে মোবাইল। এমনকি রাতে অভিভাবকদের চোখ এড়িয়ে পড়ুয়াদের মোবাইল ব্যবহারের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। গুজরাটে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মোবাইল নিষিদ্ধ থাকার উদাহরণ টেনে এ বিষয়ে ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান।
তবে মোবাইল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ফলে রাজনৈতিকভাবে কিছু সমর্থন কমতে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও নিজের বক্তব্যে জানান তিনি।
পাঠ্যক্রম নিয়েও একাধিক বিষয় উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলার সৃষ্টি, স্বামী প্রণবানন্দ এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় সম্পর্কে পড়ুয়াদের জানার সুযোগ থাকা দরকার। সংস্কৃত শেখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
বন্দেমাতরমের প্রতিটি শব্দের মধ্যে গভীর তাৎপর্য রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি ভারতীয় পরম্পরা ও মূল্যবোধকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার উপর জোর দেন।
আর্থিক নিরাপত্তা থেকে মধ্যাহ্নভোজ, সরকারি স্কুলে নজর
শিক্ষক ও পড়ুয়া—দুই পক্ষের স্বার্থ সুরক্ষার কথাও বলেন শুভেন্দু অধিকারী। শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তার প্রসঙ্গে সপ্তম বেতন কমিশনের কথা উল্লেখ করেন তিনি। পুজোর আগে অগ্রিম বেতন দেওয়ার কথাও জানান।
সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের ধরে রাখতে ভালো পরিবেশের পাশাপাশি ভালো মধ্যাহ্নভোজ ও পোশাকের ব্যবস্থা করার উপর জোর দেন তিনি। মধ্যাহ্নভোজের বরাদ্দ বাড়ানোর কথাও জানান।
তাঁর বক্তব্যে মধ্যাহ্নভোজের আওতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও উঠে আসে। সপ্তাহে দু’দিন সিদ্ধ ডিম দেওয়ার কথা বলেন তিনি। তবে সাত্ত্বিক আহার চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগের প্রসঙ্গও তাঁর বক্তব্যে আসে এবং তিনি জানান, এ নিয়ে কেউ কেউ আপত্তি তুলেছিলেন।
পড়ুয়াদের জন্য বৃত্তি ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বৈষম্য না রাখার কথা বলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের পড়ুয়াদের শুধু বৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা তিনি বন্ধ করেছেন। সকলের জন্য সমান সুযোগের কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি মাদ্রাসা বোর্ডের কৃতী পড়ুয়াদের সম্মানিত করার কথাও জানান।
শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক পরিবর্তন যে একদিনে সম্ভব নয়, সেই কথাও তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট। পশ্চিমবঙ্গকে শিক্ষায় দেশের সেরা দশের মধ্যে নিয়ে আসতে তিন বছর সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি।
#WestBengalEducationReform #WestBengalEducation #ShuvenduAdhikari #ShuvenduAdhikariEducation #TeachersDay #WestBengalSchools #SchoolEducation #CMShreeSchool #VidyasagarMeritScholarship #TeacherRecruitment #SchoolInfrastructure #MidDayMeal #EducationPolicy #GovernmentSchools #BengalEducationSystem













