Tarique Rahman India Visit: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর ঘিরে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। সফরের প্রস্তুতি নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ চললেও, এখন সেই সফরের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত সামনে আনল বাংলাদেশ। ঢাকার বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। আর সেই পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে ভারতের কাছে কয়েকটি নির্দিষ্ট অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক অপরাধীকে বাংলাদেশে দ্রুত ফেরত পাঠানো। একই সঙ্গে শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার আসামিদেরও বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা। বিষয়টি শুধু একটি সম্ভাব্য রাষ্ট্রীয় সফরের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ, বিচারসংক্রান্ত সহযোগিতা এবং দুই প্রতিবেশী দেশের পারস্পরিক আস্থার প্রশ্নও।
দিল্লি সফরের আগে কেন ‘অনুকূল পরিবেশ’-এর কথা বলছে ঢাকা?
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে দুই দেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। অর্থাৎ সফরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। তবে সফরটি বাস্তবায়নের আগে দুই দেশের সম্পর্কের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ঢাকার অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।
ঢাকার বক্তব্যের মূল জায়গাটি হলো—একটি রাষ্ট্রীয় সফর তখনই ফলপ্রসূ হতে পারে, যখন দুই দেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরি থাকে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করছে, প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত বিষয়গুলোর অগ্রগতি সেই পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ কারণেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক অপরাধীকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার আসামিদেরও বাংলাদেশে হস্তান্তরের দাবি জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।
শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
এই পুরো কূটনৈতিক বার্তার সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ নিঃসন্দেহে শেখ হাসিনাকে ঘিরে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছেন। ঢাকার মতে, ওই ঘটনার ফলে সম্ভাব্য ভারত সফরকে ঘিরে যে পরিবেশ তৈরি হচ্ছিল, তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান ইতিমধ্যেই পরিষ্কার করেছে। দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই অনুরোধ করা হয়েছে অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের ক্ষেত্রেও।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—ঢাকা বিষয়টিকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দাবি হিসেবে উপস্থাপন করছে না; বরং দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় বিষয়টি দেখছে। ফলে সামনে ভারতের অবস্থান কী হয়, সেটিই এখন কূটনৈতিক মহলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
হাদি হত্যা মামলার আসামিদের নিয়েও ভারতের কাছে ঢাকার অনুরোধ
শুধু সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয় নয়, শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার আসামিদের বাংলাদেশে হস্তান্তরের অনুরোধও জানিয়েছে ঢাকা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে এই বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের অবস্থান অনুযায়ী, সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের ভারত সফরের আগে দুই দেশের মধ্যে বিচার ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি প্রয়োজন। বিশেষ করে কোনো মামলার আসামি যদি অন্য দেশে অবস্থান করেন, তাহলে তাকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া দুই দেশের আইন ও চুক্তির ওপর নির্ভর করে। সেই কাঠামোর মধ্যেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ।
এর ফলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর এখন শুধু দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক বা আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। সফরের আগে একাধিক সংবেদনশীল বিষয় কীভাবে এগোয়, তার ওপরও সফরের পরিবেশ অনেকটাই নির্ভর করতে পারে।
কবে হতে পারে তারেক রহমানের দিল্লি সফর?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রাষ্ট্রীয় সফরে দিল্লি নেওয়ার বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। ভারত আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে দুই দিনের সফরের জন্য সম্ভাব্য একটি সময় বাংলাদেশকে প্রস্তাব করেছিল। তবে বাংলাদেশ সেই সময়ের পরিবর্তে কাছাকাছি অন্য কোনো সময়ে সফর আয়োজনের বিষয়টি বিবেচনা করছে।
আগস্টের তৃতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহের মধ্যে সফরের সূচি নিয়ে দুই দেশ আলাদা আলাদা তারিখ বিবেচনা করছে। তবে প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত কোনো দেশই সফরের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। অর্থাৎ আলোচনা এগোলেও চূড়ান্ত তারিখ এখনও নিশ্চিত নয়।
এই পরিস্থিতিতে ঢাকার নতুন বার্তা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সফরের সম্ভাব্য সময় নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশ জানিয়ে দিল—সফরের আগে প্রত্যর্পণ এবং বিচারসংক্রান্ত কিছু বিষয়কে তারা গুরুত্ব দিচ্ছে।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বার্তাও দিল ঢাকা
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র একই সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিবেশীসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অব্যাহত থাকবে।
এই বক্তব্যের মধ্যে একটি ভারসাম্যের বার্তা রয়েছে। একদিকে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ও রাষ্ট্রীয় সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতেও স্পষ্ট অবস্থান জানাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক যোগাযোগের ওপর নির্ভর করে না। বাণিজ্য, সীমান্ত, নিরাপত্তা, পানি, যোগাযোগ, জ্বালানি, বিচারিক সহযোগিতা এবং মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই সম্পর্কের বিস্তার রয়েছে। ফলে একটি উচ্চপর্যায়ের সফরের আগে সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে সমঝোতার জায়গা তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।













