Tarique Rahman BRICS Summit: পুতিন, শি জিনপিংসহ একঝাঁক রাষ্ট্রনেতা যখন দিল্লিমুখী, তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাচ্ছেন না কেন? শুধু সময়ের অভাব, নাকি শেখ হাসিনা ইস্যুতে নীরব কূটনৈতিক বার্তা দিচ্ছে ঢাকা? বিশেষ কলমে সুব্রত আচার্য
নয়াদিল্লিতে বসছে বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রনেতাদের বড় আসর। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হবে অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরান, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর ও ইন্দোনেশিয়াসহ একাধিক দেশের শীর্ষনেতার নাম সম্ভাব্য অতিথিদের তালিকায় রয়েছে।
কিন্তু এই তালিকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নাম এখনও নিশ্চিত নয়। বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা নেই।
তারেক রহমান না গেলে বাংলাদেশের হয়ে অন্য কোনও প্রতিনিধি ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে যোগ দেবেন কি না, সেটিও এখনও স্পষ্ট নয়।
প্রশ্ন তাই একটাই—এটি কি শুধুই সফরসূচির সমস্যা? নাকি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের উপস্থিতিকে সামনে রেখে শেখ হাসিনা ইস্যুতে দিল্লিকে নীরব কিন্তু কঠিন বার্তা দিতে চাইছে ঢাকা?
বাংলাদেশ থেকে কে আসছেন, জানে না দিল্লি (Tarique Rahman BRICS Summit)
বাংলাদেশ ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য নয়। তবে বাংলাদেশ বর্তমানে বিমসটেকের সভাপতি। সেই সূত্রে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পরে তাঁকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু সম্মেলনের মাত্র এক সপ্তাহ আগেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
প্রথম আলোর ৫ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪ সেপ্টেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাংবাদিক বৈঠকে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—তারেক রহমান কি ব্রিকসে আসছেন? তিনি না এলে বাংলাদেশের অন্য কোনও প্রতিনিধি কি যোগ দেবেন?
জয়সোয়াল জানান, এ বিষয়ে তাঁর কাছে নতুন কোনও তথ্য নেই। অর্থাৎ আয়োজক দেশ ভারত এখনও প্রকাশ্যে বলতে পারছে না, বাংলাদেশ থেকে কে এই সম্মেলনে যোগ দেবেন।
জাতিসংঘের আগে ভারত সফরের সম্ভাবনা নেই
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য সামনে এসেছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ৫ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিলেটে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনায় হুমায়ুন কবির বলেছেন, তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে সফরের দিন এখনও চূড়ান্ত হয়নি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে এই সফরের কোনও সম্ভাবনা নেই।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বাসসের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু কোনও দিন এখনও ঠিক হয়নি। প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মেটানোর কথাও বলেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
এই বক্তব্য সফরের অনিশ্চয়তায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ তারেক রহমানের ভারত সফর আটকে থাকার পিছনে এতদিন রাজনৈতিক টানাপোড়েনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছিল। এখন সময়সূচি এবং জাতিসংঘের অধিবেশনের প্রস্তুতিও সরকারি ব্যাখ্যার অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে এখানেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। তারেক রহমান নিজে না গেলেও বাংলাদেশের অন্য কোনও প্রতিনিধি ব্রিকসে যোগ দেবেন কি না—তার উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।
দিল্লিতে কারা আসছেন? (Tarique Rahman BRICS Summit)
এনডিটিভির ২৫ আগস্টের প্রতিবেদন বলছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সফরের কথা ক্রেমলিন জানিয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়েরও আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সফর হলে সাত বছর পরে ভারতে আসবেন শি।
সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো এবং বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো।
মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রীরাও যোগ দিতে পারেন। কিউবা, নাইজেরিয়া, উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তানের শীর্ষনেতাদের নামও আলোচনায় রয়েছে।
তবে সবাইকে নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা হয়নি। কারও সফর নিশ্চিত, কারও অংশগ্রহণ সম্ভাব্য। সম্মেলনের আগে তালিকা বদলাতেও পারে।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা দেশের ব্যস্ততার কারণে দিল্লিতে না-ও আসতে পারেন। তাঁর জায়গায় ব্রাজিলের বিদেশমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরা প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, উগান্ডা ও ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও বিকল্প প্রতিনিধিদের নাম সামনে এসেছে।
এখানেই বাংলাদেশের সঙ্গে পার্থক্য। অন্য কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান না এলেও তাঁদের সম্ভাব্য প্রতিনিধির পরিচয় জানা যাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী কিংবা বিকল্প প্রতিনিধি—কোনও নামই এখনও নিশ্চিত নয়।
সফরের পথে শেখ হাসিনা প্রশ্ন (Tarique Rahman BRICS Summit)
তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে জটিলতার পিছনে শেখ হাসিনা ইস্যুকে বাদ দেওয়া যাবে না।
গত ৫ আগস্ট দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়াল মাধ্যমে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। তিনি বাংলাদেশে ফেরার কথা বলেন এবং বর্তমান সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। বাংলাদেশ সরকার ওই ঘটনায় তীব্র আপত্তি জানায়।
ঢাকার অভিযোগ ছিল, ভারতের মাটি থেকে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে সক্রিয় বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অসম্মান। এতে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভারত অবশ্য জানিয়েছিল, সরকার ওই অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল না এবং শেখ হাসিনার বক্তব্যকে সমর্থনও করে না।
বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২১ আগস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা কম। ওই প্রতিবেদনে তারেক রহমানের প্রেসসচিব এ এ এম সালেহের সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যও উদ্ধৃত করা হয়।
সালেহ জানিয়েছিলেন, সফর নিয়ে তখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। শেখ হাসিনাসহ বাংলাদেশে চাওয়া অন্য ফেরারিদের বিষয়ে ঢাকা ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।
অর্থাৎ সফরের অনিশ্চয়তা শুধু সংবাদমাধ্যমের অনুমান ছিল না। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও সিদ্ধান্ত না হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
ঢাকার নীরবতা কি পরিকল্পিত? (Tarique Rahman BRICS Summit)
এই তথ্যগুলি একসঙ্গে রাখলে আমার বিশ্লেষণ হচ্ছে, ঢাকা সম্ভবত তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফরকে শুধুই সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং ছবি তোলার সফরে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না।
বাংলাদেশ হয়তো চাইছে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা, তাঁর প্রত্যর্পণ এবং অন্য ফেরারিদের বিষয়ে ভারত আগে কিছু স্পষ্ট সংকেত দিক। তারপরই হোক দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক।
তবে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বলেনি—শেখ হাসিনাকে ফেরত না দিলে তারেক রহমান ভারত যাবেন না। শুধু শেখ হাসিনা ইস্যুর কারণেই সফর হচ্ছে না, এমন দাবিও এখনও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সর্বশেষ বক্তব্য অনুযায়ী, সময়সূচিও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রাজনৈতিক দূরত্ব এবং আন্তর্জাতিক কর্মসূচি—দুই দিকই একসঙ্গে বিচার করতে হবে।
না গেলে ক্ষতি কার? (Tarique Rahman BRICS Summit)
তারেক রহমান না গেলে বাংলাদেশের সরকার দেশের মানুষকে বোঝাতে পারবে, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দিল্লির সামনে তাড়াহুড়ো করা হয়নি। সম্পর্কের প্রয়োজন আছে, কিন্তু বাংলাদেশের উদ্বেগ উপেক্ষা করে নয়।
আবার বাংলাদেশের ক্ষতিও কম নয়। মোদি, পুতিন, শি জিনপিংসহ বহু নেতার সঙ্গে একই মঞ্চে সরাসরি কথা বলার সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে। ব্রিকসের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হতে চাওয়া বাংলাদেশের জন্য এই মঞ্চ গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতেরও অস্বস্তি থাকবে। প্রতিবেশী-প্রথম নীতির কথা বলেও বিমসটেকের সভাপতিকে সম্মেলনে আনতে না পারলে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের বাস্তব অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
তবে হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য ভারতের জন্য একটি ব্যাখ্যার সুযোগও তৈরি করেছে। দিল্লি বলতে পারে, তারেক রহমানের সম্ভাব্য অনুপস্থিতি কেবল রাজনৈতিক দূরত্বের ফল নয়; বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কর্মসূচি ও সময়সূচিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
দিল্লি পদক্ষেপ করেও বরফ গলাতে পারল না?
এই ঘটনার আরও একটি দিক রয়েছে।
প্রথম আলোর ৩০ আগস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনার বক্তব্যের পরে দিল্লিতে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে নিয়ে আরও একটি আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়েছিল। দিল্লি পুলিশ সেই অনুষ্ঠানের অনুমতি দেয়নি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভারতের ওই সিদ্ধান্তকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ বলেছেন।
অর্থাৎ ঢাকার আপত্তির পরে দিল্লি একটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ করেছে। বাংলাদেশ সেটিকে স্বাগতও জানিয়েছে। তারপরও তারেক রহমানের সফরের জট খোলেনি।
এতেই বোঝা যায়, সমস্যা একটি অনুষ্ঠান আয়োজন বা বন্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, ভারত থেকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য এবং বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে দিল্লি কতটা মানিয়ে নিতে পারছে—মূল প্রশ্নগুলি আরও গভীরে।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য অনুপস্থিতি (Tarique Rahman BRICS Summit) ব্রিকসের সংখ্যার হিসাবে হয়তো বড় ঘটনা নয়। কিন্তু ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান দূরত্ব বোঝার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত।
আবার এটিকে শুধু রাজনৈতিক টানাপোড়েন বলেও ব্যাখ্যা করা যাবে না। বাংলাদেশের সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের আগে ভারত সফরের সময় নেই। ফলে সময়সূচি, আন্তর্জাতিক দায়িত্ব এবং কূটনৈতিক অবস্থান—সবকিছুকেই একসঙ্গে দেখতে হবে।
এখন নজর থাকবে দুটি বিষয়ে—বাংলাদেশ শেষ মুহূর্তে কোনও প্রতিনিধি পাঠায় কি না এবং জাতিসংঘের অধিবেশনের পরে তারেক রহমানের দিল্লি সফরের নতুন দিন ঠিক হয় কি না।
প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—বাংলাদেশ কি একটি বড় কূটনৈতিক সুযোগ হারাচ্ছে, নাকি না-এসেই শেখ হাসিনা ইস্যুতে ভারতকে আরও শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে?
লেখক প্রথম কলকাতার সম্পাদক ও প্রকাশক। ‘প্রাসঙ্গিক প্রসঙ্গ’ অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও বিশ্লেষক।
#TariqueRahmanBRICSSummit #TariqueRahman #BRICSSummit #BRICS #IndiaBangladeshRelations #BangladeshIndiaRelations #BangladeshPrimeMinister #TariqueRahmanIndiaVisit #IndiaVisit #SheikhHasinaIssue #BangladeshForeignPolicy #IndiaDiplomacy #SouthAsiaPolitics #BangladeshPolitics #BRICSLeaders













