Sudipa Chatterjee Pathshala: মাত্র ২৩ বছর বয়সে প্রায় ৩৫০ পথশিশুর দায়িত্ব নিয়েছেন কৃষ্ণনগরের সুদীপা চ্যাটার্জী। একসময় যাদের হাতে ছিল ভিক্ষার বাটি, আজ তাদের হাতে বই তুলে দিচ্ছেন তিনি। খাবার, পোশাক ও ওষুধের ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থায়ী বিদ্যালয় গড়ার স্বপ্নও দেখছেন এই তরুণী।
প্রথম কলকাতা: বয়স মাত্র ২৩। যে বয়সে নিজের পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ আর স্বপ্ন নিয়েই ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সেই প্রায় ৩৫০ পথশিশুর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন নদিয়ার কৃষ্ণনগরের তরুণী সুদীপা চ্যাটার্জী। এলাকার মানুষের কাছে তিনি এখন পরিচিত ‘বাচ্চা গ্যাংয়ের মা’ নামে। কারণ, যেসব শিশু একটা সময় রাস্তা, স্টেশন বা স্টেশনের পাশের বস্তিতে ঘুরে বেড়াত, কারও কাছে হাত পাতত, আজ তাদের হাতেই বই-খাতা তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন সুদীপা। শুধু পড়াশোনা নয়, শিশুদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, নতুন পোশাক, প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থা—নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সবকিছুই করার চেষ্টা করেন তিনি। আর এই পথচলার শুরু হয়েছিল আরও কয়েক বছর আগে, যখন নিজেই ছিলেন একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। মাত্র দু’টি শিশুকে খাবার দেওয়ার ঘটনা থেকেই জন্ম নেয় একটি বড় স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন আজ ৩৫০ শিশুর ভবিষ্যৎ বদলের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
দু’টি শিশুর জন্য খাবার কিনেই শুরু হয়েছিল পথচলা (Sudipa Chatterjee Pathshala)
সালটা ২০১৯। তখন সুদীপা চ্যাটার্জী একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। একদিন দু’টি শিশু তাঁর কাছে এসে ভিক্ষা চায়। সেই মুহূর্তে অন্যভাবে ভাবেন সুদীপা। হাতে টাকা তুলে না দিয়ে তিনি ওই শিশু দু’টির জন্য কেক ও বিস্কুট কিনে দেন। সামান্য খাবার পেয়ে শিশু দু’টির মুখে যে আনন্দ তিনি দেখেছিলেন, সেটাই গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল তাঁকে।
সুদীপার মনে প্রশ্ন জাগে, যে শিশুগুলির কাছে সামান্য খাবারও এত আনন্দের, তাদের জীবনে শিক্ষা, নিরাপত্তা আর স্বাভাবিক শৈশবের জায়গাটা কোথায়? আমরা অনেকেই প্রতিদিন দু’বেলা খাবার পাই, মাথার উপর ছাদ থাকে, স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাই। কিন্তু রাস্তার ধারে থাকা এই শিশুদের জীবন কতটা কঠিন, সেই বাস্তবতা অনেক সময় আমাদের চোখের সামনে থাকলেও আমরা তা অনুভব করি না।
সেদিন সুদীপা উপলব্ধি করেন, শুধু ভিক্ষা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। এই শিশুদের প্রয়োজন শিক্ষা এবং ভবিষ্যতের একটা পথ। সেই ভাবনা থেকেই স্টেশনের পাশের বস্তির প্রায় ৪০ জন শিশুকে নিয়ে শুরু হয় তাঁর নতুন উদ্যোগ।
৪০ জন থেকে আজ ৩৫০, নাম ‘বাচ্চা গ্যাং পাঠশালা’ (Sudipa Chatterjee Pathshala)
প্রথমে মাত্র ৪০ জন শিশুকে নিয়ে শুরু হয়েছিল পড়াশোনার ব্যবস্থা। ধীরে ধীরে সেই উদ্যোগের পরিসর বাড়তে থাকে। তৈরি হয় ‘বাচ্চা গ্যাং পাঠশালা’। একসময় যে সংখ্যাটা ছিল ৪০, তা বাড়তে বাড়তে আজ প্রায় ৩৫০ পড়ুয়ায় পৌঁছেছে।
এই শিশুদের অনেকেরই একটা সময় রাস্তা বা স্টেশনই ছিল পরিচিত জায়গা। কারও হাতে ছিল ভিক্ষার বাটি। কিন্তু সুদীপার উদ্যোগে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে বই-খাতা। পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের স্বাভাবিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
সুদীপার এই উদ্যোগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, তিনি শুধু শিক্ষক বা সংগঠকের ভূমিকা পালন করছেন না। শিশুদের প্রয়োজনের জায়গাগুলিও নিজের মতো করে পূরণ করার চেষ্টা করছেন। নিজের পকেটের টাকা বাঁচিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করেন। প্রয়োজন হলে নতুন জামাকাপড় কিনে দেন। ওষুধপত্রের প্রয়োজন হলেও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ান।
শুরুতে এই কাজ তিনি একাই করতেন। পরে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন আরও কিছু সহৃদয় তরুণ-তরুণী। দাদা-দিদির মতো তাঁরাও সুদীপার সঙ্গে হাত মিলিয়ে শিশুদের পড়াশোনা ও অন্যান্য প্রয়োজনের কাজে সহযোগিতা করছেন।
পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের মুখে খাবারও তুলে দেন
সুদীপার কাছে শিক্ষা মানে শুধু বইয়ের পাতায় পড়াশোনা নয়। যে শিশুর পেটে খাবার নেই, তার হাতে বই তুলে দিলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না—এই বাস্তবতাটিও তিনি বুঝেছেন।
তাই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী শিশুদের খাবারের ব্যবস্থাও করেন তিনি। নিজের পকেটমানি থেকে টাকা বাঁচিয়ে যতটা সম্ভব তাঁদের পাশে থাকার চেষ্টা করেন। কখনও খাবার, কখনও পোশাক, আবার কখনও ওষুধ—শিশুদের প্রয়োজন অনুযায়ী সাহায্য করার চেষ্টা চলে।
এই কাজের পিছনে বড় কোনও আর্থিক সংস্থা বা বিশাল পরিকাঠামো নেই। রয়েছে একজন তরুণীর ইচ্ছাশক্তি এবং তাঁর পাশে দাঁড়ানো কয়েকজন মানুষের সহযোগিতা। শুরুটা একেবারেই ছোট ছিল। কিন্তু সেই ছোট উদ্যোগই ধীরে ধীরে বড় হয়েছে।
যে শিশু একসময় রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে মানুষের কাছে খাবার চাইত, সেই শিশুর হাতে যদি আজ একটি বই থাকে, তাহলেই সুদীপার কাছে সেই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁর ভাবনায় শিক্ষাই এমন একটি পথ, যা একজন শিশুকে ভিক্ষার জীবন থেকে বেরিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিতে পারে।
নিজের পড়াশোনার মাঝেই এত শিশুদের দায়িত্ব (Sudipa Chatterjee Pathshala)
এই গল্পের সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের জায়গা সম্ভবত এখানেই। সুদীপা যখন এই কাজ শুরু করেন, তখন তিনি নিজেই পড়াশোনা করছিলেন। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার পাশাপাশি এতগুলো শিশুর দায়িত্ব নেওয়া মোটেই সহজ ছিল না।
একদিকে নিজের পড়াশোনা, অন্যদিকে পাঠশালার শিশুদের পড়ানো, তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা এবং অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা—সবকিছু সামলাতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু কাজটা ছেড়ে দেননি।
ক্রমে তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন তরুণ-তরুণী যুক্ত হন। ফলে একার উদ্যোগ ধীরে ধীরে একটি সামাজিক প্রয়াসের রূপ নেয়। আজ প্রায় ৩৫০ শিশুকে নিয়ে কাজ করার পিছনে তাই সুদীপার পাশাপাশি তাঁর সহযোগীদের ভূমিকাও রয়েছে।
সুদীপাদের মতো তরুণদের এই উদ্যোগ একটা বিষয় স্পষ্ট করে দেয়—মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সবসময় বড় অঙ্কের টাকা প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় প্রয়োজন হয় শুধু সমস্যাটাকে নিজের চোখে দেখা এবং অন্যভাবে ভাবার সাহস। সুদীপা সেই সাহসটাই দেখিয়েছেন।
স্বপ্ন এখন স্থায়ী বিদ্যালয়, বদলানোর চেষ্টা অনেক জীবনের (Sudipa Chatterjee Pathshala)
সুদীপার পথচলা এখানেই থেমে নেই। তাঁর এখনকার স্বপ্ন একটি স্থায়ী বিদ্যালয় তৈরি করা। এমন একটি জায়গা, যেখানে দুঃস্থ, অনাথ এবং পথশিশুরা নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ পাবে। একটি স্থায়ী পরিকাঠামোর মধ্যে থেকে তারা যেন শিক্ষার পাশাপাশি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েও স্বপ্ন দেখতে পারে, সেটাই তাঁর লক্ষ্য।
কারণ, একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া মানে শুধু তাকে পড়তে শেখানো নয়। তার সামনে অন্য একটি জীবনের দরজা খুলে দেওয়া। যে শিশু আজ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে মানুষের কাছে সাহায্য চাইছে, আগামী দিনে সেই শিশুই নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে—শিক্ষার মাধ্যমে সেই সম্ভাবনাটাই তৈরি করতে চান সুদীপা।
তাঁর এই উদ্যোগের গল্পে তাই শুধু আবেগ নেই, রয়েছে একটি বড় সামাজিক বার্তাও। সমাজের পিছিয়ে থাকা শিশুদের সামনে এগিয়ে আনতে শুধু সরকারি বা বড় প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকিয়ে থাকলেই হবে না। সমাজের সাধারণ মানুষ এবং বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মও যদি নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসে, তাহলে ছোট ছোট উদ্যোগ একসময় বড় পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।
সুদীপার গল্প সেই বিশ্বাসকেই আরও শক্ত করে। মাত্র ২৩ বছর বয়সে প্রায় ৩৫০ শিশুর দায়িত্ব নেওয়া সহজ কোনও কাজ নয়। নিজের পকেটের টাকা বাঁচিয়ে খাবার কিনে দেওয়া থেকে শুরু করে পড়াশোনার ব্যবস্থা করা—সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে মানুষের পাশে থাকার এক গভীর ইচ্ছা।
একদিন যে দু’টি শিশুর হাতে তিনি কেক আর বিস্কুট তুলে দিয়েছিলেন, সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয়েছিল এই যাত্রা। আজ সেই পথচলায় যুক্ত হয়েছে শত শত শিশু। ভিক্ষার বাটির বদলে হাতে বই তুলে দেওয়ার যে স্বপ্ন নিয়ে সুদীপা এগিয়েছিলেন, সেটাই এখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ।
তাঁর এই সাহসিকতা ও মানবিকতাকে কুর্নিশ। কারণ, সমাজ বদলের গল্প সবসময় বড় কোনও মঞ্চ থেকে শুরু হয় না। কখনও কখনও তার শুরু হয় একজন তরুণীর ছোট্ট একটি সিদ্ধান্ত থেকে—একটি শিশুকে টাকা না দিয়ে খাবার কিনে দেওয়ার মতো একটি ছোট সিদ্ধান্ত থেকেই।
#SudipaChatterjeePathshala #SudipaChatterjee #BacchaGangPathshala #BacchaGangMaa #Krishnanagar #Nadia #WestBengal #StreetChildrenEducation #RuralEducation #ChildEducation #UnderprivilegedChildren #EducationInitiative #SocialWork #WomenChangemakers #InspiringWomen #ChildWelfare #FreeEducation #HumanitarianWork














