SFI ABVP Clash at Jadavpur University: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ফের ছাত্র রাজনীতির সংঘাত ঘিরে উত্তেজনা ছড়াল। ফ্যাকাল্টি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সাধারণ সভা ঘিরে বুধবার গভীর রাত থেকে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত এসএফআই এবং এবিভিপির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনায় একাধিক পড়ুয়া আহত হয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে দক্ষিণ কলকাতার কেপিসি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বেড়েছে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে থানায় এফআইআর করেছে এবং বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসে বড়সড় প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। অর্থাৎ, একটি ছাত্র সংসদের সাধারণ সভাকে ঘিরে শুরু হওয়া উত্তেজনা এখন পৌঁছে গিয়েছে সরাসরি রাজনৈতিক সংঘাতের পর্যায়ে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ঘটনায় রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। দুই ছাত্র সংগঠনের বক্তব্যও সম্পূর্ণ ভিন্ন—এক পক্ষের দাবি, পরিকল্পিতভাবে হামলা ও ভাঙচুর হয়েছে; অন্য পক্ষের অভিযোগ, তাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
সাধারণ সভাকে ঘিরেই কীভাবে শুরু হল সংঘাত?
ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফ্যাকাল্টি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সাধারণ সভা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতিতে এই ধরনের সভা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ছাত্র সংগঠনগুলির সাংগঠনিক অবস্থান, নেতৃত্ব এবং ছাত্র প্রতিনিধিত্বের মতো বিষয় নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়। বুধবার রাতে সেই সভাকে কেন্দ্র করেই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্র সংগঠন এসএফআই এবং এবিভিপির মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিস্থিতি দ্রুত সংঘর্ষের আকার নেয়। ক্যাম্পাসে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও হামলার অভিযোগ ওঠে এবং কয়েকজন পড়ুয়া আহত হন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতের অন্ধকারে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পড়ুয়াদের একাংশের মধ্যেও।
এই ঘটনার তাৎপর্য শুধু কয়েকজন ছাত্রের আহত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গের ছাত্র রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে ক্যাম্পাসে দুই ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ছাত্র সংগঠনের সংঘর্ষ স্বাভাবিকভাবেই বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। ঘটনার পর দুই পক্ষের বক্তব্য আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই সংঘাতকে তাঁরা কেবল একটি সাধারণ ক্যাম্পাস-বিতর্ক হিসেবে দেখছেন না।
এসএফআইয়ের অভিযোগ কী?
ঘটনার পর এসএফআই-এর পক্ষ থেকে এবিভিপির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। তাদের দাবি, পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই এবিভিপি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। এসএফআইয়ের অভিযোগ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে বাইরের লোকজনকে এনে সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে এবং ক্যাম্পাসে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটানো হয়েছে।
এসএফআইয়ের সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্যের বক্তব্য অনুযায়ী, পুরো ঘটনার সঙ্গে এসএফআইয়ের কোনও যোগ নেই। তাঁর দাবি, তিনি যে তথ্য পেয়েছেন, তাতে এবিভিপির কর্মী এবং স্থানীয় বিজেপির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই ক্যাম্পাসে ভাঙচুরে জড়িত ছিলেন।
এসএফআইয়ের বক্তব্যে ছাত্র সংসদের নির্বাচন প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। সৃজন ভট্টাচার্য প্রশ্ন তুলেছেন, যদি এবিভিপি সত্যিই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়, তাহলে তারা নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে সেই ক্ষমতা অর্জনের পথে যাচ্ছে না কেন?
এই প্রশ্নটি ঘটনাটিকে আরও রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। অর্থাৎ এসএফআইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ছাত্র রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের জন্য সংঘর্ষ বা সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের বদলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেওয়া উচিত।
তবে এসএফআইয়ের এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এই প্রতিবেদনে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে এগুলিকে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের বক্তব্য হিসেবেই দেখা উচিত।
এবিভিপির পাল্টা অভিযোগ আরও গুরুতর
অন্যদিকে, এবিভিপি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি তুলে ধরেছে। তাদের অভিযোগ, সাধারণ সভার আড়ালে এবিভিপির পদাধিকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। এবিভিপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য শুভব্রত অধিকারীর দাবি, এই হামলার সঙ্গে শুধু এসএফআই কর্মীরাই যুক্ত ছিলেন না, বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির সঙ্গেও যুক্ত কয়েকজন পড়ুয়া এই ঘটনায় অংশ নিয়েছেন।
এবিভিপির বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের সংগঠনের প্রতিনিধিদের ওপর পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ করা হয়েছে এবং ঘটনাটি সাধারণ সভার স্বাভাবিক পরিবেশকে নষ্ট করেছে।
অভিযোগের আরও একটি দিক নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এবিভিপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, হামলায় যুক্ত কিছু ব্যক্তির সঙ্গে বামপন্থী চরমপন্থী সংগঠনের যোগ রয়েছে। তবে এই অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং এর পক্ষে কোনও স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদনে সামনে আসেনি। ফলে তদন্ত ছাড়া এই দাবিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ থেকেই স্পষ্ট, ঘটনার পর ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র হয়েছে। প্রত্যেক পক্ষই নিজেদের নির্দোষ এবং অন্য পক্ষকে হামলার জন্য দায়ী বলে দাবি করছে।
হাসপাতালে আহত পড়ুয়া, ঘটনাস্থলে রাজনৈতিক নেতারাও
সংঘর্ষের পরে আহত পড়ুয়াদের কয়েকজনকে কেপিসি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বৃহস্পতিবার সকালেও তাঁদের কয়েকজন সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এই খবর প্রকাশ্যে আসার পর ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে রাজনৈতিক তৎপরতাও শুরু হয়। যাদবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক সরবড়ী মুখোপাধ্যায় হাসপাতালে পৌঁছে আহত পড়ুয়াদের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র সংঘর্ষের পর হাসপাতালে রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতি ঘটনাটির রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, ছাত্র সংগঠনগুলির সংঘাত অনেক সময় বৃহত্তর রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।
তবে এই ঘটনায় প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপই এখন গুরুত্বপূর্ণ। দুই পক্ষ ইতিমধ্যেই যাদবপুর থানায় এফআইআর করেছে। অর্থাৎ অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশকে তদন্ত করে দেখতে হবে ঠিক কী ঘটেছিল, কারা সংঘর্ষে জড়িত ছিলেন এবং কার বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়।
এই ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। ফলে পুলিশের তদন্তের ফল না আসা পর্যন্ত কোনও পক্ষের অভিযোগকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।
পাল্টা কর্মসূচিতে আরও বাড়ছে উত্তেজনা
সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার বদলে আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসএফআই এবং এবিভিপি—দুই সংগঠনই বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বড়সড় প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা করেছে।
এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন উদ্বেগ। সংঘর্ষের পর যদি দুই পক্ষের পাল্টা কর্মসূচি একই সময়ে বা কাছাকাছি এলাকায় হয়, তাহলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনের কাছে তাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হল ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা এবং পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বিশেষ করে যাঁরা কোনও রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন, তাঁদের জন্য ক্যাম্পাসে এমন সংঘর্ষ অত্যন্ত উদ্বেগের। বিশ্ববিদ্যালয় মূলত পড়াশোনা, গবেষণা এবং মতবিনিময়ের জায়গা। ছাত্র রাজনীতি গণতান্ত্রিক পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও সেই রাজনীতি যদি শারীরিক সংঘর্ষে পরিণত হয়, তাহলে সাধারণ পড়ুয়াদের নিরাপত্তা এবং শিক্ষার পরিবেশ দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই ঘটনার ক্ষেত্রেও তাই তদন্তের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক সংগঠনগুলির কার্যকলাপ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
যাদবপুরে ছাত্র রাজনীতির পুরনো উত্তাপ, নতুন সংঘাতের বার্তা কী?
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিভিন্ন মতাদর্শের ছাত্র সংগঠন সক্রিয়। সেই কারণে রাজনৈতিক বিতর্ক, সংগঠনগুলির মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং ছাত্র সংসদকে ঘিরে মতবিরোধ নতুন কিছু নয়। কিন্তু মতবিরোধ যখন সংঘর্ষে গড়ায়, তখন তার প্রভাব ক্যাম্পাসের বাইরেও পড়ে।
বর্তমান ঘটনাতেও মূল প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে—একটি সাধারণ সভাকে ঘিরে কেন পরিস্থিতি এতটা উত্তপ্ত হয়ে উঠল? সভার অনুমতি, অংশগ্রহণ, নেতৃত্বের প্রশ্ন বা ছাত্র সংগঠনগুলির প্রভাব বিস্তার—কোন বিষয়টি সংঘাতের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল, তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে।
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে, ফ্যাকাল্টি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে এসএফআই এবং এবিভিপির মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দুই পক্ষই থানায় অভিযোগ করেছে এবং দুই সংগঠনই নিজেদের অবস্থানকে সঠিক বলে দাবি করছে।
ঘটনার তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে আরও পরিষ্কার হবে, বুধবার রাতের সংঘর্ষের প্রকৃত সূত্রপাত কোথায় এবং দায় কার। আপাতত দুই পক্ষের অভিযোগ, আহত পড়ুয়াদের চিকিৎসা, থানায় দায়ের হওয়া এফআইআর এবং বৃহস্পতিবারের ঘোষিত প্রতিবাদ কর্মসূচিই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
#SFI #ABVP #JadavpurUniversity #JadavpurUniversityClash #KolkataNews #StudentPolitics #WestBengal #CampusClash #FETSU #StudentUnion














