Murshidabad Level Crossing Accident: মুর্শিদাবাদের একটি লেভেল ক্রসিংয়ে মুহূর্তের ভুলে নিভে গেল পাঁচটি প্রাণ। স্কুল পড়ুয়াদের নিয়ে যাওয়া একটি পুলকারে লোকাল ট্রেনের ধাক্কায় চার স্কুলছাত্রী এবং এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন পুলকারের চালক-সহ একাধিক পড়ুয়া। ঘটনার পর থেকেই উঠে আসছে একের পর এক প্রশ্ন—রেলগেটে গেটম্যান উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ঘটল এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা?
প্রথম ট্রেন যাওয়ার পরই খুলে দেওয়া হয় রেলগেট
প্রাথমিক তদন্ত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, প্রথমে ডাউন লাইনে একটি নবদ্বীপ–মালদা লোকাল ট্রেন নিরাপদে পার হয়ে যায়। সেই ট্রেন চলে যাওয়ার পর লেভেল ক্রসিংয়ের গেট খুলে দেওয়া হয়।
ঠিক সেই সময় স্কুল পড়ুয়াদের নিয়ে একটি পুলকার এবং সাইকেলে চেপে মাঠে কাজে যাওয়া ৫৪ বছর বয়সী এক কৃষক রেললাইন পার হতে শুরু করেন। অভিযোগ, তখনই বিপরীত দিক থেকে দ্রুতগতিতে খাগড়াঘাট–সালারগামী নিমতিতা–কাটোয়া লোকাল ট্রেন চলে আসে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ট্রেনটি পুলকারের বাঁদিকে সজোরে ধাক্কা মারে। ধাক্কার জেরে গাড়িটি প্রায় ১০ মিটার দূরে ছিটকে পড়ে।
চার স্কুলছাত্রী-সহ পাঁচজনের মৃত্যু
দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই দুই স্কুলছাত্রীর মৃত্যু হয়। একইসঙ্গে প্রাণ হারান সাইকেলে থাকা কৃষক। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে আরও দুই স্কুলছাত্রীর মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন পুলকারের চালক এবং আরও কয়েকজন পড়ুয়া। চালকের হাত ভেঙেছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে। কয়েকজন পড়ুয়া প্রথমে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরলেও পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁদেরও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
গেটম্যান গ্রেফতার, সাসপেন্ড রেলের কর্মী
ঘটনার পর ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা গেটম্যানকে ঘিরে ফেলেন। পরে পুলিশ এসে তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। রেল কর্তৃপক্ষও তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে সাসপেন্ড করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর পুলিশ গ্রেফতার করেছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি কার্যত নীরব ছিলেন বলে পুলিশ সূত্রের দাবি।
অবহেলার অভিযোগ, তবে তদন্ত এখনও চলছে
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ওই গেটম্যান অতীতেও একাধিকবার দায়িত্বে অবহেলা করেছেন। এমনকি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ডিউটি করার অভিযোগও উঠেছে। তবে এই অভিযোগগুলির সরকারি বা স্বাধীনভাবে এখনও কোনও নিশ্চিত প্রমাণ সামনে আসেনি। তদন্তকারীরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।
রেল ও পুলিশের যৌথ তদন্ত
দুর্ঘটনার পর রেল পুলিশ, আরপিএফ এবং রেলের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে, সংগ্রহ করা হয়েছে বিভিন্ন নমুনাও।
তদন্তে মূলত কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে—
প্রথম ট্রেন চলে যাওয়ার পর কেন রেলগেট খুলে দেওয়া হয়েছিল?
দ্বিতীয় ট্রেন আসার তথ্য কি গেটম্যানের কাছে ছিল?
সিগন্যালিং বা যোগাযোগ ব্যবস্থায় কোনও ত্রুটি ছিল কি না?
মানবিক ভুল নাকি প্রযুক্তিগত ত্রুটি—কোনটি এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী?
ক্ষতিপূরণের ঘোষণা
মুর্শিদাবাদের মর্মান্তিক রেল দুর্ঘটনা নিয়ে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং বেদনাদায়ক ঘটনা। দুর্ঘটনায় যাঁদের মৃত্যু হয়েছে, বিশেষ করে চার স্কুলছাত্রী-সহ পাঁচজনের পরিবারের প্রতি তিনি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছেন।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, নিহত শিশুদের বাবা-মা এবং পরিবারের এই অপূরণীয় ক্ষতির সময় রাজ্য সরকার তাঁদের পাশে রয়েছে। তিনি প্রশাসন এবং রেল কর্তৃপক্ষকে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, রাজ্যের মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ ইতিমধ্যেই হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন বলেও জানান। পাশাপাশি রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রীও ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছেন, যাতে আহতদের চিকিৎসায় কোনও ধরনের গাফিলতি না হয়।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ঘটনার পরপরই রাজ্য পুলিশ অভিযুক্ত গেটম্যানকে গ্রেফতার করেছে এবং তদন্ত শুরু হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষও পৃথকভাবে ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখছে।
ক্ষতিপূরণের বিষয়েও ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের ঘোষণা অনুযায়ী রেল মন্ত্রক মৃতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেবে। এছাড়াও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যেক মৃতের পরিবারকে ৫ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। আহতদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাজ্য সরকার বহন করবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে কোনওরকম আপস করা হবে না এবং তদন্তে দোষ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়
প্রাথমিক তথ্য থেকে অনুমান করা হচ্ছে, প্রথম ট্রেন পার হওয়ার পর রেলগেট খুলে দেওয়ায় স্কুলগাড়িটি রেললাইন পার হতে যায় এবং সেই সময় উল্টো দিক থেকে আসা দ্বিতীয় ট্রেনের ধাক্কায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। তবে রেল কর্তৃপক্ষ এখনও কোনও নির্দিষ্ট কারণকে চূড়ান্ত বলে ঘোষণা করেনি। গেটম্যানের ভূমিকা, সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা প্রোটোকল—সব দিক খতিয়ে দেখেই তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে।

