Indian Farmers Protest: ভারত-মার্কিন প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতা করে দিল্লিতে কৃষক মহাপঞ্চায়েতে যোগ দিতে পাঞ্জাব থেকে রওনা হওয়া শত শত কৃষককে হরিয়ানা সীমান্তের শম্ভুতে আটকে দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার দিল্লির উদ্দেশে কৃষকদের এই যাত্রা শুরু হলেও শম্ভু সীমান্তে হরিয়ানা পুলিশের ব্যারিকেডের মুখে পড়ে তাঁদের অগ্রযাত্রা থেমে যায়। পরিস্থিতি ২০২৪ সালের কৃষক আন্দোলনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। সেই সময়ও পাঞ্জাব-হরিয়ানা সীমান্ত কার্যত দুর্গে পরিণত হয়েছিল।
দিল্লিতে প্রবেশের অনুমতি না পেয়ে কৃষকেরা শম্ভু সীমান্ত এলাকাতেই প্রতিবাদ শুরু করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, দিল্লিতে শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। তবে পরে হরিয়ানা সরকারের তরফে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আশ্বাস পাওয়ার পর কৃষকেরা সীমান্ত এলাকা থেকে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কৃষক নেতাদের দাবি, হরিয়ানায় আজ যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁদের মুক্তি এবং কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতায় কৃষকদের মহাপঞ্চায়েত
দিল্লিতে প্রস্তাবিত কৃষক মহাপঞ্চায়েতের মূল উদ্দেশ্য হল ভারত ও আমেরিকার মধ্যে আলোচনাধীন বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতা করা। ‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’-র ব্যানারে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং হিমাচল প্রদেশের বিভিন্ন কৃষক সংগঠন একত্রিত হওয়ার ডাক দিয়েছে।
কৃষক নেতাদের বক্তব্য, প্রস্তাবিত চুক্তিটি শুধুমাত্র সাধারণ বাণিজ্যিক সমঝোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষি, দুগ্ধশিল্প, শিল্প, ডিজিটাল বাণিজ্য, অনলাইন বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সরকারি ক্রয়, মেধাস্বত্ব এবং পরিষেবা ক্ষেত্রের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এর আওতায় আসতে পারে। ফলে এই চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভারতের কৃষক ও গ্রামীণ অর্থনীতির উপর পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
কৃষক সংগঠনগুলির দাবি, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত ও আমেরিকার যৌথ বিবৃতিতে ২০২৬ সালের শরৎকালের মধ্যে একটি বহুখাতভিত্তিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির প্রথম পর্যায়ের বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটেই কৃষক সংগঠনগুলি চুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
শম্ভু সীমান্তে ব্যারিকেড, আটকে গেল পাঞ্জাবের কৃষকদের মিছিল
মঙ্গলবার পাঞ্জাবের বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকদের একাধিক দল দিল্লির উদ্দেশে রওনা হয়। কিন্তু হরিয়ানার প্রবেশপথ শম্ভু সীমান্তে পৌঁছতেই তাঁদের পথ আটকে দেওয়া হয়। সীমান্তে পুলিশি ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছিল। পরিস্থিতি দেখে ২০২৪ সালের কৃষক আন্দোলনের স্মৃতি নতুন করে সামনে আসে, যখন কৃষকদের দিল্লিমুখী মিছিল ঠেকাতে সীমান্ত এলাকায় কংক্রিটের ব্লক, লোহার কাঁটা এবং একাধিক স্তরের ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছিল।
এবারও সীমান্তে কৃষকদের অগ্রযাত্রা থেমে যাওয়ার পর সেখানে প্রতিবাদের পরিবেশ তৈরি হয়। ভারতীয় কিষান ইউনিয়নের এক নেতা তেজবীর সিং অভিযোগ করেন, হরিয়ানা পুলিশ পাঞ্জাবের ভূখণ্ডের ভেতরেও ব্যারিকেড তৈরি করেছে। একইসঙ্গে তাঁর অভিযোগ, পাঞ্জাব সরকার এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।
তবে পাঞ্জাবের কৃষকদের মিছিল আটকে গেলেও হরিয়ানার আম্বালা, কুরুক্ষেত্র এবং আশপাশের এলাকার কৃষকদের একটি অংশ দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা অব্যাহত রাখেন বলে জানা গিয়েছে।
দুই দাবিতে আশ্বাস, সীমান্ত থেকে ফিরে গেলেন কৃষকেরা
শম্ভু সীমান্তে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার পর কৃষক নেতাদের সঙ্গে প্রশাসনের আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হয়। পরে হরিয়ানা সরকারের তরফে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দাবির বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হলে কৃষকেরা সীমান্ত এলাকা থেকে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কৃষকদের পক্ষ থেকে মূলত দাবি তোলা হয়েছিল, মঙ্গলবার হরিয়ানায় যেসব কৃষক সংগঠনের নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁদের মুক্তি দিতে হবে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের সঙ্গে কৃষক নেতাদের বৈঠকের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রশাসনের তরফে এই দুই বিষয়ে আশ্বাস পাওয়ার পরই কৃষকেরা দিল্লির দিকে অগ্রসর হওয়ার কর্মসূচি আপাতত স্থগিত করে ফিরে যান।
তবে কৃষক সংগঠনগুলির বক্তব্যে স্পষ্ট, তাঁদের মূল আন্দোলনের বিষয় এখনও অমীমাংসিত। প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে তাঁদের আপত্তি এবং কৃষি ও দুগ্ধশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
আমেরিকার কৃষিপণ্যের প্রবেশ নিয়ে বড় আশঙ্কা কৃষক সংগঠনগুলির
কৃষক নেতাদের আশঙ্কা, প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তির ফলে আমেরিকার ভর্তুকিপ্রাপ্ত কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য ভারতের বাজার আরও উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে। এর ফলে দেশের ছোট ও প্রান্তিক কৃষকেরা বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারেন।
কৃষক সংগঠনগুলির দাবি, অতীতের বিভিন্ন মার্কিন বাণিজ্য সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ভারতের কৃষি ও দুগ্ধ বাজারে আরও বেশি প্রবেশাধিকার, কম শুল্ক এবং বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ শিথিল করার বিষয় উঠে এসেছে। সয়াবিন, ভুট্টা, তুলো, ইথানল, আপেল, বাদাম, দুগ্ধজাত পণ্য, মুরগির মাংস এবং মৎস্যজাত পণ্যের মতো ক্ষেত্রগুলি নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে।
কৃষক নেতাদের বক্তব্য, যদি কম দামে আমেরিকার ভর্তুকিপ্রাপ্ত কৃষিপণ্য ভারতীয় বাজারে ঢোকে, তাহলে দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজারদরের প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এর প্রভাব শুধু কৃষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, গ্রামীণ অর্থনীতির উপরও তার বড় প্রভাব পড়তে পারে।
শুধু কৃষক নয়, গ্রামীণ অর্থনীতির বড় অংশ নিয়ে উদ্বেগ
কৃষক সংগঠনগুলি বিশেষভাবে ভারতের দুগ্ধশিল্প নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাঁদের দাবি, দেশের দুগ্ধখাতের সঙ্গে প্রায় আট কোটি গ্রামীণ পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে এই ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তার প্রভাব বহু পরিবারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কৃষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, দুগ্ধ উৎপাদকদের পাশাপাশি ছোট ব্যবসায়ী, কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ক্ষেত্র এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলিও এর প্রভাবের মুখে পড়তে পারে। অর্থাৎ, প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তিকে তাঁরা শুধুমাত্র কৃষকদের সমস্যা হিসেবে দেখছেন না। তাঁদের মতে, এই চুক্তির সঙ্গে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি এবং ক্ষুদ্র উৎপাদকদের ভবিষ্যৎও জড়িয়ে রয়েছে।
এই কারণেই কৃষক সংগঠনগুলি চুক্তির আলোচনায় আরও স্বচ্ছতা দাবি করেছে। তাঁদের অভিযোগ, প্রস্তাবিত চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি এখনও সাধারণ মানুষের সামনে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে চুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে কৃষক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
চুক্তির নথি প্রকাশের দাবি, সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান
‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’-র পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে একাধিক দাবি জানানো হয়েছে। কৃষক সংগঠনগুলি চায়, প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত নথি অবিলম্বে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক।
তাঁদের আরও দাবি, কৃষক, শ্রমিক, দুগ্ধ উৎপাদক, ছোট ব্যবসায়ী এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা না করে কোনও চুক্তি স্বাক্ষর করা উচিত নয়। কৃষক নেতাদের বক্তব্য, একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির প্রভাব যদি দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে পড়ে, তাহলে সেই চুক্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট মানুষের মতামত জানা জরুরি।
শম্ভু সীমান্তে কৃষকদের মিছিল আটকে যাওয়া এবং পরে প্রশাসনের আশ্বাসে তাঁদের ফিরে আসার ঘটনা আপাতত পরিস্থিতিকে শান্ত করেছে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কৃষক সংগঠনগুলির আপত্তি এবং উদ্বেগ এখনও বহাল রয়েছে। আগামী দিনে কেন্দ্রীয় সরকার কৃষক সংগঠনগুলির সঙ্গে কীভাবে আলোচনা করে এবং তাঁদের দাবির বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
#IndianFarmersProtest #FarmersMarch #ShambhuBorder #KisanMahapanchayat #FarmerProtest #PunjabFarmers #Haryana #AgriculturalTrade #DairySector #DeshBachaoMorcha
