চিকিৎসার শহরে ‘জতুগৃহ’! ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রশ্নের মুখে হোটেল নিরাপত্তা, বাংলাদেশি রোগীদের ঘিরে উঠছে একাধিক প্রশ্ন

Free School Street Fire in Kolkata near a hotel area associated with medical tourists from Bangladesh

Free School Street Fire: কলকাতায় চিকিৎসার জন্য এসে থাকার জায়গা খুঁজেছিলেন তাঁরা। হাসপাতালের কাছাকাছি, কম খরচে, পরিবারের সঙ্গে কয়েকটা রাত কাটানোর জন্য বেছে নিয়েছিলেন একটি হোটেল। কিন্তু রাতের ঘুম আর ভোরের আলো—দুটির মাঝেই বদলে গেল সবকিছু। ১৯ আগস্ট ২০২৬, ভোর পৌনে ২টা নাগাদ মির্জা গালিব স্ট্রিটের ১৫এইচ নম্বর বাড়িতে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, মৃতদের মধ্যে রয়েছেন ছয় জন পুরুষ, দুই জন মহিলা এবং চার বছরের একটি শিশু। অধিকাংশই বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় চিকিৎসার জন্য আসা রোগী ও তাঁদের পরিজন বলে জানা যাচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, আগুনের আঁচে নয়, ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়েই বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে। সরু সিঁড়িঘর, পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের অভাব এবং দ্রুত ধোঁয়ায় ভরে যাওয়া পথই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল বলে উঠে আসছে। মাত্র কয়েক দিন আগেই তারাপীঠে একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে ন’জনের মৃত্যুর ঘটনার পর ফের কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে এমন বিপর্যয় প্রশ্ন তুলেছে—হোটেল, লজ ও অতিথিশালাগুলিতে অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা আদৌ কতটা কার্যকর?

ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে রাতের আগুন, ঘুমন্ত মানুষকে ঘিরে ভয়াবহ পরিস্থিতি

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট ভোররাতে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি বহুতল ভবনে আগুন লাগে। ওই ভবনের ওপরের তলাগুলিতে তখন বহু মানুষ ঘুমিয়ে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন বলে জানা যাচ্ছে।

রাতের অন্ধকারে আগুন লাগার বিষয়টি বুঝতে না পারায় অনেকেই সময়মতো নিচে নামতে পারেননি। আগুনের সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়া দ্রুত সিঁড়িঘর এবং বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নিচে নামার পথই অনেকের কাছে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

প্রাথমিকভাবে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। অর্থাৎ আগুনের শিখা সরাসরি শরীরে পৌঁছনোর আগেই বিষাক্ত ও ঘন ধোঁয়া ঘুমন্ত মানুষদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।

এই ধরনের ঘটনায় জরুরি বহির্গমন পথ, বিকল্প সিঁড়ি, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল এবং কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা ফের সামনে এসেছে এই দুর্ঘটনায়।

‘নিউ বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত এলাকায় কেন এত বাংলাদেশি রোগীর ভিড়?

ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট, সাডার স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট এবং মির্জা গালিব স্ট্রিট—নিউ মার্কেট সংলগ্ন এই বিস্তীর্ণ এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষদের কাছে পরিচিত। স্থানীয়ভাবে এই অঞ্চলকে অনেক সময় ‘নিউ বাংলাদেশ’ নামেও উল্লেখ করা হয়।

এর অন্যতম কারণ চিকিৎসা পরিষেবা। ভাষাগত ও ভৌগোলিক সুবিধার কারণে বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন। কলকাতার বিভিন্ন হাসপাতাল, চিকিৎসক, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কেন্দ্র এবং ওষুধের বাজারকে ঘিরে এই এলাকায় গড়ে উঠেছে হোটেল, লজ, রেস্তোরাঁ, ভ্রমণ পরিষেবা এবং মুদ্রা বিনিময়ের মতো একাধিক ব্যবসা।

ফলে এখানে থাকার জায়গাগুলির একটি বড় অংশের উপর নির্ভর করেন চিকিৎসার জন্য আসা রোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর সঙ্গে থাকেন বয়স্ক বাবা-মা, শিশু কিংবা অন্যান্য পরিজন।

এমন পরিস্থিতিতে হোটেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শুধু পর্যটকের জন্য নয়, সরাসরি রোগী ও তাঁদের পরিবারের জীবনের সঙ্গে যুক্ত। অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে অসুস্থ বা বয়স্ক মানুষ দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নামতে পারবেন কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন।

কম খরচের থাকার জায়গা, কিন্তু নিরাপত্তা কি যথেষ্ট?

চিকিৎসার খরচ সামলাতে গিয়ে বহু পরিবার থাকার ক্ষেত্রে কম খরচের হোটেল বা লজ বেছে নেন। হাসপাতালের কাছে থাকার সুবিধা এবং তুলনামূলক কম ভাড়া—এই দুই কারণেই এমন জায়গাগুলির চাহিদা তৈরি হয়।

কিন্তু এখানেই নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। কোনও ভবনে পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন পথ আছে কি না, সেই পথ খোলা রাখা হয় কি না, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কার্যকর কি না, বৈদ্যুতিক তারের অবস্থা কেমন, অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক চাপ নেওয়ার মতো পরিকাঠামো রয়েছে কি না—সাধারণ অতিথিদের পক্ষে এসব যাচাই করা প্রায় অসম্ভব।

অথচ একটি হোটেলে রাতে আগুন লাগলে প্রথম কয়েক মিনিটই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময়ে অতিথিরা যদি নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার পথ না পান, তাহলে একটি ছোট আগুনও দ্রুত বড় বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে।

ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ঘটনাতেও সরু ও ধোঁয়ায় ভরে যাওয়া সিঁড়িঘর নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ এবং ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোথায় কী ত্রুটি ছিল, তা তদন্তের পরই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব।

তারাপীঠের পর ফের অগ্নিকাণ্ড, প্রশ্ন উঠছে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে

ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের এই অগ্নিকাণ্ডের মাত্র কয়েক দিন আগে তারাপীঠে একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ন’জনের মৃত্যু হয়েছিল। সেই ঘটনায় হোটেলের অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা পরিকাঠামো নিয়ে প্রশাসনিকভাবে প্রশ্ন ওঠে।

তারাপীঠের ঘটনার পর রাজ্যের হোটেল, লজ, অতিথিশালা ও অন্যান্য আবাসিক প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা যাচাইয়ের কথা সামনে এসেছিল। সেই আবহেই কলকাতায় ফের এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু দুর্ঘটনার পরে পরিদর্শন করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? নাকি নিয়মিতভাবে প্রতিটি হোটেলের অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করা প্রয়োজন?

বিশেষ করে পুরনো বাড়ি বা সরু রাস্তার মধ্যে থাকা হোটেলগুলির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আগুন লাগলে দমকলের গাড়ি ঘটনাস্থলে কত দ্রুত পৌঁছতে পারবে, অতিথিরা কোন পথে বেরোবেন, বিকল্প সিঁড়ি রয়েছে কি না এবং বিদ্যুৎ সংযোগ নিরাপদ কি না—এসব বিষয় নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

চিকিৎসার জন্য আসা মানুষদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে ভাবার সময়

ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ঘটনা শুধুমাত্র একটি হোটেল অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কলকাতার চিকিৎসা-নির্ভর পর্যটন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি বড় বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে এটি।

বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য আসা মানুষদের অনেকেই কলকাতায় কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ থাকেন। তাঁদের থাকার জায়গা হাসপাতালের কাছাকাছি হওয়া জরুরি হয়ে ওঠে। সেই চাহিদাকে কেন্দ্র করে একটি সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক পরিকাঠামো তৈরি হয়েছে।

কিন্তু রোগী ও তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি সমান গুরুত্ব পাচ্ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

একজন সুস্থ পর্যটক আগুন লাগলে দ্রুত দৌড়ে বেরিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু একজন অসুস্থ রোগী, সদ্য অস্ত্রোপচার হওয়া ব্যক্তি, বৃদ্ধ মানুষ কিংবা ছোট শিশু একইভাবে বিপদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন না। ফলে চিকিৎসার জন্য আসা মানুষের থাকার জায়গায় সাধারণ হোটেলের তুলনায় আরও বেশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

তদন্তে কোন প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজা হবে?

এই অগ্নিকাণ্ডের পর স্বাভাবিকভাবেই বেশ কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসছে। আগুনের সূত্রপাত কোথায়? বৈদ্যুতিক ত্রুটি ছিল কি না? ভবনের বৈদ্যুতিক সংযোগ কতটা নিরাপদ ছিল? অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কার্যকর ছিল কি? জরুরি বহির্গমন পথ পর্যাপ্ত ছিল কি? সিঁড়িঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা ছিল কি? ভবনটিতে নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় বেশি মানুষ অবস্থান করছিলেন কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, আগুন লাগার পর অতিথিদের সতর্ক করার জন্য কোনও কার্যকর ব্যবস্থা ছিল কি না।

অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, মৃত্যুর সঠিক কারণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি সম্পর্কে চূড়ান্ত তথ্য তদন্ত শেষ হওয়ার পরই সামনে আসবে। তাই এই মুহূর্তে কোনও একটি কারণকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়ার পরিবর্তে প্রশাসনিক ও তদন্তকারী সংস্থার রিপোর্টের দিকে নজর রাখা জরুরি।

‘জতুগৃহ’ যেন আর না হয়, চাই নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা

তারাপীঠ থেকে ফ্রি স্কুল স্ট্রিট—পরপর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ফের মনে করিয়ে দিল, শুধু হোটেল তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সেখানে থাকা মানুষের জীবন রক্ষার জন্য নিয়মিত নিরাপত্তা পরিকাঠামোও নিশ্চিত করতে হয়।

বিশেষ করে নিউ মার্কেট ও সংলগ্ন এলাকায়, যেখানে বহু ছোট হোটেল, লজ ও অতিথিশালা রয়েছে এবং যেখানে চিকিৎসার জন্য আসা বিদেশি নাগরিকদের একটি বড় অংশ থাকেন, সেখানে অগ্নি-নিরাপত্তা নিয়ে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে।

একটি আগুন হয়তো কয়েক মিনিটের ঘটনা। কিন্তু সেই কয়েক মিনিটের গাফিলতির মূল্য দিতে হতে পারে বহু পরিবারকে সারাজীবন।

ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের এই ভয়াবহ ঘটনা তাই শুধু একটি রাতের দুর্ঘটনার গল্প নয়। এটি প্রশ্ন তুলছে—কলকাতা যে শহরে মানুষ চিকিৎসার আশায় আসেন, সেই শহরে হাসপাতালের বাইরের থাকার জায়গাগুলিও কি তাঁদের জন্য সমান নিরাপদ?

#FreeSchoolStreetFire #KolkataHotelFire #KolkataFire #HotelFireSafety #KolkataNews #WestBengal #MedicalTourism #BangladeshPatients #FireSafety #KolkataTragedy #NewMarketKolkata #HotelSafety

Exit mobile version