E20 Ethanol Blended Petrol: ভারতে পেট্রোলের সঙ্গে ইথানল মিশিয়ে জ্বালানি ব্যবহারের নীতি নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেন্দ্র সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী ধাপে ধাপে পেট্রোলে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল মিশিয়ে ব্যবহার করা হবে, যা ‘ই-২০’ জ্বালানি নামে পরিচিত। সরকারের দাবি, এই উদ্যোগ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াবে, বিদেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির উপর নির্ভরতা কমাবে এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। তবে এই নীতিকে ঘিরে একদিকে যেমন সমর্থন রয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ গাড়ি ব্যবহারকারী, অটোমোবাইল শিল্প এবং বিশেষজ্ঞদের একাংশের মধ্যে একাধিক প্রশ্ন ও উদ্বেগও সামনে এসেছে।
কেন ইথানল মেশানো হচ্ছে?
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারী দেশ। দেশের জ্বালানির চাহিদার বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করা তেলের উপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতে।
এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্র সরকার পেট্রোলের সঙ্গে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত ইথানল মিশিয়ে আমদানির খরচ কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। সরকারের মতে, ইথানল ব্লেন্ডিং বাড়ানো গেলে বছরে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দেশীয় কৃষিপণ্য ব্যবহার করে জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগও তৈরি হবে।
কৃষক ও পরিবেশ—দুই ক্ষেত্রেই লাভের দাবি
ইথানল মূলত আখ, ভুট্টা, ভাঙা চাল, নষ্ট বা অতিরিক্ত খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন কৃষিজাত উপাদান থেকে তৈরি করা হয়। ফলে কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের অতিরিক্ত বাজার তৈরি হবে এবং তাদের আয় বাড়তে পারে বলে মনে করছে সরকার।
পরিবেশগত দিক থেকেও ইথানলকে তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে দেখা হয়। জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় এটি কম কার্বন নির্গমন করে। ফলে বায়ুদূষণ কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এই নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে।
কোথায় তৈরি হচ্ছে বিতর্ক?
যদিও সরকারের এই উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে দেখা হচ্ছে, তবে এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, পুরোনো বা ই-২০ উপযোগী নয় এমন গাড়িতে বেশি মাত্রায় ইথানলযুক্ত পেট্রোল ব্যবহার করলে ইঞ্জিনের কিছু যন্ত্রাংশের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। বিশেষ করে রবার, প্লাস্টিক এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার কিছু অংশে ক্ষয় হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এছাড়া ইথানলের শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা সাধারণ পেট্রোলের তুলনায় কিছুটা কম হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই গাড়ির মাইলেজ সামান্য হ্রাস পেতে পারে বলে অটোমোবাইল বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত।
খাদ্য না জ্বালানি—কোনটি আগে?
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে খাদ্যশস্যের ব্যবহার নিয়ে। ইথানল উৎপাদনে যদি বিপুল পরিমাণ আখ, ভুট্টা বা অন্যান্য খাদ্যশস্য ব্যবহার করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে খাদ্য সরবরাহ ও মূল্যবৃদ্ধির উপর তার প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কিছু অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞ।
অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য, অতিরিক্ত বা উদ্বৃত্ত কৃষিপণ্য এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া শস্যকে কাজে লাগিয়েই মূলত ইথানল উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তাই খাদ্য নিরাপত্তার উপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম।
অটোমোবাইল শিল্পও প্রস্তুতি নিচ্ছে
ই-২০ জ্বালানির ব্যবহার বাড়ার সম্ভাবনা মাথায় রেখে দেশের বিভিন্ন গাড়ি নির্মাতা সংস্থা ইতিমধ্যেই ইথানল উপযোগী ইঞ্জিন তৈরির দিকে জোর দিচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অনেক গাড়িতেই ই-২০ জ্বালানি ব্যবহারের উপযোগী প্রযুক্তি যুক্ত করা হচ্ছে। তবে পুরোনো গাড়ির ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারক সংস্থার পরামর্শ মেনে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভারতের জ্বালানি নীতিতে ইথানল ব্লেন্ডিং একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একদিকে এটি আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতি শক্তিশালী করার চেষ্টা, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ। তবে একই সঙ্গে সাধারণ গাড়ি ব্যবহারকারীদের স্বার্থ, ইঞ্জিনের নিরাপত্তা, খাদ্যশস্যের ব্যবহার এবং বাস্তব প্রয়োগের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিতর্কও ক্রমশ বাড়ছে।
কেন্দ্র সরকারের দাবি, ই-২০ (২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত) পেট্রোল ব্যবহারে গাড়ির ইঞ্জিনের কোনও ক্ষতি হয় না। ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা দূর করতেই সরকার স্পষ্ট করেছে যে, ই-২০ উপযোগী গাড়িতে এই জ্বালানি নিরাপদে ব্যবহার করা যায়।
সরকারের মতে, ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল ব্যবহারে ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা স্বাভাবিক থাকে এবং গাড়ি মসৃণভাবেই চলাচল করে। তবে একটি বিষয় সরকার স্বীকার করেছে—খাঁটি পেট্রোলের তুলনায় মাইলেজ কিছুটা কমতে পারে, কারণ ইথানলের শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা পেট্রোলের তুলনায় সামান্য কম।
কেন্দ্রের আরও দাবি, ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহার করলে বায়ুদূষণ কমে, কার্বন নির্গমন হ্রাস পায় এবং বিদেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হয়। একই সঙ্গে দেশীয় কৃষকদের উৎপাদিত আখ, ভুট্টা ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের চাহিদাও বাড়বে, যা কৃষকদের আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
তবে সরকার আশ্বস্ত করলেও, সাধারণ গাড়িচালকদের একাংশের মধ্যে এখনও ইঞ্জিনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, মাইলেজ এবং পুরোনো গাড়িতে ই-২০ ব্যবহারের উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন ও উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। ফলে ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল নিয়ে আলোচনা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
#E20Petrol #EthanolBlendedPetrol #FuelPolicy #GreenFuel #AutoNews #Petrol #IndiaNews #VehicleEngine #FuelEfficiency #Ethanol
