ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত সফর কি করবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান? সিদ্ধান্ত এখনও অনিশ্চিত

Bangladesh Prime Minister Tarique Rahman at BRICS Summit amid India Bangladesh diplomatic developments

Bangladesh Prime Minister Tarique Rahman BRICS Summit: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর ঘিরে নতুন করে কূটনৈতিক জল্পনা তৈরি হয়েছে। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। এই সম্মেলনের বিভিন্ন সম্প্রসারিত বৈঠকে অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তারেক রহমানের ভারত সফর এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকসের সদস্য হিসেবে নয়, বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে সম্মেলনের সম্প্রসারিত অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে আলাদাভাবে ভারত সফরের আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে। কিন্তু সেই সফর নিয়ে ঢাকা এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি।

ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ, কিন্তু কেন এত জল্পনা?

২০২৬ সালে ব্রিকসের সভাপতিত্ব করছে ভারত। ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে চলা এই সম্মেলনের মূল ভাবনা নির্ধারিত হয়েছে স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নকে কেন্দ্র করে। সম্মেলনের সম্প্রসারিত অধিবেশনে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানোর রীতি রয়েছে। সেই সূত্রেই বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী অবশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই আমন্ত্রণকে সরাসরি তারেক রহমানের জন্য ব্রিকসের আমন্ত্রণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে সম্প্রসারিত অধিবেশনে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশের নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই তারেক রহমানকে ভারত সফরের জন্য পৃথক আমন্ত্রণ পাঠিয়েছিলেন।

ভারত সফর নিয়ে ঢাকার অবস্থান কী?

তারেক রহমান ভারত সফর করবেন কি না—এই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভারত সফরের বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকেও এই প্রসঙ্গ উঠে আসতে পারে বলে আলোচনা হয়েছিল। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রস্তাবিত ভারত সফর নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

এই অনিশ্চয়তা এমন একটি সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছে। তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া ও চিনকে বেছে নিয়েছিলেন। ভারতের বদলে ওই দুই দেশকে প্রথম সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া নয়াদিল্লির কূটনৈতিক মহলে বিশেষ নজর কেড়েছিল।

চিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, ভারতের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশের নতুন সরকারের বিদেশনীতি এখন আরও বহুমুখী অংশীদারত্বের দিকে এগোচ্ছে। তারেক রহমানের সরকার একদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইছে, অন্যদিকে চিনের সঙ্গেও অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি চিন সফরে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য, পরিকাঠামো, প্রতিরক্ষা এবং তিস্তা প্রকল্প নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। চিন বাংলাদেশের ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার অংশীদার হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকেও সমর্থন করেছে।

এই পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফর হলে তা শুধু একটি আনুষ্ঠানিক সফর হিসেবে দেখা হবে না। বরং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ বোঝার ক্ষেত্রেও সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে সীমান্ত, নদীর জল, বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয় দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখা ভারতের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।

শেখ হাসিনাকে ঘিরে জটিলতা এখনও কাটেনি

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের আরেকটি বড় স্পর্শকাতর বিষয় হল বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠকের সময়ও বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়টি ফের উত্থাপন করেছে। ঢাকার পক্ষ থেকে ভারতকে এই প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

ফলে তারেক রহমানের ভারত সফর হলে দুই দেশের মধ্যে একাধিক কঠিন বিষয় আলোচনার টেবিলে আসতে পারে। তবে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠককে ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং ভবিষ্যতমুখী বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, দুই দেশের মধ্যে সমস্যা থাকলেও বৃহত্তর লক্ষ্য হওয়া উচিত সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা।

সীমান্ত ও গঙ্গার জল—আরও বড় পরীক্ষা সামনে

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, অসম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত সরাসরি যুক্ত। ফলে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক যেমনই হোক, ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

এর পাশাপাশি গঙ্গার জল বণ্টন চুক্তিও সামনে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে চলেছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা। ফলে চুক্তির নবীকরণ নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনা আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, লবণাক্ততা এবং পরিবেশ—একাধিক ক্ষেত্রেই এই চুক্তির প্রভাব রয়েছে।

এখন বড় প্রশ্ন—নয়াদিল্লি আসছেন কি তারেক রহমান?

এই মুহূর্তে উত্তর হল—সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। ব্রিকসের সম্প্রসারিত অধিবেশনে বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পক্ষ থেকে পৃথক ভারত সফরের আমন্ত্রণও রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সরকার এখনও সফরের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।

তাই আগামী কয়েক সপ্তাহে ঢাকার সিদ্ধান্তের দিকে নজর থাকবে দিল্লির। তারেক রহমান শেষ পর্যন্ত নয়াদিল্লিতে এলে ব্রিকসের মঞ্চের পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর তিনি সফর না করলে, তার পিছনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বর্তমান কূটনৈতিক ভারসাম্যের কী ভূমিকা রয়েছে, সেটিও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে।

#TariqueRahman #BRICSSummit #Bangladesh #IndiaBangladeshRelations #BangladeshPolitics #SouthAsia #BRICS #ForeignPolicy #India #BangladeshNews

Exit mobile version