Saima Wazed Resigns WHO: শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের তদন্তের মধ্যে দীর্ঘদিন বেতনহীন ছুটিতে থাকার পর তাঁর এই পদত্যাগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
প্রথম কলকাতা: বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পদত্যাগ করলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে। একাধিক আর্থিক অনিয়ম, যোগ্যতা সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে অভিযোগ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের তদন্তের মধ্যেই বুধবার তাঁর পদত্যাগের কথা জানা গিয়েছে। রয়টার্সের দেখা পদত্যাগপত্র অনুযায়ী, প্রায় এক বছর বেতনহীন ছুটিতে থাকার পর সংস্থার নেতৃত্বের উপর আস্থা হারানোর কথা জানিয়ে পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন সায়মা।
সায়মা ওয়াজেদ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত এই পদে তাঁর মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত চলার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযোগের পর তাঁকে বেতনহীন ছুটিতে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তরফেও তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযোগ কী ছিল? Saima Wazed Resigns WHO
বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন ২০২৫ সালের মার্চে সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে জালিয়াতি, জাল নথি ব্যবহার এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে মামলা করে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অভিযোগের একটি অংশ ছিল, শেখ হাসিনার প্রভাব ব্যবহার করে সায়মা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের শীর্ষ পদে পৌঁছেছিলেন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কেও ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই পদে সায়মার নিয়োগ অবশ্য আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াতেই হয়েছিল। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সদস্য দেশগুলির বৈঠকে তাঁকে এই পদের জন্য মনোনীত করা হয় এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কার্যনির্বাহী পর্ষদ তাঁকে নিয়োগ দেয়। ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তিনি দায়িত্ব নেন।
তবে তাঁর নিয়োগের প্রক্রিয়া ঘিরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ পরবর্তীকালে তদন্তের অংশ হয়ে ওঠে। সায়মা অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, যোগ্যতা সংক্রান্ত যে অভিযোগ করা হয়েছে, সেখানে তাঁর একটি সম্মানসূচক ডিগ্রিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
চিন সফরের টাকা নিয়ে কী অভিযোগ উঠেছিল? Saima Wazed Resigns WHO
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তদন্তে সায়মা ওয়াজেদের চিন সফর সংক্রান্ত আর্থিক বিষয়ও উঠে আসে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংস্থার পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে চিন সফরের সঙ্গে যুক্ত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছিল। সায়মার আইনজীবীরা অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সায়মার বক্তব্য অনুযায়ী, সফরের টাকা ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়ায় তাঁর এক সহকারীর প্রশাসনিক ভুলের কারণে সমস্যাটি তৈরি হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, বিষয়টি ছিল মাত্র ৯০১ মার্কিন ডলারের একটি অর্থ ফেরত সংক্রান্ত বিষয় এবং এতে তাঁর ব্যক্তিগতভাবে কোনও আর্থিক প্রতারণার উদ্দেশ্য ছিল না।
অর্থাৎ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তদন্তে যে অভিযোগ উঠেছে, সেটিকে সায়মা সরাসরি দুর্নীতি হিসেবে মেনে নেননি। বরং প্রশাসনিক ভুল হিসেবেই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। তাই পদত্যাগের খবর সামনে এলেও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলি প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা ঠিক হবে না। তদন্ত চলাকালীনই তিনি পদ ছেড়েছেন।
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও জমি নিয়েও অভিযোগ
সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগও তদন্তের অংশ ছিল। তাঁর আইনজীবীদের চিঠিতে সায়মা জানান, তাঁর যে সম্মানসূচক ডিগ্রি রয়েছে, সেটি বাংলাদেশে প্রতিবন্ধকতা ও স্বায়ত্তশাসন-সংক্রান্ত কাজের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়েছিল এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসকে এই যোগ্যতা সম্পর্কে তিনি জানিয়েছিলেন।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশে একটি জমি বেআইনিভাবে অধিগ্রহণের অভিযোগও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তদন্তে উঠে আসে। সায়মা তাঁর পদত্যাগপত্রে এই অভিযোগের জবাব দিয়েছেন। তাঁর দাবি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগ দেওয়ার আগেই তিনি ওই জমি অধিগ্রহণ করেছিলেন এবং বাংলাদেশের একটি আইনের আওতায় ওই সম্পত্তির অধিকার তাঁর ছিল। সেই আইনটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
ফলে সায়মার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে দু’টি দিক স্পষ্ট—একদিকে তদন্তকারী সংস্থাগুলির অভিযোগ, অন্যদিকে সায়মার নিজের ব্যাখ্যা ও অস্বীকার। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পদত্যাগের অর্থ অভিযোগগুলি আদালত বা তদন্তে প্রমাণিত হয়ে যাওয়া নয়।
সুচনা ফাউন্ডেশনকে ঘিরে কী অভিযোগ? Saima Wazed Resigns WHO
বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযোগের মধ্যে সায়মা ওয়াজেদের নেতৃত্বাধীন সুচনা ফাউন্ডেশনও গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে আসে। অভিযোগ ছিল, নিজের প্রভাব ও ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ওই প্রতিষ্ঠানের জন্য বিপুল অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। বাংলাদেশের সরকারি সংবাদ সংস্থা ও অন্যান্য প্রতিবেদনে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৮ লক্ষ মার্কিন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুচনা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে সায়মা ওয়াজেদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সরকারি জীবনী অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশে ওই ফাউন্ডেশনের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। মানসিক স্বাস্থ্য, স্বায়ত্তশাসন এবং প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার নিয়ে তাঁর কাজের কথাও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
তবে ফাউন্ডেশনের জন্য অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছিল কি না, সেটিই বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অভিযোগও সায়মার বিরুদ্ধে চলা তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতেই দেখা হচ্ছে।
কেন বেতনহীন ছুটির পর পদত্যাগ করলেন সায়মা? Saima Wazed Resigns WHO
সায়মাকে প্রথমে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ছুটিতে পাঠানো হয়। পরে সেই ছুটি বেতনহীন অবস্থায় দীর্ঘায়িত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তরফে তাঁকে দায়িত্ব পালনের বাইরে রাখা হয় এবং সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের কাজ পরিচালনার জন্য অন্তর্বর্তী দায়িত্ব দেওয়া হয় অন্য এক আধিকারিককে।
এবার পদত্যাগপত্রে (Saima Wazed Resigns WHO) সায়মা জানিয়েছেন, তাঁকে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে না দেওয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বের উপর তাঁর আস্থা নষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে বেতন না পাওয়ায় তাঁর আর্থিক পরিস্থিতিও কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে দাবি করেছেন তিনি। এই পরিস্থিতিতেই তিনি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনও তদন্তের বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি গোপনীয়তার আওতায় রয়েছে। ফলে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল সামনে না আসা পর্যন্ত সায়মার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলিকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
#saimawazed #saimawazedresigns #who #sheikhhasina #bangladeshpolitics #whonews #corruptionallegations #bangladeshnews














