Shamik Bhattacharya: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে রাতভর উত্তেজনা, দুই ছাত্র সংগঠনের সংঘর্ষের অভিযোগ, আহত পড়ুয়া এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই রাজনৈতিক রং পেয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদিকে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ সামনে এসেছে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এই আবহেই বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিষয়—অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ বিজেপির শাখা সংগঠন নয়। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসের ভিতরের রাজনীতি থেকে বিজেপির দূরত্ব এবং ক্যাম্পাসের বাইরে পরিস্থিতি তৈরি হলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ভূমিকা নিয়েও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
যাদবপুরে কী ঘটেছিল?
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সাধারণ সভাকে ঘিরেই অশান্তির সূত্রপাত বলে অভিযোগ। বুধবার গভীর রাত থেকে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে দুই ছাত্র সংগঠনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনায় একাধিক পড়ুয়া আহত হন এবং তাঁদের কয়েকজনকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার খবর সামনে আসে।
ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এক পক্ষের অভিযোগ, বাইরে থেকে লোকজন এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অশান্ত করার চেষ্টা হয়েছে। অন্য পক্ষ আবার দাবি করে, সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে তাদের কর্মী ও পদাধিকারীদের উপর হামলা চালানো হয়েছে। এমনকি ক্যাম্পাসে পতাকা পোড়ানো এবং ভাঙচুরের অভিযোগও সামনে এসেছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে শুধু ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যেই নয়, রাজনৈতিক মহলেও বিতর্ক তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতির সংঘাত কতটা গ্রহণযোগ্য এবং রাজনৈতিক দলগুলি আদৌ ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে কি না—এই প্রশ্ন সামনে আসে। সেই আবহেই বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।
‘অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ বিজেপির শাখা সংগঠন নয়’
শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদকে নিয়ে তাঁর স্পষ্ট অবস্থান। তিনি জানিয়েছেন, অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ বিজেপির শাখা সংগঠন নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এটি একটি স্বতন্ত্র ছাত্র সংগঠন এবং নিজেদের সাংগঠনিক পরিচয় ও কর্মসূচি অনুযায়ী তারা ক্যাম্পাসে কাজ করে।
এই মন্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনায় অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে বিজেপির রাজ্য সভাপতির বক্তব্যে দল ও ছাত্র সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পর্কের বিষয়টি আলাদা করে তুলে ধরা হয়েছে।
শমীক ভট্টাচার্য আরও বলেন, বিজেপির নিজস্ব কোনও ছাত্র সংগঠন নেই। ফলে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের ক্যাম্পাস কর্মসূচিকে সরাসরি বিজেপির সাংগঠনিক কর্মসূচি হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ছাত্র সংগঠনটি নিজেদের মতো করে ক্যাম্পাসে কাজ করবে এবং তার প্রতিটি কর্মসূচির সঙ্গে বিজেপির প্রত্যক্ষ সাংগঠনিক সিদ্ধান্তকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
ক্যাম্পাসের ভিতরে বিজেপি হস্তক্ষেপ করবে না
যাদবপুরের ঘটনা নিয়ে শমীক ভট্টাচার্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হল—বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভিতরের কোনও বিষয়ে বিজেপি সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ক্যাম্পাসের ভিতরে ছাত্র সংগঠনগুলির নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড রয়েছে। সেখানে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ কীভাবে কাজ করবে, কী কর্মসূচি নেবে বা কীভাবে নিজেদের সংগঠন পরিচালনা করবে, সেটি তাদের বিষয়। বিজেপি সেই অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না বলেই তিনি জানিয়েছেন।
এই অবস্থান কার্যত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ছাত্র রাজনীতি এবং বিজেপির দলীয় রাজনীতির মধ্যে একটি সাংগঠনিক দূরত্বের কথা তুলে ধরে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর যে প্রশ্ন উঠেছিল—বিজেপি কি অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের মাধ্যমে যাদবপুরে নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে চাইছে?—শমীকের বক্তব্য সেই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার একটি চেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
তবে একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, ক্যাম্পাসের বাইরের পরিস্থিতি আলাদা। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যদি কোনও অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে, সেক্ষেত্রে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ভূমিকা থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
বিধায়ক কেন যাদবপুরে গেলেন? ব্যাখ্যা দিলেন শমীক
যাদবপুরের সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে একজন বিজেপি বিধায়কের ঘটনাস্থলের দিকে যাওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কেন একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন পরিস্থিতিতে সেখানে গেলেন—এই প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন শমীক ভট্টাচার্য।
তাঁর যুক্তি, কোনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির নিজের এলাকায় ক্যাম্পাসের বাইরে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হলে সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করা অস্বাভাবিক নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একজন বিধায়কের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে নিজের এলাকায় কোনও উত্তেজনা বা অশান্তির পরিস্থিতি তৈরি হলে সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করা।
তবে শমীক একই সঙ্গে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিজেপির হস্তক্ষেপ না করার কথাও পুনরায় স্পষ্ট করেছেন। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যে দুটি আলাদা পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে—একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরের ছাত্র রাজনীতি এবং অন্যটি ক্যাম্পাসের বাইরে ছড়িয়ে পড়া অশান্তি। তাঁর মতে, প্রথম ক্ষেত্রে বিজেপি সরাসরি যুক্ত হবে না, কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসতে পারেন।
পতাকা পোড়ানো নিয়ে বিজেপির অবস্থান কী?
যাদবপুরের ঘটনায় পতাকা পোড়ানোর অভিযোগও রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। এই প্রসঙ্গে শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, পতাকা পোড়ানো বিজেপির সংস্কৃতি নয়।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ঘটনার সঙ্গে বিজেপির সাংগঠনিক অবস্থানকে সরাসরি যুক্ত করার বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও রাজনৈতিক দলের পতাকা পোড়ানোকে বিজেপির রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
যাদবপুরের ঘটনায় কে বা কারা পতাকা পোড়ানোর সঙ্গে যুক্ত, সেই বিষয়ে তিনি কোনও চূড়ান্ত তদন্তমূলক দাবি করেননি। বরং বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতেই তিনি বলেছেন, পতাকা পোড়ানোর মতো ঘটনা তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই বক্তব্যের তাৎপর্য এখানেই যে, ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দায় চাপানোর যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেখান থেকে বিজেপিকে আলাদা রাখার চেষ্টা করেছেন দলের রাজ্য সভাপতি।
‘দখলের রাজনীতি’ করছে বিজেপি? কী বললেন শমীক
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে বিজেপির কোনও দখলদারির পরিকল্পনা রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। এর জবাবে শমীক ভট্টাচার্য বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থানকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
তাঁর বক্তব্য, বিজেপি চাইলে বহু বছর আগেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দখলের চেষ্টা করতে পারত। কিন্তু দল সেই পথে যায়নি। মানুষের ভোট এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপরেই বিজেপির আস্থা রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
কোনও প্রতিষ্ঠান দখল করে রাজনৈতিক শক্তি প্রতিষ্ঠা করার বদলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের সমর্থন পাওয়াকেই বিজেপি গুরুত্ব দেয়। তাঁর মতে, মানুষই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে বিজেপির বিরুদ্ধে ওঠা ‘দখলের রাজনীতি’র অভিযোগেরও জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, বিজেপির রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জোর করে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
যাদবপুর-কাণ্ডে শমীকের বক্তব্যের আসল বার্তা
প্রথমত, তিনি অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদকে বিজেপির শাখা সংগঠন হিসেবে স্বীকার করেননি। দ্বিতীয়ত, তিনি দাবি করেছেন বিজেপির নিজস্ব কোনও ছাত্র সংগঠন নেই। তৃতীয়ত, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভিতরের ছাত্র রাজনীতিতে বিজেপি সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না বলে জানিয়েছেন।
চতুর্থত, ক্যাম্পাসের বাইরে অশান্তি তৈরি হলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে সংশ্লিষ্ট বিধায়ক সেখানে যেতে পারেন—এই যুক্তিও তিনি দিয়েছেন। পঞ্চমত, পতাকা পোড়ানো বিজেপির সংস্কৃতি নয় বলেও স্পষ্ট করেছেন।
অর্থাৎ যাদবপুর-কাণ্ডে শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য শুধু অশান্তি নিয়ে মন্তব্য করা নয়; বরং বিজেপি, অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ছাত্র রাজনীতির মধ্যে সম্পর্কের সীমারেখাটিও স্পষ্ট করা।
এখন নজর থাকবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতির দিকে। সংঘর্ষের অভিযোগ, আহত পড়ুয়া, পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক দাবি এবং ক্যাম্পাসের পরিবেশ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার পরবর্তী পরিস্থিতি কী হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার আগেই বিজেপির রাজ্য সভাপতির এই বক্তব্য রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে—বিশেষ করে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদকে বিজেপির শাখা সংগঠন নয় বলে তাঁর স্পষ্ট ঘোষণাকে ঘিরে।
#ShamikBhattacharya #JadavpurUniversity #ABVP #BJP #WestBengalPolitics #Jadavpur #BJPWestBengal













