Bangladesh Presidential Election: বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এবার তৈরি হয়েছে এক বিরল পরিস্থিতি। সংখ্যার হিসাবে ফল প্রায় নির্ধারিত হলেও একাধিক প্রার্থী থাকায় ৩৫ বছর পর ফের সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের সংসদকক্ষে বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য এই নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকারী। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ। সংসদে বিএনপির সদস্যসংখ্যা ২৪৭ হওয়ায় মির্জা ফখরুলের জয় কার্যত নিশ্চিত বলেই রাজনৈতিক সমীকরণে ধরা হচ্ছে। তবু এই নির্বাচন শুধুই সংখ্যার লড়াই নয়—৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আলাদা গুরুত্ব তৈরি করেছে।
৩৫ বছর পর ফের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরাসরি ভোট
বাংলাদেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালেই প্রথমবার সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল। সেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল বিএনপির আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীর মধ্যে। আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন, আর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।
এরপর টানা সাতজন রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার প্রয়োজন আর তৈরি হয়নি। এবার পরিস্থিতি বদলেছে। দুজন প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেওয়ায় সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী ভোটগ্রহণ করতেই হচ্ছে।
এই দিক থেকেই আজকের নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দীর্ঘ সময় পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে পছন্দ জানানোর সুযোগ পাচ্ছেন সংসদ সদস্যরা। যদিও রাজনৈতিক দলগুলির আসনসংখ্যার হিসাব বলছে, ফলাফলে বড় চমকের সম্ভাবনা খুবই কম।
মির্জা ফখরুল বনাম অলি আহমদ, সংখ্যার ব্যবধানেই এগিয়ে বিএনপি
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মূল লড়াই হচ্ছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং অলি আহমদের মধ্যে। ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদ সদস্যসংখ্যা ২৪৭। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের সংসদ সদস্য রয়েছেন ৯০ জন।
সংসদের বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব অনুযায়ী, এই ব্যবধান মির্জা ফখরুলকে অনেকটাই এগিয়ে রেখেছে। বিএনপির সঙ্গে মিত্র হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, গণ অধিকার পরিষদ এবং গণসংহতি আন্দোলনের একজন করে সংসদ সদস্যও রয়েছেন। ফলে সংখ্যার হিসাবে ক্ষমতাসীন পক্ষের অবস্থান আরও শক্তিশালী।
অন্যদিকে ১১-দলীয় ঐক্যের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর ৭৭ জন সদস্য রয়েছেন। এর পাশাপাশি জাগপার একজন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টির আটজন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের তিনজন এবং খেলাফত মজলিসের একজন সংসদ সদস্য রয়েছেন।
এর বাইরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন এবং আটজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রয়েছেন। বিএনপি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কাছেও ভোট চেয়েছে বলে জানা গেছে। ইসলামী আন্দোলনের সংসদ সদস্য ভোটদানে বিরত থাকতে পারেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে।
কেন ভোটার ৩৪৯ জন, ৩৫০ নয়?
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনসহ মোট আসনসংখ্যা ৩৫০। কিন্তু এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ৩৪৯ জন। এর কারণ চট্টগ্রাম-৪ আসনের নির্বাচন-সংক্রান্ত একটি বিষয় আদালতের নির্দেশের কারণে এখনও নিষ্পত্তি হয়নি এবং ওই আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়নি।
ফলে বর্তমানে কার্যকর সংসদ সদস্য এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৯ জনে। এই সংসদ সদস্যরাই আজ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়াটিও সাধারণ সংসদ নির্বাচনের মতো নয়। ভোট গোপন নয়। সংসদ সদস্যদের ব্যালটে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হবে। প্রথমে ব্যালট পেপারের মুড়ি অংশে পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করে ব্যালট গ্রহণ করতে হবে। এরপর মূল ব্যালটে নির্ধারিত স্থানে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে আবার পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হবে।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালও সংসদ সদস্য হিসেবে ভোট দেবেন। তাঁদের জন্য সংসদকক্ষে আলাদা আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানানো হয়েছে।
মির্জা ফখরুল নিজেও ভোট দেবেন, অলি আহমদের নেই সেই সুযোগ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই ভোটে প্রার্থীদের অবস্থানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেই সংসদ সদস্য। তাই তিনি অন্য সংসদ সদস্যদের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন।
তবে তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার দিন তাঁর সংসদীয় আসনটি শূন্য হয়ে যাবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিজে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেও রাষ্ট্রপতি হিসেবে কার্যভার গ্রহণের পর তাঁর সংসদ সদস্যপদ আর থাকবে না।
অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী অলি আহমদ সংসদ সদস্য নন। ফলে তিনি এই নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না। তাঁর প্রার্থিতা থাকলেও ভোট দেওয়ার অধিকার শুধুমাত্র সংসদ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত।
নির্বাচনের দায়িত্বে রয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। সংসদের অধিবেশন বর্তমানে চলমান না থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার জন্য সংসদ সদস্যদের আলাদা বৈঠক ডাকা হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারই নির্বাচনী কর্তা হিসেবে ভোটগ্রহণ পরিচালনা করবেন।
ভোট শেষে আজই ফল, আগামীকাল শপথ
ভোটগ্রহণ চলবে বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভোটগ্রহণের শুরুতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার এবং প্রধানমন্ত্রীর ভোট দেওয়ার দৃশ্য বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। এরপর সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ থাকবে। ভোট গণনার সময় আবার সম্প্রচার শুরু হবে।
ভোট গণনা শেষ হওয়ার পর সংসদকক্ষেই ফলাফল ঘোষণা করবেন নির্বাচনী কর্তা তথা প্রধান নির্বাচন কমিশনার। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।
চিফ হুইপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনে শপথ নিতে পারেন। ফলে আজকের ভোটের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হল, গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই সাংবিধানিক সময়সীমা মেনেই ৬ আগস্ট নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর একাধিক প্রার্থীর উপস্থিতিতে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে চলেছেন। একদিকে ২৪৭ সংসদ সদস্যের শক্তি নিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী, অন্যদিকে অলি আহমদের প্রার্থিতা এই নির্বাচনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে আনুষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার রূপ দিয়েছে।
#BangladeshPresidentialElection #MirzaFakhrul #OliAhmed #BangladeshPolitics #BNP #JamaatEIslami #PresidentialVote #BangladeshParliament #PoliticalNews #BangladeshPresident














