Raja Sen Death: বাংলা সিনেমার একের পর এক স্মরণীয় সৃষ্টির নেপথ্যের সেই মানুষটি আজ আর নেই। ‘দামু’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘দেবীপক্ষ’, ‘ল্যাবরেটরি’-র মতো চলচ্চিত্রের স্রষ্টা, পরিচালক রাজা সেন রবিবার সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্রে যেন ফের নক্ষত্রপতন। সাহিত্য, সমাজ ও মানুষের জীবনকে পর্দায় নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর আলাদা পরিচয় ছিল। তাঁর হাত ধরে দর্শক পেয়েছেন একাধিক সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র, আবার অন্যদিকে টেলিভিশনের পর্দাতেও তিনি তৈরি করেছেন স্মরণীয় কিছু কাজ। বলিউডের অভিনেত্রী রবীনা ট্যান্ডনের সঙ্গেও কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। তাই রাজা সেনের চলে যাওয়া শুধু একজন পরিচালকের প্রয়াণ নয়, বাংলা বিনোদন জগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসানও বটে।
রবিবার সকাল ১০টা নাগাদ এসএসকেএম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রাজা সেন। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি অসুস্থ ছিলেন। জানা গিয়েছে, বাড়িতে পড়ে গিয়ে কোমরে গুরুতর চোট পাওয়ার পর তাঁকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। ফুসফুসের সমস্যা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি একাধিকবার হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন তিনি।
অসুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই, শেষরক্ষা হল না
শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় গত সোমবার রাজা সেনকে এসএসকেএম হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর কিডনিতেও সমস্যা দেখা দেয়। পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠায় তাঁকে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের সহায়তায় রাখা হয়েছিল।
পরিবারের তরফে জানা গিয়েছে, শেষবার হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাঁর একাধিক অঙ্গ ধীরে ধীরে বিকল হতে শুরু করে। চিকিৎসকেরা যথাসাধ্য চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
পরিচালকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন বিজেপি বিধায়ক ও অভিনেত্রী পাপিয়া অধিকারী। রাজা সেনের স্ত্রী পাপিয়া সেনও জানান, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
‘দামু’ থেকে ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, স্মরণীয় সৃষ্টির কারিগর
রাজা সেনের সৃষ্টির জগৎ ছিল বহুমাত্রিক। টেলিভিশন ধারাবাহিকের পাশাপাশি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রেও তিনি নিজের স্বতন্ত্র ছাপ রেখেছিলেন। তাঁর পরিচালনায় ‘সুবর্ণলতা’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘আরোগ্য নিকেতন’, ‘দেশ’, ‘আমার দেশ’-এর মতো ধারাবাহিক দর্শকের কাছে পরিচিতি পায়।
পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের তালিকাতেও রয়েছে একাধিক উল্লেখযোগ্য নাম—‘দামু’, ‘আত্মীয় স্বজন’, ‘দেশ’, ‘দেবীপক্ষ’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘ল্যাবরেটরি’, ‘মায়া মৃদঙ্গ’, ‘চক্রব্যূহ’। সাহিত্যনির্ভর কাহিনিকে পর্দায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল। বাংলা সমাজ, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাপনের নানা দিক তাঁর ছবিতে বারবার উঠে এসেছে।
বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতি জগতের একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্মও তিনি তাঁর নির্মাণের মাধ্যমে নথিভুক্ত করেছেন। সুচিত্রা মিত্র, তপন সেন, শম্ভু মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট মানুষদের ঘিরে তাঁর কাজ বাংলা সংস্কৃতির একটি সময়কে ধরে রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
চলচ্চিত্রের গণ্ডি পেরিয়ে বিস্তৃত ছিল তাঁর কাজ
রাজা সেনের কাজের পরিধি শুধু বাংলা চলচ্চিত্রেই আটকে থাকেনি। বিভিন্ন শিল্পীর সঙ্গে কাজের সূত্রে তাঁর নির্মাণের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়েছিল। বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী রবীনা ট্যান্ডনের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি। ফলে বাংলা ও বৃহত্তর ভারতীয় বিনোদন জগতের মধ্যে তাঁর কাজের একটি সংযোগও তৈরি হয়েছিল।
তাঁর নির্মাণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল গল্পের প্রতি গুরুত্ব। সাহিত্য থেকে নেওয়া কাহিনি হোক কিংবা বাস্তব জীবনের মানুষ ও সমাজকে ঘিরে কোনও বিষয়—পর্দায় সেটিকে নিজের নির্মাণশৈলীতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি।
পরিবারের কাছে রেখে গেলেন শূন্যতা
রাজা সেনের বড় মেয়ে জার্মানিতে থাকেন। বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে তিনি ফিরে গিয়েছিলেন বলে পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে। তাঁর ছোট মেয়ে কলকাতায় রয়েছেন। পরিচালকের দাদাও জীবিত রয়েছেন। পরিবারের সদস্যরাই পরবর্তী যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানা গিয়েছে।
রাজা সেনের প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতে নেমে এসেছে গভীর শোক। ‘দামু’ থেকে সাহিত্যনির্ভর একাধিক চলচ্চিত্র, টেলিভিশনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক থেকে শিল্প-সংস্কৃতির বিশিষ্ট মানুষদের নিয়ে কাজ—বহু সৃষ্টির মধ্য দিয়ে যে পরিচালক নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছিলেন, তাঁর চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে বাংলা বিনোদন জগতের জন্য এক বড় শূন্যতা।













